প্রসঙ্গ রাজনীতি: সংবিধান, সংসদ ও আসন্ন নির্বাচন

ইকতেদার আহমেদ, ছবি: বার্তা২৪

জাতীয় সংসদের মেয়াদ হলো সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সংসদের প্রথম বৈঠকের তারিখ থেকে ৫ বছর। যেদিন ৫ বছর অতিবাহিত হয় সেদিন আপনাআপনিই সংসদ ভেঙ্গে যায়, অবশ্য রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে মেয়াদ অতিক্রান্তের পূর্বেই সংসদ ভেঙ্গে দিতে পারেন। একজন সংসদ সদস্যকে তার নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকের তারিখ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে শপথ গ্রহণ করতে হয় যদিও উক্ত মেয়াদ অতিবাহিত হওয়ার পূর্বে স্পীকার যথার্থ কারণে তা বৃদ্ধি করতে পারেন।

সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনী প্রবর্তন পরবর্তী মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙ্গে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙ্গে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে এবং মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙ্গে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙ্গে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান করা হয়েছে।

সংসদের সাধারণ নির্বাচন বিষয়ে পঞ্চদশ সংশোধনী পূর্ববর্তী যে বিধান ছিল তাতে মেয়াদ অবসানের কারণে অথবা মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙ্গে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান ছিল।

পঞ্চদশ সংশোধনী পূর্ববর্তী বিধান অনুযায়ী মেয়াদ অবসান বা মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে সংসদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো বিধায় নির্বাচন অনুষ্ঠানকালীন সংসদ সদস্যরা পদে বহাল থাকতেন না।
পঞ্চদশ সংশোধনীর দ্বারা নব প্রবর্তিত বিধান অনুযায়ী সংসদ মেয়াদ পূরণের ক্ষেত্রে তা ভেঙ্গে না দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কারণে বিদ্যমান সংসদ সদস্যরা নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হতে ইচ্ছুক হলে তাদেরকে পদে বহাল থাকাবস্থায় নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হতে হয়।

পঞ্চদশ সংশোধনী দ্বারা প্রবর্তিত বিধানের ফলশ্রুতিতে সংসদ ভেঙ্গে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নির্বাচিত ব্যক্তিগণ সংসদের মেয়াদ প্রথম বৈঠকের তারিখ হতে ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বে সংসদ সদস্যরূপে কার্যভার গ্রহণ করতে পারেন না। একজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া পরবর্তী সংবিধানে উল্লিখিত শপথ পাঠ ব্যতিরেকে সংসদ সদসরূপে কার্যভার গ্রহণের জন্য আইনানুগভাবে সিদ্ধ নন।

সংসদের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের বৈঠক আহবান করতে হয়। সংসদের এক অধিবেশনের সমাপ্তি ও পরবর্তী অধিবেশনের প্রথম বৈঠকের মধ্যে ৬০ দিনের অতিরিক্ত বিরতি থাকার বিধান না থাকলেও মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে নির্বাচন অনুষ্ঠান পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদের বৈঠক অনুষ্ঠানের বিধান নেই। এ কারণে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা পদে বহাল থাকাবস্থায় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও তারা সংসদের কোনো কার্যে অংশগ্রহণ করতে পারেন না।

সংসদ সদস্যদের বেতন, ভাতা ও সুযোগসুবিধাদি রাষ্ট্রীয় তহবিলে রক্ষিত জনগণ প্রদত্ত কর হতে নির্বাহ করা হয়। সংসদ সদস্যদের কাজ হলো দেশ ও জনগণের কল্যাণে আইন প্রণয়ন এবং নিজ সংসদীয় এলাকা ও দেশের সার্বিক উন্নয়নে আত্মনিয়োগ করা। পঞ্চদশ সংশোধনী পরবর্তী একজন সংসদ সদস্যের বেতন, ভাতা ও সুযোগসুবিধাদি বহুলাংশে বৃদ্ধির ফলশ্রুতিতে তাঁরা পূর্বের তুলনায় বর্তমানে যে বর্ধিত বেতন, ভাতা ও সুযোগসুবিধাদি পাচ্ছেন তা হলো- বেতন ৩০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৫৫ হাজার টাকা, ব্যয় নিয়ামক ভাতা ৩ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৫ হাজার টাকা, বিমান দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের ক্ষেত্রে বীমার পরিমান ১০ লাখ টাকা, দৈনিক ভাতা ৩শ টাকা থেকে বেড়ে ১৭৫০ টাকা, স্বেচ্ছাধীন তহবিল ৩ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৫ লাখ টাকা, নির্বাচনী এলাকার অফিস খরচ মাসিক ৭ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১২ হাজার টাকা এবং মাসিক পরিবহন ভাতা ৪০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৭০ হাজার টাকা।

