Barta24

বুধবার, ১৭ জুলাই ২০১৯, ১ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বদলে যাচ্ছে দক্ষিণ এশীয় দৃশ্যপট

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বদলে যাচ্ছে দক্ষিণ এশীয় দৃশ্যপট
ছবি: বার্তা২৪
ড. মাহফুজ পারভেজ
কন্ট্রিবিউটিং এডিটর
বার্তা২৪.কম


  • Font increase
  • Font Decrease

ভারত ও পাকিস্তান ভিত্তিক দক্ষিণ এশিয়ার ধারণা আমূল বদলে যাচ্ছে। প্রচলিত কাঠামো ছাড়িয়ে উপমহাদেশের পূর্বমুখী একটি অবয়ব তৈরি হচ্ছে ক্রমশ। উপমহাদেশের পালাবদল ও রূপান্তর ধারায় বাংলাদেশের উত্থান হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার ভরকেন্দ্র রূপে, যা হতে পেরেছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের উন্নয়নের পাশাপাশি বদলে যাচ্ছে দক্ষিণ এশীয় দৃশ্যপট।

আধুনিক রাজনৈতিক পণ্ডিতরা শেখ হাসিনার রাজনৈতিক নেতৃত্বের সফলতা ও সাম্প্রতিক নির্বাচনী বিজয় প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন ‘রাজা মানদেলা’ (Rajamandala) প্রত্যয়, সংস্কৃত যে শব্দটির অর্থ হলো ‘সার্কেল’ বা ‘বৃত্ত’। ধ্রুপদী ভারতীয় পণ্ডিত কৌটিল্য তার বিশ্বখ্যাত ‘অর্থশাস্ত্র’ গ্রন্থে দুই সহস্র বছর পূর্বে (খ্রিস্ট.পূ. ৪র্থ শতকে) ধারণাটি সর্ব প্রথম তুলে ধরেন। যা বোঝায় রাজাকে কেন্দ্র করে বন্ধু ও শত্রু দেশের বৃত্ত। প্রতীকী অর্থে এতে এমন একটি সৌরজগতের চিত্র দেওয়া হয়েছে, যাতে রাজাকে কেন্দ্র করে শত্রু ও মিত্র রাষ্ট্রগুলো আবর্তিত হচ্ছে। এবং রাজা সেগুলোকে বশীভূত করে নিয়ে নিজের আয়ত্ত্ব ও নিয়ন্ত্রণে রাখছেন। শেখ হাসিনা সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে শত্রুতা ও মিত্রতার মাঝখানে এমনই সাফল্য অর্জন করেছেন এবং তার শাসনকালে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতা ও শক্তির একটি নতুন ভরকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। 

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jan/09/1547038391587.jpg

আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সদ্য সমাপ্ত নির্বাচন শেখ হাসিনার অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের চলমান অগ্রগতিকেও একটি টেকসই ভিত্তি দিয়েছে। টানা তিন বার সহ চার বারের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শেখ হাসিনা দক্ষিণ এশিয়া ও বিশ্বের মধ্যে যেমন বিরল সম্মান পেয়েছেন, তেমনিভাবে বাংলাদেশও পৌঁছে যাচ্ছে উন্নততর একটি লাগসই অবস্থানে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচনী বিজয়ের ডামাঢোল আর বিরোধীদের বিচ্ছিন্ন অভিযোগের ফাঁকে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ার কাঠামোগত রূপান্তর ও এর দীর্ঘমেয়াদী প্রতিফলের বিষয়টি সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে থেকে যাচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের নির্বাচনের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে দেশটির বিরাট বিকাশ ও সম্ভাবনার মধ্যেই লুক্কায়িত রয়েছে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jan/09/1547038412321.jpg

এটা ঠিক যে, ব্যক্তি হিসাবে টানা তিন বার বিজয়ী হওয়া শেখ হাসিনার নেতৃত্বের মুকুটে সাফল্যের অনেকগুলো পালক যুক্ত করেছে। বর্তমান হ্যাট্রিকের সঙ্গে আগের ১৯৯৬-২০০১ সালের শাসন মিলিয়ে তিনি শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় নন, বিশ্বের মধ্যেই দীর্ঘতম শাসন নেতৃত্বের রেকর্ড গড়েছেন। অনেক নেতাই নিজ নিজ দেশে দীর্ঘকাল শাসনে ছিলেন। কিন্তু শেখ হাসিনার মতো এতো দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকে আঞ্চলিক রাজনীতির প্রচলিত কাঠামো ভেঙে নিজের দেশকে সামনে নিয়ে আসার সফলতা অনেকেই দেখাতে পারেন নি। শেখ হাসিনার শাসনের বিগত যুগে দেশের অর্থনীতির নাটকীয় উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশকে স্থিতিশীলতা ও ধারাবাহিকতার সঙ্গে সঙ্গে শাসনের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার সক্ষমতা নিজের দেশকে ছাড়িয়ে আঞ্চলিক রূপান্তরকেও তার নিজের পক্ষে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করেছে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jan/09/1547039200040.jpg

