Alexa

বিএনপি এক নির্বাচন কইরাই বইট মারছে...

বিএনপি এক নির্বাচন কইরাই বইট মারছে...

মোকাম্মেল হোসেন, ছবি: বার্তা২৪

তিনি ক্ষমতাসীন দলের একজন নেতা। অনেক দায়িত্ব তার। এ দায়িত্ববোধ থেকেই বিশ্বের এক নম্বর ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার জন্য তিনি জোর চেষ্টা-তদবির চালালেন এবং সফল হলেন। তবে সময় মাত্র পাঁচ মিনিট। পাঁচ মিনিট অবশ্যই খুব বেশি সময় নয়; কিন্তু যিনি সময় দিলেন তিনি যদি হন বিশ্বপতি আর সময় যিনি পেলেন তিনি যদি হন দারিদ্র্য নিপীড়িত ছোট্ট একটা দেশের অধিবাসী, তাহলে মিনিটকে ঘণ্টার ফ্রেমে বন্দি করা ঠিক হবে না। দুই নেতার মধ্যে কথা শুরু হল। সালাম নিবেদনের পর বিশ্বনেতার উদ্দেশে বঙ্গনেতা বললেন-

: সুন্দর সকাল স্যার; আছেন কেমন!

: বেশি ভালা না; সব মিলাইয়া ছেড়াবেড়া অবস্থার মধ্যে আছি। বলেন, আপনের বক্তব্য বলেন।

: আপনে আমার জন্য পাঁচ মিনিট সময় বরাদ্দ করায় আমি নিজে এবং সেইসঙ্গে আমার দেশের জনগণ ধন্য হইয়া গেছি। পাঁচ মিনিট আমার কাছে পাঁচশ’ মিনিটের সমান মনে হইতেছে।

: দুঃখিত! আপনে এইরকমভাবে কথা বলতেছেন কেন! আপনের মুখে কি চুইংগাম?

: না-না স্যার! মুখের মধ্যে কিছু নাই; মুখ ফকফকা। এইটা হইল আমার নিজস্ব বাচনভঙ্গি। এই বাচনভঙ্গি আমি কই পাইছি জানেন? ইশকুলে পড়ার সময় আমাদের পাঠ্যবইয়ে একটা কবিতা ছিল-নাম ‘সফদার ডাক্তার’; সফদার ডাক্তার মাথা ভরা টাক তার, খিদে পেলে পানি খায় চিবিয়ে। এই কবিতা মুখস্ত করার পর আমিও স্যার পানি চিবাইয়া খাওয়ার অভ্যাস রপ্ত কইরা ফেললাম। এরপর একদিন দেখলাম আচানক কারবার-পানি চিবাইয়া খাইতে খাইতে আমি চিবাইয়া চিবাইয়া কথা বলার শিল্পটাও আয়ত্ত্ব কইরা ফেলছি। বিষয়টা অতি চমৎকার না স্যার?

: হ, চমৎকার। এইবার বলেন...

জোরে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বঙ্গনেতা বললেন:

: বলার বিষয় তো একটাই। আপনে যদি আমাদের গরীবখানায় একবার ঠ্যাং ছোঁয়াইতেন! আপনের জুতার ধূলি পড়লে আমাদের ইজ্জত যে কী পরিমাণ বাড়ত, তা ভাষায় প্রকাশ করা দুঃসাধ্য। আমি জানি, আপনে সময়ের পেছনে ছুটেন না; সময়ই আপনের পেছনে ছোটে। তারপরও বলতেছি স্যার, বাংলাদেশে আইসা এক কাপ কফি যদি খাইতেন; আল্লারে আল্লা! কী যে খুশি হইতাম! স্যার, অনুমতি না লইয়াই আপনেরে একটা কথা স্মরণ করাইয়া দিতে চাই-আপনের পূর্বসূরী ক্লিনটন সাব কিন্ত গরীব বইলা আমাদের অবহেলা করেন নাই। তিনি ঠিকই আমাদের দরিদ্রনিবাসে তশরিফ রাখছিলেন।

বঙ্গনেতার কথা শুনে বিশ্বনেতা হাসলেন। তারপর বললেন-

: আপনে কী এই কথার বলার জন্যই ফোন করছেন?

জিহ্বায় কামড় দিয়ে বঙ্গনেতা বললেন

: না, না; শুধু এই কথা না। অনেক কথা আছে। তার আগে বলেন, মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তোলার ব্যাপারে কতদূর অগ্রসর হইলেন?

: এইটা লইয়াই তো বিসকাউস লাগছে!

