লেগুনা, রিক্সা ও মাদক

ইকরাম কবীর, ছবি: বার্তা২৪

শহরে লেগুনা চলাচল বন্ধ করা হবে শুনে মনে খটকা লেগেছিল। আসলেই বন্ধ হবে? তাহলে যে মানুষগুলো লেগুনা চালিয়ে জীবিকা চালায় তাদের কী হবে? কোথায় যাবে তারা? তারপর শুনি আমাদের প্রধান-প্রধান সড়কে লেগুনা চলতে পারবে না। এ শহরে সড়ক আছেই বা ক’টা? সবইতো প্রধান সড়ক। লেগুনা চলাচল শহরের ট্র্যাফিকসহ আরও অন্যান্য ব্যপারে জ্বালাতন করছে ঠিকই তবে প্রশ্ন হচ্ছে- লেগুনাগুলো যখন আমাদের রাস্তায় চলাচল শুরু করেছিল, তখন আমরা কোথায় ছিলাম? আমাদের চিন্তাবিদ ও ‘বন্ধ’-বিদরা কোথায় ছিলেন। এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল অনেক বছর আগে। প্রায়ই হতো। আমরা ঢাকার রাস্তা থেকে রিক্সা উঠিয়ে দিতে চাইতাম। রিক্সা চলাচল বন্ধ করে দিয়ে যখন দেখলাম আসলে কাজটি ঠিক হয় নি, তারপর আবার চালু করলাম। যেই মানুষগুলো রিক্সা চালিয়ে জীবন চালাতেন, তাদের কথা চিন্তা করেই আবার চালু করলাম।

যখন রিক্সা এবং লেগুনা আমাদের সড়কগুলতে চলাচল শুরু করে, তখনই আমাদের বোঝা উচিত ছিল যে এই বাহনগুলোকে ঘিরে একটি অর্থনীতি তৈরী হবে এবং সেই অর্থনীতিতে জনগণ অভ্যস্ত হয়ে গেলে বাহনগুলো রাস্তা থেকে আর সরিয়ে ফেলা যাবে না। যদি সরাতেই হয়, তাহলে মানুষগুলোর কোনো একটি গতি নির্ধারণ করে তারপর তা করতে হবে। আমাদের কাজ দেখলে কেন যেনো মনে হয়, মাথা ব্যথায় মাথা কেটে ফেলতে চাই।

মাথা ব্যথার কথা মনে হলেই মাদকবিরোধী অভিযানের কথা মনে হয়। বেশ কয়েক মাস ধরে এই অভিযান চলছে এবং নানা ধরণের মাদক ব্যবসায়ীরা পুলিশের সঙ্গে বন্ধুকযুদ্ধে মারা যাচ্ছে। অবাক হয়েছি এই অভিযানে প্রাণহানির পক্ষে একজন পুলিশ কমিশনারের সাফাই শুনে। পত্রিকান্তরে জেনেছি যে তিনি বলেছেন, ‘আমি মনে করি, জীবনহানি হতেই হবে। শান্তির জন্য অশান্তির জীবনহানি হতে পারে।’ তিনি আরও বলেছেন যে মাদক ব্যবসায়ীরা অস্ত্র হাতে নিয়ে পুলিশের সঙ্গে মোকাবেলা করতে চায়; তবে পুলিশের হাতেও অস্ত্র আছে। সেই অস্ত্র ব্যবহারের অধিকার পুলিশের আছে। সুতরাং মাদক নিয়ন্ত্রণে জীবনহানি হতেই পারে। কথা সত্য। কেউ পুলিশের দিকে গুলি ছুঁড়লে পুলিশ কেন দাঁড়িয়ে থেকে গুলি খাবে? তারাও পালটা গুলি করবে এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটবে।

তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এ পর্যন্ত কতজন মাদক ব্যবসায়ী মারা গেছে? চার’শ? সাড়ে চার’শ? তার অর্থ হচ্ছে ওদের সবার হাতে অস্ত্র ছিল এবং পুলিশের দিকে তারা গুলি করেছে। তাহলে চার’শ-সাড়ে চার’শ বাংলাদেশী খোলা বন্দুক হাতে স্বাধীন ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে? চিন্তা করুন এই চার’শ বন্ধুকধারী যদি কোথাও একসাথে জড়ো হয়ে চার’শ বন্দুক দিয়ে গুলি চালাতে শুরু করে, তাহলে আমাদের পুলিশের কি হতে পারে? কাজেই, মাদকের পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধেও পুলিশের অভিযান চালাতে হবে।

আমাদের পুলিশ কমিশনার ইয়াবা ছড়িয়ে পড়ার জন্য বিজিবি ও কোস্টগার্ডকে দায়ী করেছেন। বলেছেন, ‘১২০ কিলোমিটার সীমান্ত যদি আমরা রক্ষা করতে পারতাম তাহলে ইয়াবা দেশে ছড়িয়ে পড়তো না। সীমান্তের একটি পয়েন্টে যদি ১০ লাখ ইয়াবা ঠেকানো যেত, তাহলে সেগুলো ১০০ জায়গায় ছড়িয়ে পড়তো না। এক পয়েন্টে ইয়াবা নিয়ন্ত্রণ সহজ নাকি ১০০ পয়েন্টে?’

কমিশনার আরও বলেছেন যে সবাই পুলিশকে দোষ দেয়, তবে পুলিশের কারণে মাদক দেশে আসে না। তিনি বলেছেন, ‘যাদের ব্যর্থতার কারণে ইয়াবা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে তাদের নাম কেউ মুখে আনে না। দুঃখের বিষয় তাদের কথা মিডিয়াতেও আসে না।’ তিনি দাবি করেছেন যে বিজিবি ও কোস্টগার্ডকেও ব্যর্থতার দায় নিতে হবে।

আমাদের মত সাধারণ মানুষের মস্তিস্ক বিগড়ে যাওয়ারই কথা। সরকারের এক বাহিনী অন্য দুই বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনছে? এমনই কি হওয়ার কথা? আমাদের পুলিশ আমাদেরই সীমান্তরক্ষী ও কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে কথা বলছে? যেনো সীমান্তরক্ষী ও কোস্টগার্ডই দেশে মাদক নিয়ে আসছে এবং তাদেরকেই দোষারোপ করা উচিত। বুঝে নেবো যে এ বিষয়ে পুলিশকে দায়ন্যায়স্ত করা কারোরই ঠিক হচ্ছে না। এবং পুলিশকে শুধু দায়িত্ব দেয়া হয়েছে কঠোর হওয়ার জন্যে। এমন অবস্থায় সাধারণ মানুষের বুদ্ধি লোপ পায় এবং এমন বুদ্ধিহীন পরিস্থিতিতে তারা লেগুনা ও রিক্সায় চড়তে চাইতেই পারে। নয় কি?

আমরা কাউকে দোষ দিতে চাইনা। সমাজে মাদক অল্প-বিস্তর সব সময়েই ছিল, আছে এবং থাকবে। তবে সেটিকে আয়ত্তের ভেতরে রাখাটাই হচ্ছে আমাদের স্বার্থকতা। শুরুতেই যদি আমরা মাদক নিয়ন্ত্রণ (নাকি নির্মূল?) করতে চাইতাম, তাহলে আজ এমন অবস্থা হতো না। দোষ কারো একার নয়, আমাদের সবার। সবারই উচিৎ একসাথে চিন্তা ও কাজ করা।

ইকরাম কবীর: গল্পকার ও কলামিস্ট।

 

যুক্তিতর্ক এর আরও খবর

‘সিনহাসন’

গত বছরের ১৪ অক্টোবর অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে দেশত্যাগ করেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। এর আগে ২ অক্টোবর ছুটির আবেদন করেন ...