পরিসংখ্যান ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বলা হচ্ছে যে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুততম গতিতে বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশে পরিণত হয়েছে। দেশটির মাথাপিছু আয় দশ বছরে দ্বিগুণ হয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের সামনের দিকে চলে আসা এখন শুধু সময়ের বিষয় মাত্র। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির বছর ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭ থেকে ১০-এর ঘরে নিয়ে আসার চ্যালেঞ্জ সফল করার পথে চলেই শেখ হাসিনা ক্রমে ক্রমে দেশের অর্জনকে বিকশিত করছেন।

 ‘বাংলাদেশের এই ইতিবাচক অর্থনৈতিক পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশের জন্য কি বার্তা বহন করছে?’ এমন প্রশ্ন নিয়েও বিশ্লেষক আর গবেষকরা কাজ করে পেয়েছেন বেশ কিছু উত্তর। প্রথমত বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রা দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক পদক্রমকে ভেঙে দিয়েছে। ইতিমধ্যেই পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে দিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এখন ১৮০০ ডলার, যা  পাকিস্তানের ১৬০০ ডলার মাথাপিছু আয় বা পারকেপিটা ইনকামের চেয়ে বেশি। সামনের বছরেই বাংলাদেশের ২৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের জিডিটি পাকিস্তানের ৩১০ বিলিয়ন ডলারের জিডিপিকে অতিক্রম করবে বলেও বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন। এটা বলা হচ্ছে, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানের অর্থনীতির ভঙ্গুর দশার বিপরীতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের ক্রম বিকাশমান অর্থনৈতিক সূচক ও মানদণ্ড দেখে। কারণ শেখ হাসিনা ঋণ ও সাহায্য নির্ভর অর্থনীতিকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ভিত্তিক অর্থনীতিতে বদলে দিয়েছেন এবং এর সুফল জাতীয় অথনীতিতে পেতে শুরু করেছেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jan/09/1547039219429.jpg

বাংলাদেশের এই অর্জনকে মডেল হিসাবে গ্রহণের জন্য পাকিস্তানের ভেতর থেকেও দাবি উঠেছে। ট্র্যাডিশনাল মনোবৃত্তি ভেঙে রাজনৈতিক উচ্চাশা ও ধর্মীয় উদারতা এবং আধুনিকতার পথে ‘বাংলাদেশ মডেল’ গ্রহণ করা মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ ও সামরিকতন্ত্র প্রভাবিত পাকিস্তানে পক্ষে কতটুকু সম্ভব হবে, তা নিয়েও আশঙ্কা রয়েছে। কারণ রাজনৈতিক ও সুশাসনের সমস্যা পাকিস্তানের অর্থনীতিকে পেছনে টানছে, যা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে হচ্ছে না বলেই সব দিক থেকে বাংলাদেশ পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে দিচ্ছে।

তদুপরি বাংলাদেশের উত্থান দক্ষিণ এশিয়ার ভারসাম্যকে নিজের দিকে টেনে আনছে এবং উপমহাদেশের অর্থনৈতিক ভরকেন্দ্রকে পূর্ব দিকে নিজের আরো অনেক কাছে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি শুধু এদেশকেই নয়, ভারতের উত্তরপূর্ব রাজ্যসমূহ, নেপাল, ভূটানসহ সমগ্র উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলকেই গুণগতভাবে প্রভাবিত করেছে। বাংলাদেশের কারণে উপমহাদেশের প্রায়-অবহেলিত উত্তর ও পূর্বাঞ্চল চলে এসেছে উন্নয়ন ও অগ্রগতির পাদপ্রদীপের আলোতে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jan/09/1547039331548.jpg

