Barta24

রোববার, ২১ জুলাই ২০১৯, ৫ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

শীতের মজা ও সাজা এবং পোড়ের আগুনের দহন!

শীতের মজা ও সাজা এবং পোড়ের আগুনের দহন!
ছবি: বার্তা২৪
প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম  


  • Font increase
  • Font Decrease

এবারের শীতে নেই তেমন কোনো মজা, কোনো আমেজ! কারণ, বাচ্চাদের পরীক্ষা যেন শেষ হতেই চাচ্ছে না! একটার স্কুলের পরীক্ষা শেষ হতেই আরেকটার কলেজেরটা শুরু আর সেটার যখন শেষ হবে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরু হবে আর এমনি করে করে শীতকালটা ফুরিয়ে যাবে। তাই পরিবার নিয়ে কোথাও বের হতে পারবেন না বলে নিচের ভাবীসাব মুখটা গোমড়া করে সাফ সাফ জানিয়ে দিলেন। শুনে মনে হলো- এবারের শীতে শহরের বাইরে দূর গাঁও-গেরামের নির্ভৃত কোনো ছায়া ঢাকা, পাখি ডাকা জায়গায় ভ্রমণে যেতে না পেরে তার জীবনটাই বৃথা হয়ে গেল। হবেই না বা কেন? জন্ম তো সেই কাদা মাখা, স্নেহঢাকা পল্লী মায়ের আদরের আঁচলে। এটা একজন ভাবীর মনের আক্ষেপের কথা হলেও আমার মনে হয় হাজার হাজার শহুরে দালানের বস্তিতে বাস করে গ্রামের জন্য হা-পিত্যেশ করা ভাবীদের মনের কথা তিনি বলে দিয়েছেন।

যাহোক, গ্রাম সবসময় মানুষকে টানে। যদিও গ্রামগুলো ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। কোনো পরিবারের একজন উচ্চশিক্ষিত হলেই হলো, তিনি আর গ্রামে থাকার অনুপ্রেরণা খুঁজে পাবেন না। উচ্চশিক্ষিত হলেই শহরে গিয়ে চাকরি করতে হবে। তার জন্য গ্রামের চিরচেনা শান্তিময় পরিবেশ যেন বিষিয়ে ওঠে। কারণ গ্রামে নেই কোনো অফিস, নেই কোনো হাসপাতাল অথবা বাসস্থানের অবকাঠামো।

শুধু তাই নয়-জেলা শহরে যে হাসপাতাল বা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠার কথা সেটাও জায়গা নিয়েছে রাজধানী ঢাকার কোনো আবাসিক এলাকার গলিতে বা ঘিঞ্জি কাঁচা বাজারের ছাদে! তাইতো একটি রাজধানী শহরে যদি পাঁচ বছরের মধ্যে অপরিকল্পিতভাবে শুধু ব্যবসায়িক ধান্ধায় একশ’টি ব্যক্তিগত বিশ্ববিদ্যালয়, পাঁচশ’টি ব্যক্তিগত মার্কেট ও হাসপাতাল গড়ে ওঠে তাহলে শিক্ষা ও চিকিৎসা নেয়ার জন্য প্রতিদিন কত লক্ষ মানুষের আনাগোনা ঘটে এবং কেমন যানবাহনের জট লেগে যায়-তা ভুক্তভোগী মাত্রই ভাল জানেন। তাইতো মানুষ সহজাত তাগিদেই একটু সবুজের দিকে ফিরে যেতে চায়। হোকনা তা কিছুদিনের জন্য!

