Barta24

রোববার, ২১ জুলাই ২০১৯, ৫ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

শেখ হাসিনা মন্ত্রিসভার ঐতিহাসিক বাসযাত্রা

শেখ হাসিনা মন্ত্রিসভার ঐতিহাসিক বাসযাত্রা
মন্ত্রীদের বাসে করে টুঙ্গিপাড়ায় যাত্রা, ছবি: সংগৃহীত
ড. মাহফুজ পারভেজ
কন্ট্রিবিউটিং এডিটর
বার্তা২৪.কম


  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশে তো বটেই, উপমহাদেশে এমন ঘটনা বিরল। উপমহাদেশ ও উন্নয়নশীল দেশে রাজনৈতিক তারকা-সম মন্ত্রীরা কখনোই সাধারণ গণপরিবহণ তথা বাসে চড়েন না। তারা যাওয়া-আসা করেন ব্যক্তিগত দামি গাড়িতে। বিশেষ নিরাপত্তা প্রহরায়। পুলিশ প্রটোকল ও প্রটেকশনে বিরাট লটবহর পেছনে নিয়ে তারা চলেন জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে। লাল বাতি জ্বালিয়ে হুইসেল বাজাতে বাজাতে মন্ত্রীদের চলাচল বাংলাদেশের মানুষ দেখে এসেছে।

সেই গতানুগতিক ধারায় বিরাট ব্যত্যয় ঘটলো এবার। চতুর্থ বার নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের বলেছিলেন মাটি ও মানুষের সঙ্গে থাকতে। নেত্রীর নির্দেশনার প্রেক্ষিতে মন্ত্রীরাও গণমানুষের কাছে এবং এলাকা ও মাটির পাশে থাকার অঙ্গীকার জানিয়েছেন। শেখ হাসিনা মন্ত্রিসভার ঐতিহাসিক বাসযাত্রার মাধ্যমে নেতাদের জনসম্পৃক্ত থাকার নগদ প্রমাণ পাওয়া গেল।

বিরল দৃষ্টান্তও স্থাপন করলো শেখ হাসিনা মন্ত্রিসভার সদস্যরা। ঐতিহাসিক বাসযাত্রার মাধ্যমে শপথ গ্রহণের পরদিন সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে মন্ত্রী পরিষদের সদস্যদের গমনের ঘটনাটি চিহ্নিত হয়েছে অভিনব ও উদ্দীপক প্রসঙ্গ রূপে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা মঙ্গলবার (৮ জানুয়ারি) সকালে ধানমন্ডিতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে তারা সাভারে গিয়ে জাতীয় স্মৃতিসৌধে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

মন্ত্রিসভার সদস্যদের জন্য বরাদ্দ পতাকাওয়ালা গাড়ি সোমবার (৭ জানুয়ারি) শপথের আগেই তাদের ঠিকানায় পৌঁছে গিয়েছিল। তবে সাভারে যাওয়ার সময় সেই গাড়ি সঙ্গে নেননি তারা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়া মন্ত্রিসভার বাকি ৪৬ সদস্যকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর থেকে সাভারে নিয়ে যাওয়া হয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত চারটি মিনিবাসে করে। স্মৃতিসৌধ থেকে বাসে করেই তারা ঢাকায় ফিরে সংসদ ভবনে নামেন। আসন সঙ্কুলান না হওয়ায় বাসের দুই সারি আসনের মাঝে ফাঁকা জায়গায় বাড়তি আসন জুড়েও বসতে হয় কয়েকজনকে।

মন্ত্রিসভার সদস্যরা মিডিয়াকে জানান, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ছাড়া বাকি সবাই আমরা বাসে করে গিয়ে আবার বাসে করে ফিরেছি। আগামীকালও আমরা বাসে করেই টুঙ্গীপাড়া যাব বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে।’

বাংলাদেশের মন্ত্রীরা প্রটোকলের সুবিধা পেয়ে বিভিন্ন সময়ে উল্টোপথে গাড়ি নিয়ে গিয়ে সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন। মন্ত্রীর গাড়ি চলাচলের জন্য ছাত্র-ছাত্রী ও রোগীদের ভোগান্তির খবরও কখনো কখনো সংবাদ মাধ্যমে এসেছে। মন্ত্রিসভার সব সদস্যের একসঙ্গে বাসে চড়ে কোথাও যাওয়ার এমন ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল। সম্ভবত উপমহাদেশ ও উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রেও ঘটনাটি উদাহরণ সৃষ্টিকারী।

ইউরোপ-আমেরিকার উন্নত গণতন্ত্র ও নাগরিক নিরাপত্তার দেশে মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীকে বাসে, ট্রেনে বসে বা দাঁড়িয়ে চলাচল করতে দেখা গেছে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে লাইন দিয়ে হাসপাতাল, ব্যাঙ্ক বা সরকারি অফিসের সারতেও দেখা গেছে মন্ত্রী, এমপিদের। এমন খবর ও ছবি দেখে মানুষ অবাক হয়েছে। ভেবেছে, বাংলাদেশে এমন চিত্র কবে দেখা যাবে!