দক্ষিণ এশিয়ার ভৌগোলিক মানচিত্রের দিকে তাকালে একটি অদ্ভুত বিষয় লক্ষ্য করা যায়। তা হলো পশ্চিম দিকে পাকিস্তান আর পূর্ব দিকে বাংলাদেশ হলো উপমহাদেশের দুটি সেতু। সেতুরাষ্ট্রের মতো দেশ দুটি উপমহাদেশকে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। কিন্তু পাকিস্তান তার প্রবেশ পথটিকে বিঘ্নিত করেছে পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে সন্ত্রাস ও আন্তঃসীমান্ত সমস্যা ও জঙ্গিবাদ বিস্তারের মাধ্যমে। আফগান, তালেবান সন্ত্রাসী তৎপরতাকে পাকিস্তান জিইয়ে রাখছে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ সীমান্তের দিক থেকে এমন সমস্যায় আক্রান্ত হয়েও শান্তি এবং স্থিতিশীলতার আঞ্চলিক সহযোগিতার পথ বেছে নিয়েছে। রোহিঙ্গা সমস্যাকে মানবিক দিক থেকে বিবেচনা করে বাংলাদেশ এটিকে রক্তক্ষয়ী পথে যেতে দেয় নি।

শান্তি, স্থিতিশীলতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার আর্দশ বাংলাদেশের মব্জাগত ঐতিহ্য, যা প্রস্ফূটিত হয়েছিল বহু বছর আগে ঢাকায় দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতা সংস্থা ‘সার্ক’ গঠনের মাধ্যমে। ‘সার্ক’ অনেক ইতিবাচক কাজ করলেও ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সহযোগিতা গড়ার নেতিবাচক প্রবণতার কারণে পিছিয়ে থাকছে। তবে ‘সার্ক’-এর কাঠামোয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বিকাশের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের অনীহা ‘শাপে বর’ এনে দিয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভূটানকে নিয়ে পূর্বাঞ্চলীয় সাব-রিজিওনাল ফোরাম গড়ে উঠতে পেরেছে। পাশাপাশি পাঁচটি দক্ষিণ এশীয় (বাংলাদেশ, ভূটান, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা) এবং দুটি দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশ (মায়ানমান, থাইল্যান্ড) নিয়ে ট্রান্স-রিজিওনাল সহযোগিতা ফোরাম বিমসটেক নবশক্তি লাভ করেছে।

চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে বাংলাদেশ, ভারতের পূর্বাঞ্চল ও  মায়ানমারের মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা সংহতি বলয়ের (বিসিআইএম) সাফল্য নিয়ে বাংলাদেশ কিছুটা সমালোচনাপ্রবণ। কারণ, চীন-পাকিস্তানের অর্থনৈতিক করিডোরের ক্ষেত্রে আশানুরূপ ফল পাওয়া যায় নি। ফলে 'বিসিআইএম করিডোর' নিয়ে পূর্ণ আশাবাদী হওয়ার সুযোগ কম। কারণ, এখানে রোহিঙ্গা সমস্যা আঞ্চলিক সহযোগিতার ভবিষ্যত সাফল্যের উপর কালো ছায়া ফেলেছে। এমন সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ মায়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি করে সমস্যাগুলো সমাধানের পথ দেখাচ্ছে এবং তিনটি আঞ্চলিক পরাশক্তি, যথা, ভারত, চীন ও আসিয়ানকে টেনে এনে আঞ্চলিক শান্তি, সমৃদ্ধি ও সহযোগিতার ক্ষেত্র উন্মোচনের প্রণোদনা জাগাচ্ছে।

শেখ হাসিনার শাসনে বাংলাদেশের আরেক বড় সাফল্য হলো ভারত ও মায়ানমারের সঙ্গে সমুদ্র সীমানার সমস্যা শান্তিপূর্ণভাবে নিপত্তি করা। এতে বাংলাদেশের জন্য সমুদ্র দিয়ে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের পথ প্রশস্ত হয়েছে। শান্তিপূর্ণ বঙ্গোপসাগর দিয়ে বাংলাদেশের সামনে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিগন্ত খুলে গেছে। বাংলাদেশ চলে এসেছে আঞ্চলিক যোগাযোগের লাইমলাইটে।

