আজ ভারতীয় উপমহাদেশের কিংবদন্তি নায়িকা শবনমের জন্মদিন। ৭৯ বছরে পা রাখলেন এই প্রখ্যাত তারকা। বাংলাদেশের মেয়ে হয়েও পাকিস্তানের শীর্ষ নায়িকা ছিলেন তিনি। বাংলাদেশের ছবিতে কম অভিনয় করলেও তার ঝুলিতে রয়েছে ‘আম্মাজান’, ‘হারানো সুর’-এর মতো কালজয়ী চলচ্চিত্র।
জন্মদিনটা তার বাসায় বসেই কাটছে। জানালেন, জীবনের এই সময়টাতে জন্মদিনগুলো বিশেষ উপলক্ষ হয়ে আসে। পুরোনো অনেক স্মৃতি মনে পড়ে। আজকাল জন্মদিনের উৎসব খুব একটা টানে না। সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন নিজের জন্য এবং প্রয়াত স্বামী বরেণ্য সংগীত পরিচালক রবিন ঘোষের জন্য।
শবনম নামের অর্থ ভোরের শিশির। নামেই মিশে আছে ঘোর লাগা নেশা। তার নামে প্রেম আসে, তার নামে আসে সম্মান। শবনম নামে প্রসিদ্ধ হলেও এটি তার চলচ্চিত্রের নাম। এই নামে তাকে মুসলিম ধর্মের মনে হলেও আসলে তিনি হিন্দু ধর্মাবলম্বী, যেটা হয়তো অনেকেরই অজানা। তার প্রকৃত নাম ঝর্ণা বসাক।
১৭ আগস্ট, ১৯৪৬ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ননী বসাক ছিলেন একজন স্কাউট প্রশিক্ষক ও ফুটবল রেফারি। শৈশবে বুলবুল ললিতকলা একাডেমি থেকে নাচ শেখেন তিনি। অসাধারণ নাচের দক্ষতা অর্জন করে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। এক অনুষ্ঠানে শবনমের নৃত্য দেখে তাকে সিনেমায় নাচের সুযোগ করে দেন বরেণ্য নির্মাতা এহতেশাম। একইসঙ্গে আরও কিছু সিনেমায় ছোট চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি।
বাংলাদেশি চলচ্চিত্র দিয়ে অভিষেক ঘটলেও স্বাধীনতা-উত্তর সময়টাতে উর্দু চলচ্চিত্রে পাকিস্তানের হয়ে তিনি অর্জন করেছিলেন আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা। শুধু তাই নয়, পাকিস্তানের সিনেমায় সম্ভাব্য সব পুরস্কার ও স্বীকৃতিও তিনি অর্জন করেছেন। তিনি পাকিস্তানের চলচ্চিত্রের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার ‘নিগার অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন ১২ বার, যে রেকর্ড আজও তার দখলে। তিনবার পাকিস্তানের জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। পাকিস্তানের চলচ্চিত্র শিল্পে অসামান্য অবদান রাখায় ২০১৯ সালের লাক্স স্টাইল অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে তাকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয়।
স্বাধীনতার পর তিনি নিয়মিত হন বাংলাদেশের সিনেমায়। এখানেও বাজিমাত করেছেন। ১৯৬১ সালে বাংলা চলচ্চিত্র ‘হারানো দিন’র মাধ্যমে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন শবনম। ১৯৬২ সালে উর্দু চলচ্চিত্র ‘চান্দা’ ছবির মাধ্যমে তৎকালীন সমগ্র পাকিস্তানে রাতারাতি তারকাখ্যাতি পান। এ দুটি ছবিই তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) ঢাকা থেকে মুক্তি পেয়েছিল। পরবর্তী বছরে ‘তালাশ’ সমগ্র পাকিস্তানে মুক্তি পেলে ওই সময়ের সর্বাপেক্ষা ব্যবসাসফল ছবির মর্যাদা লাভ করে। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে শবনম পাকিস্তানের সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় অভিনেত্রী হিসেবে চিহ্নিত হন। পেশাজীবী মনোভাবের কারণে তিনি ১৯৬৮ সালে পাকিস্তানের করাচিতে স্থায়ীভাবে বাস করতে থাকেন।
সত্তর দশকের শুরুর দিকে শবনম ললিউডে (লাহোর) পাকিস্তানের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়িকা হিসেবে নিজের স্থান পাকাপোক্ত করেন। তিনি নায়িকা হিসেবে পাকিস্তানের চলচ্চিত্র শিল্পে ধস নামার আগে আশির দশকের শেষ পর্যন্ত প্রবল প্রতাপে একচ্ছত্র প্রাধান্য বিস্তার করেছিলেন। ইতিহাস বলে ষাট দশক থেকে আশির দশক পর্যন্ত তিনটি দশক ধারাবাহিক ও সফলভাবে রোমান্টিক চরিত্রে অভিনয় করে অগণিত দর্শক-শ্রোতার মন জয় করেছিলেন। এত দীর্ঘ সময় নায়িকা হয়ে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করার রেকর্ড আর কোনো অভিনেত্রীর নেই।
শবনম-ওয়াহিদ মুরাদ, শবনম-নাদিম জুটি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে পাকিস্তানে। আর ঢাকায় তিনি জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন রহমান ও নায়করাজ রাজ্জাকের বিপরীতে। শবনম ছিলেন তার সময়কার নারীদের কাছে স্টাইল আইকন। তিনি লাক্স সুন্দরী হিসেবে পাকিস্তানে লাক্সের শুভেচ্ছা দূতের দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘদিন।
শবনম ‘আয়না’ ছবিতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন এবং ছবিটি পাকিস্তানের সিনেমা হলগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে চলার রেকর্ড করে। ১৯৮৮ সালে শবনম তার চরিত্র পরিবর্তন করেন এবং পুনরায় ঢাকা ও লাহোরের চলচ্চিত্রাঙ্গনে অভিনয় করতে থাকেন।
দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৯৯ সালে কাজী হায়াত-মান্না জুটির ‘আম্মাজান’ ছবি দিয়ে নতুনভাবে প্রত্যাবর্তন হয় তার। ঢাকাই সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় ও কালজয়ী সিনেমা এই ‘আম্মাজান’। কিন্তু পরবর্তীতে আর কোনো সিনেমায় দেখা যায়নি শবনমকে। কিন্তু কেন? এ নিয়ে কখনো সরাসরি তার কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। তবে বছর দুয়েক আগে শিল্পী সমিতির ইফতার পার্টিতে হাজির হয়ে তিনি জানিয়েছিলেন, ‘‘আম্মাজান’ করার পর ভালো কোনো চরিত্র পাইনি। তাই ক্যামেরার সামনেও দাঁড়াইনি। ইচ্ছা থাকলেও মনের মতো চিত্রনাট্য ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে আর কাজ করা হয়নি।’’
৪০ বছরের অধিককাল ধরে অভিনয়ের ফলে তিনি প্রায় ১৮০টি চলচ্চিত্রের অনেকগুলিতে অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন।
স্বনামধন্য সংগীত পরিচালক রবিন ঘোষকে শবনম বিয়ে করেন ১৯৬৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর। তাদের সংসারে একমাত্র ছেলে রনি ঘোষ।