ঠিক সে রকমের না হলেও শেখ হাসিনার নতুন মন্ত্রিসভার ঐতিহাসিক বাসযাত্রা তেমনই একটি পজিটিভ এবং প্রো-পিপল ইমেজ তৈরি করেছে। উপনিবেশিক শাসনের কু-অভিজ্ঞতায় জর্জরিত দেশে মন্ত্রীদের ঔপনিবেশিক মানসিকতা ভেঙে জনতার কাতারে দাঁড় করানোর একটি সাহসী-প্রতীকী পদক্ষেপ বলা যায় এই ঘটনাকে। সন্দেহ নেই, জনসেবকদের জনবাহনে চড়ার দৃষ্টান্ত তাদেরকে আরও জনসম্পৃক্ততার বন্ধনে আবদ্ধ করবে। মন্ত্রী বা কর্তাদের আরও অনেক বেশি জনতার কাছাকাছি নিয়ে আসবে। জননেত্রী শেখ হাসিনার সাহসী, কুশলী ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন নেতৃত্বের কারণেই এমনটি সম্ভব হয়েছে। চতুর্থ বার নির্বাচিত হয়ে তিনি তার মন্ত্রীদের দম্ভ বা অহংকার নয়, মানুষের কাছাকাছি থাকার শিক্ষাই দিলেন। নবনিযুক্ত মন্ত্রীরাও জনতার কাছাকাছি থাকার প্রত্যয় স-প্রমাণিত করলেন।

এই ঘটনাটি সামান্য হলেও সুদূরপ্রসারী তাৎপর্যপূর্ণ। শপথের পর পর এমন পদক্ষেপ মন্ত্রীদের আগামী দিনগুলোতে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দম্ভ ও ক্ষমতার বাগাড়ম্বের বাইরে থাকার প্রণোদনা দেবে। পাশাপাশি কৃচ্ছ্বতার একটি মানসিকতাও মন্ত্রিমণ্ডলীর মধ্যে তৈরি করবে। স্মৃতিসৌধে সকল মন্ত্রী নিজ নিজ গাড়ি ও পুলিশ প্রটেকশন নিয়ে যাতায়াত করলে শতাধিক গাড়ির যে পরিমাণ জ্বালানি খরচ হতো, কয়েকটি বাসে তা খুব সামান্যই হয়েছে। তদুপরি মন্ত্রিসভার সদস্যদের একাধিক গাড়ির বহর যানজট আকীর্ণ রাস্তায় নামলে জনদুর্ভোগ ও পথকষ্ট বহুলাংশে বৃদ্ধি পেতো। শেখ হাসিনা মন্ত্রিসভার ঐতিহাসিক বাসযাত্রা শুধু একটি ভালো ও ইতিবাচক দৃষ্টান্তই নয়, অনেকগুলো সমস্যা কমিয়ে দেওয়ার মতো একটি বিচক্ষণ পদক্ষেপও বটে।

একটানা তিন বার সহ মোট চার বার বিজয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের নতুন কার্যক্রম শুরুর দিকেই সাহসী ও বাস্তব সম্মত পদক্ষেপ নেওয়ার যোগ্যতা দেখিয়েছেন। মন্ত্রিসভাকে বাসে চড়ানোর আগেই তিনি বেছে বেছে এমন এলাকা থেকে মন্ত্রী করেছেন, যেখানে উন্নয়নের আলো যথেষ্ট পরিমাণে পৌঁছায় নি। এমন ব্যক্তিকে মন্ত্রী করেছেন, যিনি জনপ্রিয় জননেতা হয়েও এবারই প্রথমবারের মতো মন্ত্রী হতে পেরেছেন। বাংলাদেশের বহু এলাকা জন্মের পর প্রথম মন্ত্রী পেয়েছে শেখ হাসিনার এই মন্ত্রিসভায়।