বহুকাল ধরে ঐতিহ্যগতভাবে দক্ষিণ এশিয়ার ভূগোলকে বিশ্ব দেখেছে ভারত আর পাকিস্তানের অবস্থানের ভিত্তিতে। ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার সম্পর্কে উঠা-নামার আলোকে প্রণীত হয়েছে বিশ্বের নানা দেশের দক্ষিণ এশীয় নীতি ও কর্মসূচি। যে দেখার ও পদক্ষেপ নেওয়ার মধ্যে দেশ দুটির মধ্যকার সন্দেহ ছিল, সংঘাত ও বৈরীতা ছিল। ভারত ও পাকিস্তানের মেরুকরণের ফলে পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্রের বিপদ সৃষ্টি হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ায়। দক্ষিণ এশিয়ার এই নেগেটিভ ইমেজ ভাঙছে বাংলাদেশের উত্থানে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দক্ষিণ এশিয়ার পূর্বাঞ্চলে সৃষ্টি হয়েছে নতুন ভরকেন্দ্র। বাংলাদেশের নির্বাচনে শেখ হাসিনার ধারাবাহিক নেতৃত্বের ইতিবাচক ফল বাংলাদেশ ছাড়িয়ে উপমহাদেশ ও বিশ্বকেও প্রভাবিত করার বিষয়গুলোই এখন সব কিছুকে ছাপিয়ে সামনে চলে আসছে।

আপনার মতামত লিখুন :

রাজনীতির ‘দুষ্টু বালক’ ও আমাদের ‘এরশাদ সিনড্রোম’

রাজনীতির ‘দুষ্টু বালক’ ও আমাদের ‘এরশাদ সিনড্রোম’
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, পুরনো ছবি

৮৯ বছরের এক বিশাল কর্মজীবন পেছনে ফেলে সব আলোচনা-সমালোচনার ওপারে চলে গেছেন এরশাদ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এরশাদ একাই একটি অধ্যায়। এরশাদের জাতীয় পার্টি (জাপা) হয়তো আরও বহুদিন রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়েই থাকবে, তবে এরশাদবিহীন জাপা ধীরে ধীরে তার রাজনৈতিক গুরুত্ব হারাবে বলেই মনে হয়।

তার দীর্ঘ পেশাগত ও রাজনৈতিক ভূমিকার জন্য তিনি দলকেও ছাড়িয়ে গেছেন বহুমাত্রায়। তার অনুপস্থিতিতে জাপা হয়তো এখন সেটিই অনুভব করবে। ক্ষমতার সিঁড়ির কাছাকাছি যেতে এরশাদের বিকল্প এখনও তৈরি হয়নি। এছাড়া রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিপরীতে একটি শক্ত প্রতিরক্ষা ঢাল হিসেবেও তার জুড়ি নেই। তাই জাপার মতো একটি সমর্থক শক্তি রাজনীতিতে প্রয়োজন ছিল বৈকি। অপর দলের ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় এরশাদবিহীন জাপা আগামীতে কতটা শক্তি জোগাতে পারে সেটিই এখন দেখার বিষয়।

তবে পার্টির গুরুত্ব থাকা না থাকা নির্ভর করে দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের ওপর। দলের ভেতরে সামরিক বেসামরিক ক্যারিয়ারিস্ট নির্বিশেষে এরশাদের মতো হাই-প্রোফাইল রাজনীতিক আর নেই। এক সময় জাপা করেছেন দেশের অনেক হাই প্রোফাইল রাজনীতিক। মিজানুর রহমান চৌধুরী, কাজী জাফর, শাহ মোয়াজ্জেম, মওদুদ আহমেদসহ দেশের প্রথিতযশা অনেক রাজনীতিকরা এরশাদের জাপাকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাদের বেশিরভাগই আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা বামপন্থী রাজনীতি থেকে এসেছেন। ডিগবাজীর এই রাজনীতি শুরু হয় জিয়ার আমলে। সামরিক, বেসামরিক আমলা ও পেশাজীবীদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করেন জিয়া।

এরশাদও একই কায়দায় সামরিক-বেসামরিক আমলা, পেশাজীবীদের দলে ভেড়ান। কিন্তু ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়ার পর ক্ষমতার দ্বন্দ্বে তাদের বেশির ভাগই আজ আর জাপায় নেই। যেমন নেই বিএনপিতে। সময় বুঝে আজ জিয়ার উপদেষ্টা, কাল এরশাদের উপদেষ্টা বা মন্ত্রী হয়েছেন অনেকে। নগদ ইনামের আশায় এরকম রাজপন্ডিতের (উপদেষ্টা) নজির আজও বিরল নয়। ক্ষমতার লোভে যারা ডিগবাজী দিয়ে জাপায় এসেছিলেন, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে তারাই সবার আগে উল্টো ডিগবাজী দিয়েছেন। কেউ বা মৃত্যৃ বরণ করেছেন, অবসর নিয়েছেন। ফলে জাপায় আজ ক্যারিয়ার পলিটিশিয়ান যাকে বলে সে রকম কেউ নেই বললেই চলে। ক্যারিশম্যার কথা বাদই দিলাম। ফলে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বই জাপার জন্য আজ বড় চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হলো ক্ষমতার রাজনীতিতে একইভাবে দলের গুরুত্ব বহাল রাখা।