গ্রামীণ শীতকাল অনেক কিছুর সাথে উপহার দেয় টাটকা শাক-সব্জী ও মিষ্টি খেজুরের রস। জীবিকার তাগিদে গ্রাম ছেড়ে বাধ্য হয়ে শহরে বসতি গেড়ে নেয়া অনেকে গ্রামের রসের পিঠা, ভাপা পিঠার কথা ভুলতে পারেন না। তাইতো সেটা যখন শহরের রাজপথের পাশে ময়লা ধুলোবালিতে কোনো ফেরিওয়ালাকে বানাতে দেখেন- তক্ষুনি তার মনে জেগে ওঠে গ্রামের কথা। কেউ কিনে সেখানেই খেতে শুরু করে দেন কেউবা কিনে বাসায় নিয়ে যান। ফেরিওয়ালার ঠেলা গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে কিনে অথবা অভিজাত দোকানে গিয়ে বসে যত বাহারি ভাপা-পুলি খাই না কেন সেটাতো শীতের সময় গ্রামে তাজা খেজুরের রস ও নতুন চালের তৈরী পিঠা ‘পোড়ে’জ্বালানো আগুনের পাশে বসে খাওয়ানোর সংগে তুলণীয় হতে পারে না। আর সেই পিঠা যদি মা নিজ হাতে তৈরী করে মুখের কাছে এগিয়ে দিয়ে বলেন- বাবা, আরেকটা খেয়ে দেখ না! তাহলে কেমন হয়? স্বর্গ তো দুনিয়াতেই মনে হবে-তাই না?

এছাড়া, পোড়ের ছাইচাপা আগুনে মিষ্টি আলু পোড়ানো, ভুট্টা, মটরশুটি বা নোয়া ডাং (এক ধরনের লম্বা লাল ধান) ধানের খৈ ফুটিয়ে গরম গরম খাওয়া- ইত্যাদি তো অনেকের মধুর সুখস্মৃতি বৈ কিছু নয়! আর এগুলো করতে গিয়ে অনেকে আত্মভোলা হয়ে যায়। বিশেষত: ছোট শিশুরা। তারা হাত-পা পুড়িয়ে ফেলে।

সাধারণত: শীতকালে বেশি বয়স্ক মানুষেরা বেশি ঠান্ডা অনুভুব করেন। তাদের গায়ে গরম কাপড়ের সাথে কাঁথা-কম্বল জড়িয়ে নিতে দেখা যায়। এছাড়া সেগুলো পরেই তাদের অনেকেই দীর্ঘ সময় পোড়ের আগুনের পাশে বসে থাকতে পছন্দ করেন। শহরের মানুষ অথবা নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানেন না ’পোড়’ অর্থ কি। ’ পোড়’ বলতে সাধারণত: ধান-গমের নাড়া, খড়, ভুট্টা ও খেসারী কলাইয়ের শুকনো ডাণ্ডা, গাছের ঝরাপাতা, গোবরের ঘষি, শুকনো ঘাস, ইত্যাদি দিয়ে আগুন জ্বালানো হয়ে থাকে। এলাকাভেদে এসব উপকরণের ভিন্নতা লক্ষণীয়। অনেকগুলো উপকরণ একসংগে জড়ো করে বাড়ির ভেতর বা বাইরের আঙ্গিনায় ‘পোড়’ বা আগুনের ঢিবি বানানো হয়। ‘পোড়ে’-র মধ্যিখানে বেশকিছু ধানের তুষ দিয়ে দেয়া হয় যাতে সারাদিন আগুন জ্বালিয়ে রাখা যায়। কৃষাণ-কৃষাণী পরিবারের সবাই সকালে ‘পোড়ে’-র চতুর্দিকে গোল হয়ে বসে আগুন পোহান।

গ্রামে বেশিরভাগ বাড়িতে এখন টিনের চালা দেয়া ঘর। এ ঘরগুলোতে রাতে টিন ঠাণ্ডা হতে হতে শেষরাতে আরো বেশি ঠাণ্ডা অনুভুত হয়। তাইতো অনেকেই বিছানা ছেড়ে কাকাডাকা ভোরে খড়কুটা জ্বালিয়ে ‘পোড়ে’-র আগুনের তাপে শীত নিবারণ করার চেষ্টা করে থাকেন। আগুন জ্বালানোর এই কৌশলটি গ্রামের অতি পুরাতন ঐতিহ্যও বটে।

‘পোড়ে’-র আগুন পোহানো মজার ব্যাপার। এটা একটা অতি পুরনো গ্রামীণ কৃষ্টি। তবে বিপদ হলো- প্রতি শীতে আগুন পোহাতে গিয়ে অজান্তে শরীরের কাপড়ে আগুন লেগে অনেকেই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। গত বছর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ইতোমধ্যে ২.৬ ডিগ্রী সেলসিয়াসে নেমেছিল। আগুন পোহাতে গিয়ে দুর্ঘটনার সংখ্যা অনেক বেশি হয়েছিল। বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম ও লালমণিরহাট জেলায় শীতে আগুন পোহাতে গিয়ে ৬ জনসহ দেশের অন্যান্য স্থানে বাচ্চা ও বৃদ্ধাসহ ২২ জন দগ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন এবং দগ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ৪০০ জন বার্ণ ইউনিটে ভর্তি হয়েছিল।