হেভিওয়েট-নির্ভর, বিরাট মাথাভারি মন্ত্রীর বদলে অপেক্ষাকৃত অচেনাদের নিয়ে কাজ করার সাহস দেখিয়ে শেখ হাসিনা নতুন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে তোলার পদক্ষেপ নিয়েছেন। উন্নয়নের আলো বঞ্চিত এলাকায় মন্ত্রী উপহার দিয়ে উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে পুরো বাংলাদেশব্যাপী সুষম ও সুসমন্বিত করার ব্যবস্থা নিয়েছেন। বাংলাদেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে নিয়ে যাওয়ার যে প্রত্যয় শেখ হাসিনা নির্বাচনের আগে ও নির্বাচনের সময় ঘোষণা করেছিলেন, তিনি তা দ্রুতই বাস্তবায়নের পথে নিয়ে এসেছেন।

মন্ত্রীরা যে জনগণের কাছের মানুষ এবং উন্নয়নের সারথি, এই বার্তা দিয়ে শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভা বাসযাত্রার মাধ্যমে কৃচ্ছ্বতা ও জটমুক্ততার পথে এগিয়েছে। পেয়েছে জনগণের সমর্থন, ভালোবাসা ও স্বীকৃতি। এই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকলে এবং আরও অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার ভিশন ও মিশন সফলতার শিখরে পৌঁছাবে বলেই আশাবাদী মানুষ।

হতাশ ও পশ্চাৎপদ রাজনীতির বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আশাবাদী রাজনীতির পূর্ণ বিজয় ছিনিয়ে আনতে শুধু মন্ত্রিসভাকেই নয়, পুরো দল ও সরকারকে এ রকম বহু দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী কার্যক্রম অব্যাহত গতিতে পরিচালিত করে সাফল্যের স্বর্ণ শিখর স্পর্শ করতে হবে। কারণ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়ন ও অর্জনের পাশাপাশি আঞ্চলিক সাফল্যও ধরা দিয়েছে। বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। উন্নত জাতিগত অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গে মজবুত আঞ্চলিক উপস্থিতি সুদৃঢ় করতে বাংলাদেশকে এখন একযোগে এবং দৃষ্টান্তমূলকভাবে কাজ করতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন :

যমুনার পেটে জমি, পাহাড়ের পাদদেশে প্লাবন

যমুনার পেটে জমি, পাহাড়ের পাদদেশে প্লাবন
প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

সারা দেশে আষাঢ়ের কান্না যেন থামতেই চাইছে না। অতিবৃষ্টিতে চারদিকে বন্যা শুরু হয়েছে; শুরু হয়েছে শ্রাবণ। শ্রাবণের কালো মেঘ কী বার্তা নিয়ে আসবে, জানি না!

আষাঢ়ের শেষ সপ্তাহে এসে হঠাৎ করে প্রৃকতি বিরূপ হয়ে উঠেছে। পাহাড়ি ঢল, নদীভাঙন ও বন্যা একসঙ্গে শুরু হয়েছে। চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, কক্সবাজার, বান্দরবানে অতিবৃষ্টিতে বহু পাহাড় ধসে নিচে নেমে গিয়েছে। প্রৃকতি এতে ক্ষান্ত হয়নি। পাহাড়ি ঢল বার বার ধেয়ে আসছে।

রাস্তা, বাড়ি-ঘর ভূমিধসের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে। ধান-পাট, শাক-সবজি ডুবে যাচ্ছে। মাছের খামারের মাছ ভেসে গিয়ে মাছ চাষিদের মাথায় হাত পড়েছে। বৃষ্টি ও সাগরের নিম্নচাপ মিলে মানুষের এক চরম ভোগান্তি শুরু হয়েছে।

পাহাড়ের পাদদেশে পুনঃপুনঃ এই প্লাবনপানি ও মাটিধসের দুর্যোগ এখন আতঙ্ক। তাই ভুক্তভোগীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বারবার মূল শহরের রাস্তায় থৈ থৈ পানি সবাইকে প্রহসন করছে। কৌতুক করে বলা হচ্ছে- ‘কী সুন্দুইজ্যা চাঁটগা নগর’, ‘ডুবে থাকা’ চট্টগ্রাম নগরীর সৌন্দর্য্য এই বর্ষায় আরো কয়েকবার দেখা যাবে সন্দেহ নেই’ ইত্যাদি।