Ershad
১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিচ্ছেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ/ ছবি: সংগৃহীত

 

এরশাদকে নিয়ে আলোচনা আছে, আছে সমালোচনা। কোনোটাই ভিত্তিহীন নয়। তিনি একটি নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতা দখল করেছেন। বিদ্যমান দলগুলোর অদূরদর্শীতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে নিজেই ৯ বছর রাষ্ট্র ক্ষমতায় থেকেছেন। সব সামরিক শাসক যা করেন এরশাদও তাই করেছেন। জিয়াউর রহমান বিএনপি করেছেন, এরশাদ করেছেন জাতীয় পার্টি। নয় বছর ক্ষমতায় থেকে বিদায় নিয়েছেন সত্য, কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতিতে এরশাদের গুরুত্ব কমেনি মোটেও। বরং ক্ষমতার রাজনীতিতে নিজের পাল্লা ভারি করতে এরশাদের বিকল্প শুধুই এরশাদ। আগামী দিনের ক্ষমতার রাজনীতিতে জাপা একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ থাকতে পারবে কিনা জাপা’র জন্য আপাতত এটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য অন্তত আগামী নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তবে ‘ক্ষমতা’, ‘রাজনীতি’ ও ‘কৌশলের’ সঙ্গে ভোটের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর বিষয়টি অনেকাংশেই নির্ভর করে। এ সম্পর্ক যেভাবে শিথীলতার দিকে যাচ্ছে তাতে তৃতীয় কোনো সহায়ক শক্তির রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতাও হয়তো ফুরিয়ে যাবে। তবে সে রাজনীতি আমাদের হিসাবের বাইরে। আমরা শুধু এটুকুই বলতে পারি, এরশাদ জাপায় যেমন অপরিহার্য ছিলেন, ক্ষমতার রাজনীতিতেও ছিলেন একই রকম অপরিহার্য।

Ershad
একাদশ জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ নিচ্ছেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ/ ছবি: সংগৃহীত

 

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য। এই উপমহাদেশে ব্যক্তিকেন্দ্রিক দলই বেশি বিকাশ লাভ করেছে। ভারতে যেমন কংগ্রেস, পাকিস্তানে মুসলিম লীগ, পিপলস পার্টি, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাপা। ভারতের বিজেপি অথবা বাংলাদেশের জামায়াত একটি ভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শ চর্চা করে। কাজেই প্রচলিত রাজনীতি থেকে তাদের রাজনীতি ভিন্ন, নেতৃত্বের বিষয়টিও ব্যক্তি বা পরিবার নির্ভর নয়। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ যদিও ভাসানী, সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে বিকাশ লাভ করেছে, কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দলের প্রয়োজনেই বঙ্গবন্ধু কন্যার হাতেই দলের দায়িত্ব তুলে দেয়া হয়। সেই থেকে প্রায় চার দশক আওয়ামী লীগও ব্যক্তি কেন্দ্রিক দলীয় রাজনীতির মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে।

দলের ভবিষ্যৎ পারিবারিক সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। আর বিএনপি ও জাপার শুরুই হয়েছে একজন ব্যক্তি বিশেষের রাজনৈতিক খায়েস মেটানোর জন্য। জিয়া ও এরশাদ যদি ধরেও নিই যে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে ক্ষমতা দখল করেছেন (ডকট্রিন অব নেসিসিটি), না হলে দেশ গোল্লায় যেতো ইত্যাদি, ইত্যাদি... তারপরও বাস্তবতা হলো তারা কেউ দেশের সেই কথিত ক্রান্তিলগ্ন পার হওয়ার পর ব্যারাকে ফিরে যাননি। গদি আঁকড়ে ধরে থেকেছেন। জিয়া নিহত হওয়ার পর বিচারপতি সাত্তার ও পরে খালেদা জিয়া বিএনপির হাল ধরেন। সেই থেকে আজও ব্যক্তি ও পারিবারিক দখলমুক্ত হতে পারেনি বিএনপি।