এবছর শীতের শুরুতেই আগুন পোহানোর কারণে দেশের কয়েক জায়গায় দুর্ঘটনার খবর জানা গেছে। শীত নিবারণে আগুন তাপাতে গিয়ে গত তিনদিনে দেশের উত্তরাঞ্চলে দুজন মারা গেছে এবং হাসপাতালে দগ্ধ রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। তবে এটা যেন আর না ঘটে সেজন্য সবাইকে সতর্কতার সাথে পোড়ের পাশে বসতে হবে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কগণ যাতে পোড়ের আগুন তাপানো পোহানো থেকে বিরত থাকেন সেজন্য তাদেরকে পর্যাপ্ত গরম কাপড় ও গরম পানীয় ও খাবার সরবরাহ করতে হবে। শৈত্য প্রবাহের আগাম সংবাদ গ্রমে-গঞ্জে মাইকিং করে প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে।

প্রতি বছর শীত এলেই কিছু মানুষ নানা সংগঠনের নামে শীতার্তদের নাম ভাঙ্গিয়ে চাঁদা তুলে থাকেন। সেসব অর্থ থেকে যৎসামান্য শীতার্তদের জন্য ব্যয় করা হয়। সেটাও ঘটে বড় বড় শহরের আশে-পাশে। ফলে শহরের একজন দরিদ্র বা বস্তিবাসী একাই অনেকগুলো ত্রাণের কম্বল বা অর্থ পেয়ে যান।

এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে- একজন ব্যক্তি বারংবার হাত পেতে বিভিন্নজনের নিকট থেকে অনেকগুলো কম্বল পেয়েছেন । সেগুলো বাজারে নিয়ে গিয়ে পুনরায় ঐ কম্বলের দোকনে স্বল্পদামে বিক্রয় করে দিয়েছেন ! এতে দেখা যায়- গ্রামের হতদরিদ্র, শীতার্ত মানুষ কিছুই পাচ্ছে না অথচ শহরের দরিদ্র একই মানুষ বার বার সুযোগ নিচ্ছে। মুঠোফোনের এই যুগে এভাবে শহরের দরিদ্র আত্মীয়দের নিকট থেকে এ ধরনের সুযোগের কথা জেনে নিয়ে গ্রামের দরিদ্র মানুষেরা প্রতিদিন বেশী কিছুর আশায় শহরগুলোতে স্থানান্তরিত হচ্ছে।

তাই শুধু শহরের বস্তি ও পার্কে নয়, গরম কাপড় নিয়ে আজই চলুন বন্টন করতে যাই দূর গাঁও-গেরামে যেখানে অজশ্র অশীতিপর শীতার্ত মানুষ এই কনকনে শীতে একটু উষ্ণতার পরশ পাবার আশায় আঁকুপাকু করছে।

আমাদের দেশে ধনী মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। পাশাপাশি হতদরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এক হিসেবে দেশে এখনও তিন কোটি মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করছে। এদের বেশিরভাগ গ্রামীণ ভূমিহীন হতদরিদ্র অথবা চরম দরিদ্র শ্রেণির। যাদের মৌলিক মানবিক চাহিদা অপূরিত থাকে ও যারা মৌল-মানবিক সেবাদান প্রক্রিয়ায় নিজ অংশগ্রহণ অক্ষমতা বিবেচনায় বাদ পরে যায়। যেমন-খাদ্য ও চিকিৎসা সেবা কিনতে না পারা। উন্নত দেশগুলোতে শহুরে মানুষেরা প্রতিবছর নিজেদের পুরনো জিনিস, কাপড় ইত্যাদি স্বল্পমূল্যের খোলা বাজারে, পার্কে বা গ্যারাজ সেলে রেখে দেয়। স্বল্প আয়ের মানুষেরা সেগুলো পানির দামে অথবা বিনামূল্যে সংগ্রহ করে।