নবম সংসদ বহাল থাকাকালীন পঞ্চদশ সংশোধনী প্রবর্তিত হয়। পঞ্চদশ সংশোধনী প্রবর্তন পরবর্তী দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নবম সংসদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি। নবম সংসদের মেয়াদ ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারি ৫ বছর পূর্ণ হয়। সে নিরীখে দশম সংসদ নির্বাচনটি ২০১৩ সালের ২৭ অক্টোবর হতে ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারি পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনটি অনুষ্ঠানকালীন নবম সংসদে নির্বাচিত যে সকল সদস্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন তারা সকলে পদে বহাল থাকাবস্থায় নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হন। নবম সংসদের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি দশম সংসদ নির্বাচন বজর্ন করায় দলটির নবম সংসদে নির্বাচিত কোনো সদস্য দশম সংসদ নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হননি। সে সময়কার প্রধান বিরোধী দল বিএনপির বর্জনের মুখে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের জন্য উন্মুক্ত ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৫৪টি আসনের প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকাসমূহ হতে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে আইনানুযায়ী নির্বাচিত তিনশত সদস্য সমন্বয়ে এবং তাদের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির ভিত্তিতে একক হস্তান্তরযোগ্য ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত ৫০ জন মহিলা সদস্যসহ সর্বমোট ৩৫০ সদস্য সমন্বয়ে সংসদ গঠিত হয়। কাজেই ২০১৪ সালে একটি প্রত্যক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন থেকে জাতি বঞ্চিত হয়েছে। সে বিবেচনায় সরকারও এবার একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দিকেই হাঁটছে বলেই মনে হয়।

দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানকালীন ৯০ দিন সময়ের মধ্যে নবম সংসদের কোনো বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি। নবম সংসদে নির্বাচিত সংসদ সদস্যগণ দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানকালীন সময়ে সংসদ সদস্য পদে বহাল থাকলেও সে সময় নবম সংসদের অধিবেশন অনুষ্ঠান সাংবিধানিকভাবে বারিত থাকায় নির্বাচনটি অনুষ্ঠানকালীন কোনো অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়নি যদিও সে সময় সংসদ সদস্য পদে বহাল থাকাবস্থায় যে সব সদস্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন তারা সবাই পূর্বের ন্যায় বেতন, ভাতা ও সুযোগসুবিধাদি নিয়েছেন।

দশম সংসদের ন্যায় একাদশ সংসদ নির্বাচন সংবিধানের বিদ্যমান বিধানাবলির আলোকে অনুষ্ঠিত হলে দশম সংসদে নির্বাচিত যে সকল সদস্য একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হবেন তারা সকলে নবম সংসদের অনুরূপ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ সদস্যদের ন্যায় পদে বহাল থাকাকালীন অবস্থায় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হবেন। যে বিধানাবলির আলোকে নবম সংসদের যে সকল সদস্য দশম সংসদ নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হওয়াকালীন বেতন, ভাতা ও সুযোগসুবিধাদি আহরণ করেছিলেন দশম সংসদে নির্বাচিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ সদস্যগণও একই বিধানাবলির আলোকে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশগ্রহণকালীন নির্ধারিত ৯০ দিন সময়কালে বেতন, ভাতা ও সুযোগসুবিধাদি আহরণ করবেন। প্রধানমন্ত্রী, স্পীকার, ডেপুটি স্পীকার, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী এরা সকলেই সংসদ সদস্য। এরা প্রজাতন্ত্রের লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত হলেও পদে বহাল থাকাবস্থায় নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হওয়ার উদ্দেশ্য সাধনকল্পে তাঁরা প্রজাতন্ত্রের কর্মে লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত মর্মে গণ্য হন না। উপরোক্ত পদধারীদের ন্যায় সংসদ সদস্যদের এরূপ ছাড় দেয়া হয়নি।

সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ সকল প্রার্থীর জন্য সমসুযোগ সম্বলিত মাঠ অপরিহার্য। কিন্তু সংসদ সদস্য ও সংসদ সদস্য নন (যেকোনো দলেরই হতে পারে) এমন দু’ধরণের ব্যক্তি নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হলে সে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন করতে পারে। সরকার এ সুযোগ কেন দেবে?

বাংলাদেশ বা এর যে কোনো অংশের নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক জীবন যুদ্ধ বা বহিরাক্রমণ বা অভ্যন্তরীণ গোলযোগের কারণে বিপদের সম্মুখীন হলে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে জরুরি অবস্থান জারি করতে পারেন। রাষ্ট্রপতির নিকট যদি সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হয় যুদ্ধাবস্থার বিদ্যমানতার জন্য ভেঙ্গে যাওয়া সংসদ পুনরাহবান করা প্রয়োজন সেক্ষেত্রে যে সংসদ ভেঙ্গে দেয়া হয়েছিল রাষ্ট্রপতি তা আহবান করতে পারেন। এ ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শানুযায়ী কার্যটি সমাধা করতে হয়। সংবিধানের বিদ্যমান বিধানাবলি অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী স্বীয় পদে বহাল থাকেন।

দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানকালীন প্রধানমন্ত্রী ও স্বল্প সংখ্যক মন্ত্রী সমন্বয়ে গঠিত সরকারের মন্ত্রীসভার সদস্যগণ সংসদ সদস্যদের ন্যায় পদে বহাল ছিল। সে সময় প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার সদস্যদের এক-দশমাংশ ব্যতীত অপর সবাই সংসদ সদস্য হিসেবে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।

বিদ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রীসহ তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সংসদ সদস্যগণ পদে বহাল থাকা অবস্থায় একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূল নির্বাচনের সম্ভাব্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায় সরকারের। সবদলের আস্থা অর্জন করতে হবে। এটি নিশ্চিত করার জন্য নির্বাচনকালীন সরকার ও সংসদের আকার-প্রকার নিয়ে ভাবনার অবকাশ আছে। সরকার হয়তো এটি ভাবছেও। তাই সরকার সংবিধান তথা রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে এটাই কাম্য।


লেখক: সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

যুক্তিতর্ক এর আরও খবর

‘সিনহাসন’

গত বছরের ১৪ অক্টোবর অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে দেশত্যাগ করেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। এর আগে ২ অক্টোবর ছুটির আবেদন করেন ...