একই কায়দায় এরশাদ নয় বছর ক্ষমতায় থাকার পরও জাপা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ব্যক্তি এরশাদ থেকে জাতীয় পার্টি মুক্ত হতে পারেনি চার দশকেও। পতিত সামরিক ও স্বৈরশাসকরা ‘মরিবার পূর্বে মরিতে চান না’। তাই নিরাপদ ও স্বাভাবিক মৃত্যু নিশ্চিত করতেই তারা দলের সভাপতি বা উপদেষ্টার পদ আজীবন আঁকড়ে থাকেন। এরশাদের হয়তো এক্সিটওয়ে ছিল, কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতিতে তার প্রয়োজন ছিল এবং তিনিও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তা উপভোগ করে গেছেন। ক্ষমতার প্রতিটি কোনায়ই তিনি বিচরণ করেছেন।

সেনাপ্রধান, সিএমএলএ, রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রীর মর্যাদা সম্পন্ন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, বিরোধী দলের নেতা সব ক্ষেত্রেই তার সরব উপস্থিতি আমরা দেখি। সবকিছু যে তার প্রয়োজন ও ইচ্ছায় হয়েছে হয়তো সেরকমটি নয়। অনেকটা রাজনীতি ও ‘ক্ষমতা’র প্রয়োজনেই তার এই এদিক ওদিক, কখনো নিজের কখনো অপরের প্রয়োজনে। এখানেই এরশাদের অপরিহার্যতা। আর এজন্যই আমরা তাকে বলি ‘রাজনীতির দুষ্টু বালক’।

Ershad

সংসদে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে বক্তব্য দিচ্ছেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ/ ছবি: সংসদ টিভি 

 

স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের তিনটি বড় দলের মধ্যে জাপা আপাত একজন ব্যক্তির নেতৃত্ব থেকে মুক্ত হলো বটে। কিন্তু ব্যক্তি কেন্দ্রিকতা থেকে বের হয়ে নতুন করে পরিবারভূক্ত হলো বলেই মনে হচ্ছে। এতে আপতত হয়তো জাপা প্রাথমিক ধাক্কাটি সামলাতে পারবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে পার্টির নিয়তি নির্ধারণে তা কতটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবে তা সময়ই বলবে।

এরশাদের সমালোচনা আছে অনেক। কিন্তু নির্মোহ দৃষ্টিতে বললে এ সমালোচনা থেকে সবাই-ই কি মুক্ত? রাজনীতিতে এরশাদ একটি সিনড্রোম। এ সিনড্রোমে সব রাজনৈতিক দলই আক্রান্ত। এমনকি নাগরিক হিসেবে আমরাও কি সুবিধাবাদী নই? এরশাদ আমাদের সুযোগসন্ধানী, সুবিধাবাদী, ভোগবিলাসী ও ডিগবাজীর রাজনীতির আইকন। কিন্তু এরশাদ সিনড্রোম কি আমাদের মাঝেও নেই? এরশাদকে গালি দেওয়া সহজ, কারণ তিনি ক্ষমতাহীন এক ‘দুষ্টু বালক’। এরশাদের বিদায়ের পর রাজনীতিতে হয়তো সহসা সমালোচনা করার মতো লোকটি বিদায় নিলেন। কিন্তু তাতে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে কি? এরশাদের বিদায়ের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ভাড়ামি হয়তো কিছুটা কমবে, কিন্তু রাজনৈতিক দুষ্টামি বন্ধ হবে কি?

এরশাদুল আলম প্রিন্স: কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম।

‘সেই এরশাদ’, ‘এই এরশাদ’

‘সেই এরশাদ’, ‘এই এরশাদ’
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পুরনো ও সাম্প্রতিক ছবি

সাবেক রাষ্ট্রপতি, জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, যিনি এক সময়ের সেনাপ্রধান আর বর্তমানে 'প্রধান বিরোধী দলের নেতা', তার জীবন ও কর্মের মূল্যায়ন করা একই সঙ্গে সহজ এবং কঠিন।

সহজ এ কারণে যে, গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতায় এরশাদের স্বৈরতান্ত্রিক অবস্থান স্পষ্ট। এরশাদের ক্ষমতা দখল ও দশ বছরের স্বৈরশাসনের 'সেই' সময় সবার কাছেই প্রতিভাত। এ ব্যাপারে বিতর্ক বা তাকে বৈধতা বা ন্যায্যতা দেওয়া অসম্ভব।