উত্তরের জেলা লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, শেরপুর থেকে ভারত ও ভুটানের পাহাড়-পর্বতশ্রেণি বেশি দূরে নয়। ওপরে বেশি বৃষ্টি হলেই ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রে পানি বেড়ে গিয়ে অকাল বন্যা দেখা দেয়। পূর্বে সিলেটে নেমে আসে আসাম ও শিলংয়ের পাহাড়ি ঢল। আগে প্রাকৃতিকভাবে এই ঢলের পানি নদী দিয়ে সাগরে চলে যেত। হাওড়ের মানুষ কৃত্রিমভাবে ধান বা মাছের চাষও করতো না। তাই ঢলের পানির ক্ষতিকর দিকের কথা তেমন শোনাও যেত না।

এখন চারদিকে নানা প্রকার উন্নয়ন শুরু হয়েছে। অপরিকল্পিত ও অযাচিত উন্নয়নের নামে প্রকৃতির ওপর মানুষের নির্দয় হস্তক্ষেপ শুরু হয়েছে। মানুষ প্রয়োজন পূরণের নামে প্রকৃতিকে ধ্বংস করে চলেছে। তাই প্রকৃতিও মানুষের প্রতি নির্দয় হয়ে নিষ্ঠুর আচরণ শুরু করেছে। ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রে পানি বেড়ে গিয়ে বন্যার সাথে প্রচণ্ড নদীভাঙন শরু হয়েছে। তিস্তা-যমুনার পেটে ফসলি জমি বিলীন হয়ে বাস্তহারা মানুষের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গেছে। আশঙ্কার কথা হলো- নদীভাঙনে বাস্তহারাদের চাপে পুরো উন্নয়ন প্রক্রিয়াই বাধাগ্রস্থ হতে পারে।

পরিবেশ কারো একার সম্পত্তি নয়। পরিবেশ সারা পৃথিবীর সব মানুষের সম্পত্তি। তাই পরিবেশ সংরক্ষণে নীতি নির্ধারণে সবার কথা শোনা উচিৎ।

আমাদের চারদিকে আরো অনেক সমস্যা বিরাজমান। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ (হ্যাজার্ডস যেমন-সাইক্লোন, বন্যা) ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় (যেমন- ফসলহানি, প্রাণহানি) এত বেশি ক্ষতিকর যে, প্রতিবছর আমাদের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে অনেক পেছনে ঠেলে দেয়। এগুলোকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখা উচিৎ নয়। মনুষ্যসৃষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয় (ক্যালামিটিস/ হ্যাজার্ডস্) ঠেকাতে সব মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে আমাদের নিজেদের চেষ্টার মধ্যে একাই করব, একাই খাব নীতি পরিহার করা উচিৎ। অন্যথায়, একজন তৈরি করবে অন্যজন নষ্ট করার পাঁয়তারা করতে পারে- তারা দেশি হোক বা বিদেশি লবিস্ট হোক।

উন্নয়নের নামে পাহাড় কাটা, অবাধে গাছ নিধন করা, কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা, নদী দখল ও ভরাট করে স্থাপনা বানিয়ে স্বাভাবিক পানি চলাচলের পথ রুদ্ধ করা- এসব আজকাল যেন কোনো অপরাধই নয়! পাহাড়ে প্রয়োজনীয় গাছ নেই- তাই সামান্য বৃষ্টিতে মাটি গলে ধসে মানুষের মাথার ওপর পড়ছে। ওই কাদামাটি নিকটস্থ নদীতে গিয়ে নদীকে ভরাট করে নাব্যতা নষ্ট করে দিচ্ছে।

উন্নয়নের নামে পাহাড়-সমতলের সব বড় বড় গাছ কেটে উজাড় করে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি সরকারি রাস্তার পাশের তাল- নারকেলসহ ছায়াদানকারী বড় বড় গাছ কেটে সাবাড় করায় সারাদেশে বজ্রপাত বেড়ে গেছে এবং ভয়ংকরভাবে মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এখন বজ্রপাতে মৃত্যুর ভয়ে কৃষকরা মাঠে কাজ করতে যেতে ভয় পায়।

এছাড়া উত্তরাঞ্চলে ক্রমাগতভাবে ধরলা-তিস্তা-যমুনার পেটে ফসলি জমি বিলীন হয়ে বাস্তহারা মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে এবং চট্টগ্রামে পাহাড়ের পাদদেশে পুনঃপুনঃ প্লাবনপানি ও মাটিধসের দুর্যোগ মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়েই যাচ্ছে। এতে কারো যেন কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। এ অবস্থা চলতে থাকলে সেটা দেশের পুরো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে ভণ্ডুল করে দিতে পারে। এসব মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুতি কি আমাদের আছে?