: যতই বিসকাউস লাগুক স্যার; পিছু হটবেন না। ব্যাটারা কোনোমতেই যেন সীমানা পার হইতে না পারে। বলা তো যায় না, বাংলাদেশ যে গতিতে উন্নয়ন করতেছে-শেষে এরা কাঁথা-বালিশ লইয়া গোষ্ঠীশুদ্ধা বাংলাদেশে আইসা হুমড়ি খাইয়া না পড়ে!

বঙ্গনেতার কথা শুনে বিশ্বনেতা অবাক হয়ে বললেন-

: এতদূর থেইকা বাংলাদেশে যাবে কীভাবে!

: এইটা আপনে কী বললেন স্যার! সূদুর সাইবেরিয়া থেইকা আণ্ডা-বাচ্চা লইয়া বাংলাদেশের মাটিতে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি আইসা হাজির হইয়া যায়; আর তো মানুষ। ঘটিবাটি বেইচ্যা মেক্সিকানরা যদি কোনোমতে একবার টিকিট কাইট্যা বিমানে উইঠ্যা বসে, তাইলে সাড়ে-সর্বনাশ। গরীব হইলে কী হবে, এইসব ব্যাপারে আমরা খুবই মানবিক স্যার। যে কারণে দশ লাখ রোহিঙ্গারে ফেরত দিতে পারি নাই; সেই একই কারণে তো মেক্সিকানদেরও ফেরত পাঠাইতে পারব না, তাই না?

: হু।

: স্যার, অনেকদিন আগে একটা জরিপ ফলাফলে দেখছিলাম, আমেরিকানরা অংক ভালো পারে না। ঘটনা সত্য নাকি?

: জরিপে যখন জানা গেছে, তখন সত্য হইলেও হইতে পারে।

: আপনেরা অংকে কি জন্য দুর্বল, তার একটা কারণ আমি বলি?

: বলেন।

: কারণ হইল আপনাদের সাহসের অভাব।

: সাহসের অভাব!

: হ। একাত্তর সালে আপনেরা ভয় না পাইয়া যদি সপ্তম নৌবহর লইয়া বাপের বেটার মতো বাংলাদেশে ঢুকতেন; তাহলে বাঙালির ছেঁচা খাইয়া অংকটা ঠিকই শিইখ্যা ফেলতেন। কিন্তু আপনেরা তো ভয় পাইয়া আর কাছেই ভিড়লেন না।

যাক, বেশি কথা বলবার চাই না...

: বেশি কথা বলবার চান না মানে? আপনে তো অনেক কথা বলেন!

উচ্চস্বরে হেসে বঙ্গনেতা বললেন-

: বেশি কথা বলি, না? কী করব বলুন! সারাক্ষণ কথার উপরেই থাকতে হয়।

: আপনের দলে আর লোকজন নাই?

: আছে। কিন্তু তারা কী বলতে যাইয়া কী বইলা ফেলে-সেইজন্য কোনো ঝুঁকির মধ্যে না যাইয়া কথা যা বলার আমিই বলি।

নির্ধারিত সময় সম্পর্কে সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বিশ্বনেতা এবার বললেন-

: আপনের সময় কিন্তু আর বেশি নাই।

: হায় আল্লাহ! এত তাড়াতাড়ি সময় যায় কেমনে? যাক, যে কারণে আপনারে ফোন করছি- বিএনপি তো এক নির্বাচন কইরাই বইট মারছে! তারা এখন উপজেলা, সিটি কর্পোরেশনসহ সব ধরনের নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিছে!

: আমি কী করব?

: কী করবেন মানে! আপনে তাদের বোঝান। বুঝ না মানলে ধমক দেন।

: আমার ধমকে কি তারা তাদের সিদ্ধান্ত পাল্টাইয়া ফেলবে?

: একশ’বার পাল্টাবে। আপনে মুরুব্বি না?

: ঠিক আছে, বলব।

: শুধু বলা না; উদাহরণ সহযোগে বলবেন- নির্বাচন হইল গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা। একটা নির্বাচন কইরাই যদি তারা এইভাবে বইট মারে; তাইলে বাংলাদেশে কি গণতন্ত্র টিকবে? কিছুতেই টিকবে না; হাঁটু ভাঙ্গা ‘দ’ হইয়া কাতরাইতে থাকবে।

সবচাইতে বড় কথা স্যার, যে দেশের গণতন্ত্রই হোক, তা উষ্টা খাওয়া মানে আমেরিকার উষ্টা খাওয়া। এইটা আমেরিকার জন্য কতবড় অপমানের বিষয়, একবার ভাইবা দেখেন।

হঠাৎ এসময় টেলিফোন পুঁউ, পুঁউ শব্দ করে উঠল। বঙ্গনেতা কী হইল-কী হইল বলে চেঁচিয়ে উঠতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো

: টাইম ইজ ওভার।

মোকাম্মেল হোসেন: রম্য লেখক ও সাংবাদিক।