কিন্তু 'এই' সময়ের এরশাদ বিশ্লেষকদের কাছে সহজে ব্যাখ্যা করার ব্যক্তি নন। তার কারাভোগ, রাজনীতিতে লেগে থাকার আগ্রহ এবং ক্রমশ প্রকাশিত বিভিন্ন মানবিক গুণাবলীর কারণে এক অন্য মাত্রার এরশাদকে দেখতে পাওয়া যায়।

এরশাদের মৃত্যুতে সবচেয়ে বিপদে যারা

অবশ্য এ কথাও পরিষ্কারভাবে বলা দরকার যে, এরশাদের ভালো কিছু কাজ থাকলেও তার খারাপ কাজগুলো জায়েজ হয়ে যায় না। ব্যক্তিগতভাবে আমি তা মনে করি না এবং লিখিতভাবেই তা উল্লেখ করেছি।

তারপরও বিস্ময় জাগে। নানা প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়। বিশেষত আমরা যারা রাজনীতি বিজ্ঞানের অধ্যয়ন ও চর্চায় ব্যাপৃত আছি, তাদেরকে রাজনৈতিক প্রপঞ্চ ও ব্যক্তিত্বের গতিশীলতার ওপর লক্ষ্য রাখতে হয়। তরুণ মার্কস আর পরিণত মার্কসের মধ্যে পার্থক্য রেখা টানতে হয়। একদার কট্টর সাম্প্রদায়িক নেতার জাতীয়তাবাদী-মানবতাবাদীতে রূপান্তরের কার্যকারণ নিরূপণ করতে হয়। আবার বাম, প্রগতিশীল, কমিউনিস্ট নেতার মৌলবাদী স্খলনের ব্যাখ্যাও দাঁড় করাতে হয়।

এরশাদকে এমন তুলনায় আনা হলে আমরা কেমন চিত্র পাব? স্বৈরাচার হয়েও তার কঠোরতার পাশাপাশি মানবিক উন্নয়নমূলক কিছু পদক্ষেপও আড়ালে থাকে না। সমালোচনার পরেও ওষুধ নীতি, ভূমি সংস্কার, বিকেন্দ্রীকরণ, ধর্মীয় বিষয়ের গুরুত্ব তাকে অনেক মানুষের প্রিয়ভাজন করেছে।

যদিও এরশাদের রাজনীতির ৪০ বছরের পুরো সময়ই ব্যক্তিস্বার্থ ও ক্ষমতাকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ আর বিএনপির অনৈক্যের সুযোগ নিয়ে তিনি দশ বছর ক্ষমতায় থাকতে পেরেছিলেন এবং এখনও বিএনপির রাজনৈতিক ভুলের সুযোগ নিয়ে সামনে চলে আসতে পেরেছেন। দ্বিদলীয় রাজনীতির প্রকৃত বিকাশ হলে তার রাজনৈতিক জীবন এতদূর প্রলম্বিত হয়ে আসতে পারতো কি-না, সন্দেহ।

একজন এরশাদ

যেভাবেই হোক তিনি ক্ষমতার দশ বছর পর আরও তিরিশ বছর রাজনীতিতে থেকেছেন। এ সময়কালে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির সাথেই ছিলেন। ধর্মীয় অধিকারের পক্ষে ছিলেন। এবং সংসদীয় রাজনীতির কাঠামোর মধ্যেই থেকেছেন, যদিও সেই সংসদ ও নির্বাচন নিয়ে বিএনপির আপত্তি রয়েছে।

আপত্তি বা সমালোচনা যাই থাকুক, 'স্বৈরাচারী' এরশাদ গণতান্ত্রিক নির্বাচন, সংসদীয় ব্যবস্থা ইত্যাদিকে পাশ কাটিয়ে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি করছেন, এমন দৃষ্টান্ত কেউ দেখাতে পারবে না। নিজের এবং দলের স্বার্থে তিনি রাজনীতি করেছেন, এমনটি সবাই করে। ফলে এ বিষয়ে সমালোচনার কিছু থাকতে পারে না। তিনি তার ও তার দলের স্বার্থে রাজনীতি করে মহাভারত অশুদ্ধ করেননি।

