Alexa

কাঁধে চড়েই শেষবার আবাহনীতে মুন্না!

কাঁধে চড়েই শেষবার আবাহনীতে মুন্না!

এভাবেই কফিনে করে শেষবারের মতো আবাহনী ক্লাবে এসেছিলেন মুন্না -ফাইল ছবি

[২০০৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ভোরে বাংলাদেশ ফুটবল কিংবদন্তী মোনেম মুন্না মারা যান। দীর্ঘসময় কিডনি রোগে ভুগে মৃত্যুর কাছে হার মানেন মুন্না। মাত্র ৩৮ বছর বয়সেই সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন এই ফুটবল গ্রেট। মুন্নার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রিপোর্টারের পুরানো ডায়েরি থেকে খুঁজে বের করে সেদিনের এই লেখা ]

সেই সর্মথক-ভক্তদের কাঁধে চড়েই আরেকবার প্রিয় আবাহনী ক্লাব চত্বরে এলেন মুন্না। আগে আসতেন বিজয়ের আনন্দে, দু’হাত উঁচিয়ে। এবার এলেন বুকে হাত বেঁধে, কফিনে শুয়ে। আগেও ফুলের মালা পরতেন, গলায়। এই যাত্রায়ও ফুল পেলেন। এবার গলায় নয়; কফিনের ডালায়!

ফেব্রুয়ারির এই সময়টায় বাতাসে বসন্তের আগমনী গান। ফাগুনকে স্বাগত জানাতে চারধারের সবকিছুতেই বদলে যাওয়ার আনন্দ ধ্বনির মূহূর্তকাল এটি। কিন্তু কি অদ্ভুত এক নীরবতায় আছন্ন চারধার! এই যে এখানে শত শত মানুষের হাঁটাচলা। একে অন্যের দিকে মুখ তুলে চাওয়া। সেই দৃষ্টিতে অসহায়ত্বের নোনা জলের বিন্দু! মানুষ যার নাম দিয়েছে বেদনা! খুব প্রিয় কিছুকে আকস্মিক হারিয়ে ফেলার কষ্টের মোচড় এখানকার আগন্তকদের চোখে-মুখে অলিন্দের রক্তনালি, স্নায়ুতে!

আগে মুন্নার বিজয়ের সঙ্গী হয়ে ক্লাব প্রাঙ্গনে আবাহনীর গর্বের আকাশি পতাকা পতপত করে উড়ত। এদিন চারধারে এত বাতাস অথচ স্ট্যান্ডের পতাকা লেপ্টে রইলো অর্ধনমিত হয়ে কুর্নিশের ভঙিতে, বিষন্নতায় আছন্ন থেকে; ওরও বুঝি মন খারাপ!

ক্লাবের প্রবেশপথের সামনে বটগাছের পাতা আগেও ঝরতো। ১২ ফেব্রুয়ারি সকালেও ঝরলো, কিন্তুু সেই ঝরে পড়ায় স্পষ্টত শোনা গেল কান্নার সুর! বিদায়ের রাগিনী। এখানে আজ কাঁদছে, সবকিছুই!

প্রিয় কিছু হারানোর বেদনায় সকাল-দুপুরের পুরো সময় জুড়ে রৌদ্রোজ্জ্বল নীল আকাশকে আবাহনী প্রাঙ্গন থেকে আরো নীলাভ দেখাল! ইট-পাথর- এমনকি দেয়ালের সঙ্গে লেপ্টে থাকা উদ্ভিদ মূল; সবকিছু, চারপাশের উপস্থিতির সবকিছুর সবটুকু জুড়েই ব্যথার কষ্ট। কান্নার দমক।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Feb/12/1549939805003.jpg

ক্লাব প্রাঙ্গনের গাঁ ঘেষে থাকা কাঠালি চাঁপার প্রায় পাতা শূন্য গাছের পাশ থেকে আগে হেঁটে গেলে সুতীব্র একটা ঘ্রাণ কাছে টানতো। এদিন সেখানে মিলল লোবানের গন্ধ। শ্বাসনালী ধাক্কা খেলে আগরবাতির ধোঁয়ায়। নিবিষ্ট মনে একজন মাইকে কুরআন তিলাওয়াত করে যাচ্ছেন।

সবকিছুই জানিয়ে দিল আজ এখানে প্রিয় কিছুকে চিরবিদায়ের আয়োজন চলছে। আজ এখানে মৃত্যু এসেছিল!