আমাদের ধনী পরিবারগুলোর আলমারীতে যুগ যুগ ধরে অব্যবহৃত পুরনো দ্রব্য, কাপড় ইত্যাদি থাকলেও কখনও গরীবের জন্য হৃদয় গলে না। অথচ, দান-খয়রাত মুসলিমদের ধর্মীয় অনুষঙ্গ। তাই সমাজের সামর্থ্যবান সবাইকে আহবান করবো নিজেদের অপ্রয়োজনীয় অব্যবহৃত কাপড়-সামগ্রীগুলো মানব কল্যাণে পুণ:ব্যবহারের জন্য বিতরণের ব্যবস্থা করুন। এজন্য নিকটস্থ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্কাউট বা রোভার-রেঞ্জার, বি.এন.সি.সি. ইউনিটগুলোকে টেলিফোন করে আপনার নিকট থেকে সংগ্রহ করতে উৎসাহিত করুন। তারা নিজ দায়িত্বে গ্রামের গরীব দুখিদের নিকট সেগুলো পৌছানোর ব্যবস্থা করতে পারে। এভাবে আমরা সবাই শীতের মজা পেতে পারি এবং শীতের সাজা তথা ঠান্ডা ও ‘পোড়ের আগুনের’ সমূহ বিপদ থেকে গ্রামের গরীব দুখিদের রক্ষা করতে পারি।

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

আপনার মতামত লিখুন :

যমুনার পেটে জমি, পাহাড়ের পাদদেশে প্লাবন

যমুনার পেটে জমি, পাহাড়ের পাদদেশে প্লাবন
প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

সারা দেশে আষাঢ়ের কান্না যেন থামতেই চাইছে না। অতিবৃষ্টিতে চারদিকে বন্যা শুরু হয়েছে; শুরু হয়েছে শ্রাবণ। শ্রাবণের কালো মেঘ কী বার্তা নিয়ে আসবে, জানি না!

আষাঢ়ের শেষ সপ্তাহে এসে হঠাৎ করে প্রৃকতি বিরূপ হয়ে উঠেছে। পাহাড়ি ঢল, নদীভাঙন ও বন্যা একসঙ্গে শুরু হয়েছে। চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, কক্সবাজার, বান্দরবানে অতিবৃষ্টিতে বহু পাহাড় ধসে নিচে নেমে গিয়েছে। প্রৃকতি এতে ক্ষান্ত হয়নি। পাহাড়ি ঢল বার বার ধেয়ে আসছে।

রাস্তা, বাড়ি-ঘর ভূমিধসের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে। ধান-পাট, শাক-সবজি ডুবে যাচ্ছে। মাছের খামারের মাছ ভেসে গিয়ে মাছ চাষিদের মাথায় হাত পড়েছে। বৃষ্টি ও সাগরের নিম্নচাপ মিলে মানুষের এক চরম ভোগান্তি শুরু হয়েছে।

পাহাড়ের পাদদেশে পুনঃপুনঃ এই প্লাবনপানি ও মাটিধসের দুর্যোগ এখন আতঙ্ক। তাই ভুক্তভোগীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বারবার মূল শহরের রাস্তায় থৈ থৈ পানি সবাইকে প্রহসন করছে। কৌতুক করে বলা হচ্ছে- ‘কী সুন্দুইজ্যা চাঁটগা নগর’, ‘ডুবে থাকা’ চট্টগ্রাম নগরীর সৌন্দর্য্য এই বর্ষায় আরো কয়েকবার দেখা যাবে সন্দেহ নেই’ ইত্যাদি।

উত্তরের জেলা লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, শেরপুর থেকে ভারত ও ভুটানের পাহাড়-পর্বতশ্রেণি বেশি দূরে নয়। ওপরে বেশি বৃষ্টি হলেই ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রে পানি বেড়ে গিয়ে অকাল বন্যা দেখা দেয়। পূর্বে সিলেটে নেমে আসে আসাম ও শিলংয়ের পাহাড়ি ঢল। আগে প্রাকৃতিকভাবে এই ঢলের পানি নদী দিয়ে সাগরে চলে যেত। হাওড়ের মানুষ কৃত্রিমভাবে ধান বা মাছের চাষও করতো না। তাই ঢলের পানির ক্ষতিকর দিকের কথা তেমন শোনাও যেত না।