আর যে কাজটি তিনি সন্তর্পণে করেছেন, তা হলো মানব কল্যাণ ও মানবসেবা। বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম এবং অন্যান্য গণমাধ্যমেও খবরগুলো প্রকাশ পেয়েছে, যাতে দান, সাহায্য ছাড়াও সম্পত্তি বিলি-বণ্টনের কথা প্রকাশ পেয়েছে। এরশাদ ব্যক্তিস্বার্থ সামনে রেখে রাজনীতি করলেও ব্যক্তিগত সম্পদের পাহাড়ের স্তূপ করেননি। ক্ষমতালোভী স্বৈরাচারের মধ্যে তাকে দেখা যাচ্ছে বিরল ব্যতিক্রম স্বরূপ।

এরশাদ আমলে আমরা যখন কিছুটা লেখালেখি ও সাংবাদিকতা করেছি, তখন তার কাছের লোকদের বরাতে জেনেছি, তিনি পারতপক্ষে কাউকে না করতে বা ফিরিয়ে দিতে পারেন না। তার কাছ পর্যন্ত পৌঁছে গেলে কার্যোদ্ধার সম্ভব, এমন একটি ভাষ্যও তখন ঢাকায় প্রচলিত ছিল। এ সুযোগে বহুজন চাকরি-বাকরি, প্লট, প্রমোশন নিয়েছেন। অনেক নারীও এরশাদের এই নমনীয়তার সুযোগ নিয়েছেন।

এরশাদ: জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ পেরিয়ে

শাসক হিসেবে এসব পক্ষপাত অবশ্যই মানবীয় দুর্বলতা ও নৈব্যক্তিকতার অভাব হিসেবে বিবেচনার যোগ্য। রাষ্ট্রীয় বা প্রশাসনিক বিষয় ব্যক্তিগত তোষামোদির মাধ্যমে বিলি-বণ্টন করা ঘোরতর অন্যায় এবং সুশাসনের বিপরীত ও স্বৈরমানসিকতার পরিচায়ক।

কিন্তু এরশাদ যখন ক্ষমতায় নেই, তখন নিজের সম্পত্তি বিলিয়ে দিলে তাকে কেউ সমালোচনা করতে পারে না। তিনি যে দিতে জানেন, দিতে চান, তা আগে ও বর্তমানে তিনি প্রমাণ করেছেন। এই এরশাদকে মানুষ অস্বীকার করবে কেমন করে?

ব্যক্তিগতভাবে এরশাদের সঙ্গে ক্ষমতাকালে ও ক্ষমতার পরে একাধিকবার আমার সাক্ষাত হয়েছে। সেটা রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, বঙ্গভবন, ধানমণ্ডির কবিতা কেন্দ্র, কারও বাসা, অফিস বা কোনও বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠানে হলেও আমি তার নিপাট ভদ্রতা, সৌজন্যবোধ ও সম্মানজনক আচরণের চাক্ষুষ সাক্ষী। পরে যখন তিনি জানলেন, ‘সাপ্তাহিক রোববার’ -এ তাকে স্বৈরাচার বলে আমি স্বনামে নিয়মিত লিখেছি, তখনও তার আচরণের বিন্দুমাত্র পরিবর্তন ঘটেনি।

বিশ্ব বেহায়া
এরশাদকে নিয়ে কামরুল হাসানের ব্যাঙ্গচিত্র/ সংগৃহীত

 

এরশাদকে স্বৈরাচার বলে আমরা আন্দোলন করেছি, তার বিরুদ্ধে লিখেছি, পটুয়া কামরুল হাসানের বিখ্যাত ব্যাঙ্গচিত্র 'বিশ্ব বেহায়া'র পোস্টার সেঁটেছি ক্যাম্পাসের দেওয়ালে দেওয়ালে। তার মৃত্যুর পর চট করে তার সম্পর্কে বিদ্যমান ধারণা ভেঙে যায় না।

শুধু মনের মধ্যে অলক্ষ্যে একটি প্রশ্ন উঁকি দেয়, 'সেই এরশাদ’ আর 'এই এরশাদ’ কি একজনই? ক্ষমতা দখলকারী এরশাদ আর রাজনীতি শেষে চিরবিদায় নিয়ে চিরদিনের মতো চলে যাওয়া এরশাদ কি একজনই? সহজেই এসব প্রশ্নের উত্তর মেলে না।

ব্যক্তি ও রাজনীতিক এরশাদের প্রকৃত তুলনামূলক মূল্যায়ন করতে পারবে ইতিহাস। ইতিহাসের সেই রায় জানার জন্য আমাদের তাকিয়ে থাকতে হবে মহাকালের দিকে।

ড. মাহফুজ পারভেজ: কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র