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের একটি মন্তব্য আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি বলেছেন 'সরকারি কর্মকর্তারা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না'। এ কথাটি মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে সরকারি কর্মকতাদের দুর্নীতি আজ নতুন নয়। তবে সব কর্মকর্তাও এক নয়। সংখ্যায় সীমিত হলেও  অনেক অফিসার আছেন যারা সততার সাথে অনেক কষ্টে  জীবনযাপন করেন। তাই সকলকে এক পাল্লায় মাপা ঠিক হবে না।

বাংলাদেশে দুদক নিরপেক্ষতা হারিয়েছে অনেক আগে, তবে কিছু দিন পূর্বে ছোটখাটো দুর্নীতি ধরতে সোচ্চার দেখে আমরা কিছুটা হলেও খুশি হয়েছি। এ জন্য যে এবার অন্তত দুদক চেয়ারম্যান নিজেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঠিক সময়ে ক্লাস শুরু হয় কিনা বা সকল শিক্ষক সময়মত স্কুলে আসছেন কিনা তা যাচাই করতে। 

আমরা মনে করেছি, তিনি একবার যেহেতু ঘর থেকে বেরিয়েছেন, বাংলাদেশের সমাজ থেকে দুর্নীতি দূর না হওয়া পর্যন্ত আর ঘরে ফিরবেন না। কিন্তু কোনও অদৃশ্য কারণে, বোধহয় তিনি বুঝতে পেরেছেন, সরকারি কর্মকতা, রাজনীতিবিদের দুর্নীতি থামানো অসম্ভব। তার কাছে তো অনেক উদাহরণ আছে।

যাক সেসব কথা। এবার আলোচনা করা যাক, তিনি কেন বলেছেন যে সরকারি কর্মকরা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না। তিনি কি আসলে সরকারি কর্মকর্তাদের ভয় পেয়েছেন?  নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে।

কারণ ব্যাখ্যার আগে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা সম্পর্কে দুই-চার কথা না বললেই নয়। ওনারা সরকারিভাবে সে বৃটিশ আমল থেকে সুরক্ষিত। ওনারা সমাজের উপরে থাকেন। ওনাদের পল্লীর নাম ভদ্রপল্লী। ওনাদের সাথে ঈশ্বরের যোগাযোগ। সব কিছুই ওনারা নির্মাণ ও পরিচালনা করেন। সকল সুযোগ-সুবিধা ওনাদের জন্য। এ কারণে ওনাদের আচরণে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

এ জন্য তাদের সঙ্গে জনগণের একটা দুরত্ব কাজ করে। ফলে তাদের সম্পর্কে দুদক চেয়ারম্যানের মন্তব্যের পেছনে কোনো কারণ আছে কিনা, তা জানার আগেই পত্র-পত্রিকা,  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দার ঝড় ওঠে। আসলে দুদক চেয়ারম্যান কী বোঝাতে চেয়েছেন বা জনগণ কী বুঝেছে তা পরিষ্কার নয়।

আমি যদি ভুল না বুঝে থাকি, এখানে দুদক চেয়ারম্যান অর্থনৈতিক দুর্নীতিকে বুঝাননি। তিনি বুঝাতে চেয়েছেন, অনেক সরকারি কর্মকর্তা নিজের অনিচ্ছায় বা ভালো  উদ্দেশ্যে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে কারো ক্ষতি হতে পারে। এ জন্য ঐ কর্মকতাকে দুর্নীতি পরায়ণ বলা যাবে না। এটাকে দুদক চেয়ারম্যান 'সরল বিশ্বাস' বলেছেন। যদি ঐ কর্মকর্তা  ইচ্ছাকৃত ভুল করেন বা টাকার বিনিময়ে করেন বা কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য করেন, তা সরল বিশ্বাস নয়। এখানে অসততা আছে। এটাই দুর্নীতি।

আমার  হয়তো বুঝতে ভুল হতে পারে আর যদি হয়ও তা কিন্তু সরল বিশ্বাসে। আমি এ বিষয়টি এ জন্যই উপস্থাপন করলাম, কারণ দুদক চেয়ারম্যানের কথার অর্থ যদি সরকারি কর্মকর্তারা ভুল বোঝেন, তাহলে তো সর্বনাশ! তারা তো সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা শুরু করবেন। অবস্থা তখন হবে, ‘একদিকে নাচুনি বুড়ি অন্য দিকে ঢোলের বাড়ি’-র মতো। আমার এ লেখা শুধু ওইসব দুর্নীতি পরায়ণ সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য।

অতএব, দয়া করে সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা থেকে বিরত থাকুন।

ড. মো. কামাল উদ্দিন: প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন: সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি অপরাধ নয়: দুদক চেয়ারম্যান

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র