এখন চারদিকে নানা প্রকার উন্নয়ন শুরু হয়েছে। অপরিকল্পিত ও অযাচিত উন্নয়নের নামে প্রকৃতির ওপর মানুষের নির্দয় হস্তক্ষেপ শুরু হয়েছে। মানুষ প্রয়োজন পূরণের নামে প্রকৃতিকে ধ্বংস করে চলেছে। তাই প্রকৃতিও মানুষের প্রতি নির্দয় হয়ে নিষ্ঠুর আচরণ শুরু করেছে। ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রে পানি বেড়ে গিয়ে বন্যার সাথে প্রচণ্ড নদীভাঙন শরু হয়েছে। তিস্তা-যমুনার পেটে ফসলি জমি বিলীন হয়ে বাস্তহারা মানুষের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গেছে। আশঙ্কার কথা হলো- নদীভাঙনে বাস্তহারাদের চাপে পুরো উন্নয়ন প্রক্রিয়াই বাধাগ্রস্থ হতে পারে।

পরিবেশ কারো একার সম্পত্তি নয়। পরিবেশ সারা পৃথিবীর সব মানুষের সম্পত্তি। তাই পরিবেশ সংরক্ষণে নীতি নির্ধারণে সবার কথা শোনা উচিৎ।

আমাদের চারদিকে আরো অনেক সমস্যা বিরাজমান। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ (হ্যাজার্ডস যেমন-সাইক্লোন, বন্যা) ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় (যেমন- ফসলহানি, প্রাণহানি) এত বেশি ক্ষতিকর যে, প্রতিবছর আমাদের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে অনেক পেছনে ঠেলে দেয়। এগুলোকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখা উচিৎ নয়। মনুষ্যসৃষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয় (ক্যালামিটিস/ হ্যাজার্ডস্) ঠেকাতে সব মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে আমাদের নিজেদের চেষ্টার মধ্যে একাই করব, একাই খাব নীতি পরিহার করা উচিৎ। অন্যথায়, একজন তৈরি করবে অন্যজন নষ্ট করার পাঁয়তারা করতে পারে- তারা দেশি হোক বা বিদেশি লবিস্ট হোক।

উন্নয়নের নামে পাহাড় কাটা, অবাধে গাছ নিধন করা, কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা, নদী দখল ও ভরাট করে স্থাপনা বানিয়ে স্বাভাবিক পানি চলাচলের পথ রুদ্ধ করা- এসব আজকাল যেন কোনো অপরাধই নয়! পাহাড়ে প্রয়োজনীয় গাছ নেই- তাই সামান্য বৃষ্টিতে মাটি গলে ধসে মানুষের মাথার ওপর পড়ছে। ওই কাদামাটি নিকটস্থ নদীতে গিয়ে নদীকে ভরাট করে নাব্যতা নষ্ট করে দিচ্ছে।

উন্নয়নের নামে পাহাড়-সমতলের সব বড় বড় গাছ কেটে উজাড় করে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি সরকারি রাস্তার পাশের তাল- নারকেলসহ ছায়াদানকারী বড় বড় গাছ কেটে সাবাড় করায় সারাদেশে বজ্রপাত বেড়ে গেছে এবং ভয়ংকরভাবে মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এখন বজ্রপাতে মৃত্যুর ভয়ে কৃষকরা মাঠে কাজ করতে যেতে ভয় পায়।

এছাড়া উত্তরাঞ্চলে ক্রমাগতভাবে ধরলা-তিস্তা-যমুনার পেটে ফসলি জমি বিলীন হয়ে বাস্তহারা মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে এবং চট্টগ্রামে পাহাড়ের পাদদেশে পুনঃপুনঃ প্লাবনপানি ও মাটিধসের দুর্যোগ মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়েই যাচ্ছে। এতে কারো যেন কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। এ অবস্থা চলতে থাকলে সেটা দেশের পুরো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে ভণ্ডুল করে দিতে পারে। এসব মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুতি কি আমাদের আছে?