মৃত্যুর সঙ্গে মুন্নার যন্ত্রনার লড়াই মুখোমুখি কায়দায় শুরু হয়েছিল মুলত পাঁচ বছর আগে থেকেই। শরীরের দুটো কিডনিই তার অকেজো হয়ে যায় ২০০০ সালে। বোনের কাছ থেকে ধার করা কিডনি নিয়ে সেই সময়টায় মৃত্যুকে হারিয়ে দিয়েছিলেন মুন্না সেসময়। ট্রান্সপ্লান্ট করা কিডনি রোগীকে মানতে হয় প্রতি পদক্ষেপে অহরহ নিয়ম-কানুন। নিয়মিত পথ্যের ওপরেই টিকে থাকে সে জীবন। এমনকি একরত্তি ধুলোও দৈত্যকার শত্রু তখন। ভেতরের শরীর বাইরে থেকে পাওয়া কাউকে স্বস্তির জায়গা দিতে নারাজ। আর চিরজীবন আপষহীন মুন্না কেন মানবেন এই সমঝোতার সূত্র?

মানেনও নি!

লড়ে গেছেন পাঁচবছর। সেই সুযোগে ওত পেঁতে থাকা শত্রু ধীর লয়ে চড়ে বসে। ভাইরাস জ্বর নিয়ে গত ২৫ জানুয়ারি হাসপাতালে বিছানা নেন। আর উঠতে পারেননি। এই আঠারদিন কেটেছে তার জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষনে। ১২ ফেব্রুয়ারির সকালে হাসপাতাল ছাড়লেন কফিনে শুয়ে।

সকালে ঘুম ভাঙ্গলে সবার আগে মুন্না চলে আসতেন আবাহনী ক্লাবে। কি আশ্চর্য, এদিনও তাই এলেন। তবে ঘুম যে আর ভাঙ্গল না! ক্লাবের নিচতলায় পাঁচনম্বর রুমে জীবনে অনেক সময় কেটেছে তার। সেই রুমের পশ্চিম কর্নারের বিছানা পরিপাটি। কিন্তু মুন্নার বিছানা যে এখন অন্য কোথাও!

যে মাঠে ফুটবলার মুন্না নিয়মিত অনুশীলন করতেন, যে মাঠে ম্যানেজার মুন্না কৌশল নিয়ে আলাপ করতেন, আড্ডা দিতেন-সেই মাঠে এদিন সবাই ছিল, ফুটবলার, কর্মকর্তা, কোচ, ভক্ত-সমর্থক সবাই দাঁড়িয়ে-বসে, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আর মুন্না কফিনে শুয়ে! নাকে তুলো।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Feb/13/1550058770912.jpg

মাঠের যে কোনায় মুন্নার অনুশীলনের সময় আশপাশের দেয়ালে ভক্তরা ভিড় করত, ঠিক সেই জায়গায় তার জানাজা হল। মাঠের একদম পূর্বপ্রান্তে ক্রিকেট ম্যাচ থামিয়ে আম্পায়ার ও ক্রিকেটাররা গোল হয়ে মুন্নার জন্য প্রার্থনায় হাত তুললেন। যখন ফুটবল খেলতেন, তখন আনন্দে মন্থিত রাখতেন সবাইকে। যখন ফুটবল কর্তা হলেন, তখন আপোষহীন দৃঢ়তায় বাধঁলেন সবাইকে। আর যেদিন যখন বিদায় নিলেন-কাউকে ডাকলেনও না! ভোরে পাখি ডাকা বেলায় বিদায়। কার ওপর যেন অভিমান ছিল মুন্নার?

ক্লাব ঘরের দোতলার ছাদে খড় ঘেরা চাতাল দেখিয়ে আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি বললেন-‘ওখানে আড্ডায় আর কখনোই পাবো না মুন্নাকে।’ ববি আবাহনীর ক্রিকেট কর্মকর্তা। মুন্নার লড়াকু প্রভাবী ব্যক্তিত্বের মুগ্ধতা ঝরল তার কণ্ঠেও। ফুটবলে তারকা খ্যাতির স্টিকার মুলত গোলকিপার, মিডফিল্ডার এবং স্ট্রাইকারদের গায়েই বেশি দেখা যায়। কিন্তু ডিফেন্ডার মুন্না অনেক ট্রফি জয়ের সঙ্গে ফুটবলের গ্ল্যামারটাকেও ঠিকই জিতে নেন।

অনেক ম্যাচ জিতেছেন। চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। কিন্তুু মাত্র ৩৮ এ এসে জীবনের ম্যাচে হার! ফাগুন হাওয়ার দিনে মৃত্যু কেন আসবে? বিয়ে বার্ষিকীর দিনেই কেনো সুরভী ভাবীকে কাঁদতে হবে?

ছায়াঘেরা আবাহনী ক্লাবের আমগাছে এবারো অনেক মুকুল ধরেছে। তখনিই আরেকবার জানলাম-মৃত্যু কোনকিছুর শেষ নয়, শুরু মাত্র!