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের একটি মন্তব্য আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি বলেছেন 'সরকারি কর্মকর্তারা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না'। এ কথাটি মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে সরকারি কর্মকতাদের দুর্নীতি আজ নতুন নয়। তবে সব কর্মকর্তাও এক নয়। সংখ্যায় সীমিত হলেও  অনেক অফিসার আছেন যারা সততার সাথে অনেক কষ্টে  জীবনযাপন করেন। তাই সকলকে এক পাল্লায় মাপা ঠিক হবে না।

বাংলাদেশে দুদক নিরপেক্ষতা হারিয়েছে অনেক আগে, তবে কিছু দিন পূর্বে ছোটখাটো দুর্নীতি ধরতে সোচ্চার দেখে আমরা কিছুটা হলেও খুশি হয়েছি। এ জন্য যে এবার অন্তত দুদক চেয়ারম্যান নিজেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঠিক সময়ে ক্লাস শুরু হয় কিনা বা সকল শিক্ষক সময়মত স্কুলে আসছেন কিনা তা যাচাই করতে। 

আমরা মনে করেছি, তিনি একবার যেহেতু ঘর থেকে বেরিয়েছেন, বাংলাদেশের সমাজ থেকে দুর্নীতি দূর না হওয়া পর্যন্ত আর ঘরে ফিরবেন না। কিন্তু কোনও অদৃশ্য কারণে, বোধহয় তিনি বুঝতে পেরেছেন, সরকারি কর্মকতা, রাজনীতিবিদের দুর্নীতি থামানো অসম্ভব। তার কাছে তো অনেক উদাহরণ আছে।

যাক সেসব কথা। এবার আলোচনা করা যাক, তিনি কেন বলেছেন যে সরকারি কর্মকরা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না। তিনি কি আসলে সরকারি কর্মকর্তাদের ভয় পেয়েছেন?  নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে।

কারণ ব্যাখ্যার আগে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা সম্পর্কে দুই-চার কথা না বললেই নয়। ওনারা সরকারিভাবে সে বৃটিশ আমল থেকে সুরক্ষিত। ওনারা সমাজের উপরে থাকেন। ওনাদের পল্লীর নাম ভদ্রপল্লী। ওনাদের সাথে ঈশ্বরের যোগাযোগ। সব কিছুই ওনারা নির্মাণ ও পরিচালনা করেন। সকল সুযোগ-সুবিধা ওনাদের জন্য। এ কারণে ওনাদের আচরণে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

এ জন্য তাদের সঙ্গে জনগণের একটা দুরত্ব কাজ করে। ফলে তাদের সম্পর্কে দুদক চেয়ারম্যানের মন্তব্যের পেছনে কোনো কারণ আছে কিনা, তা জানার আগেই পত্র-পত্রিকা,  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দার ঝড় ওঠে। আসলে দুদক চেয়ারম্যান কী বোঝাতে চেয়েছেন বা জনগণ কী বুঝেছে তা পরিষ্কার নয়।

আমি যদি ভুল না বুঝে থাকি, এখানে দুদক চেয়ারম্যান অর্থনৈতিক দুর্নীতিকে বুঝাননি। তিনি বুঝাতে চেয়েছেন, অনেক সরকারি কর্মকর্তা নিজের অনিচ্ছায় বা ভালো  উদ্দেশ্যে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে কারো ক্ষতি হতে পারে। এ জন্য ঐ কর্মকতাকে দুর্নীতি পরায়ণ বলা যাবে না। এটাকে দুদক চেয়ারম্যান 'সরল বিশ্বাস' বলেছেন। যদি ঐ কর্মকর্তা  ইচ্ছাকৃত ভুল করেন বা টাকার বিনিময়ে করেন বা কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য করেন, তা সরল বিশ্বাস নয়। এখানে অসততা আছে। এটাই দুর্নীতি।

আমার  হয়তো বুঝতে ভুল হতে পারে আর যদি হয়ও তা কিন্তু সরল বিশ্বাসে। আমি এ বিষয়টি এ জন্যই উপস্থাপন করলাম, কারণ দুদক চেয়ারম্যানের কথার অর্থ যদি সরকারি কর্মকর্তারা ভুল বোঝেন, তাহলে তো সর্বনাশ! তারা তো সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা শুরু করবেন। অবস্থা তখন হবে, ‘একদিকে নাচুনি বুড়ি অন্য দিকে ঢোলের বাড়ি’-র মতো। আমার এ লেখা শুধু ওইসব দুর্নীতি পরায়ণ সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য।

অতএব, দয়া করে সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা থেকে বিরত থাকুন।

ড. মো. কামাল উদ্দিন: প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন: সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি অপরাধ নয়: দুদক চেয়ারম্যান

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র