সংলাপের ইতি, এবার দেখা হবে ভোটের মাঠে

ফরিদুল আলম, ছবি: বার্তা২৪.কম

৭ নভেম্বর (বুধবার) ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা সংলাপের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারের সাথে রাজনৈতিক দলও এবং জোটের সংলাপ শেষ হয়। ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে সরকারের পদত্যাগ এবং সংসদ ভেঙে দিয়ে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি সরকার কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হবার পর নির্বাচন কমিশন তাদের পূর্বের ঘোষণা অনুযায়ী ৮ নভেম্বর সন্ধ্যায় একাদশ জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে।

ইতোমধ্যে সকলের কাছেই এটি গ্রহণযোগ্য হলেও ঐক্যফ্রন্ট তাদের পূর্বের দাবি পূনর্ব্যক্ত করে তফসিল ঘোষণা নিয়ে তাদের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। এক্ষেত্রে বি চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের তারিখ ২৩ ডিসেম্বরের পরিবর্তে ৩০ ডিসেম্বর পূণনির্ধারণ করে মনোনয়নপত্র জমাদান থেকে শুরু করে সকল প্রক্রিয়া এক সপ্তাহ করে পিছিয়ে দিতে কমিশনের কাছে অনুরোধ করেছে।

নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে তফসিল ঘোষণার পর আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারের কর্মপরিধি দৈনন্দিন দায়িত্ব পালনের মাঝে সীমিত হয়ে গেল। এখন থেকে সরকার আইনতঃ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বিরত থাকবে, নির্বাচন কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী নির্বাচন কার্যে সহায়তাকারী সরকারি কর্মচারি এবং প্রয়োজনীয় অর্থসহ আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের যোগান দেবে।

এর আগে সরকার এবং বিরোধী পক্ষগুলোর মধ্যকার রাজনৈতিক মতপার্থক্য নিরসনে সরকার কয়েক দফায় বিভিন্ন দল এবং জোটের সাথে সংলাপে মিলিত হয়। প্রথমেই ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্টের সাথে গত ১ নভেম্বর সংলাপ অনুষ্ঠানের পর খোদ ঐক্যফ্রন্টের ভেতরই এই সংলাপ নিয়ে বিএনপি এবং অপরাপর দলগুলোর মধ্যে কিছুটা মতপার্থক্য দেখা দেয়। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বললেন- ‘আমি সন্তুষ্ট নই’, অন্যদিকে ড. কামাল বললেন- ‘আমি সন্তুষ্ট।’ সংলাপ পরবর্তী গত কয়েকদিনের বিশ্লেষণ থেকে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে তা হচ্ছে বিএনপি বাদে ঐক্যফ্রন্টের অপরাপর দলগুলোর মূল আগ্রহের জায়গা কিভাবে বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতর থেকে একটি নির্দলীয় সরকার গঠন করা যায় তার উপায় অন্বেষণ করা, আর অপরদিকে বিএনপির সবকিছুকে ছাপিয়ে মূল দাবী হচ্ছে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং সংসদ ভেঙে দিয়ে সরকারের পদত্যাগ এবং একটি নির্দলীয় সরকারের অধীনে আগামী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান করা।

ইতোমধ্যে আমরা দেখেছি যে ঐক্যফ্রন্টের সাথে সরকারের সংলাপের ধারাবাহিকতায় অপরাপর আগ্রহী জোটের সাথেও সরকার সংলাপে মিলিত হয়েছে। গত ৩ নভেম্বর বি চৌধুরীর বিকল্প ধারার নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট এবং ৫ নভেম্বর হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টির নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ন্যাশনাল অ্যালায়েন্সের সাথে সরকারের যে সংলাপ অনুষ্ঠিত হল সেখান থেকে যে অভিন্ন ধারণা পাওয়া গেল তা হচ্ছে তারা সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি মোতাবেক আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণে প্রস্তুত রয়েছে। বাকী থাকে ঐক্যফ্রন্টের সাথে কিছু মৌলিক বিষয়ে সরকারের মতপার্থক্যের অবসান হওয়া।

এই অবস্থায় গত ৭ নভেম্বর ঐক্যফ্রন্টের সাথে সরকারে যে দ্বিতীয় দফা সংলাপ অনুষ্ঠিত হল সেখানে তাদের ভাষায় সাংবিধানিক পন্থায় কীভাবে একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে একাদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে তার উদাহরণ হিসেবে তারা সংবিধানের ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদের খ উপদফা তুলে ধরেন, যেখানে সংসদ ভেঙে দেয়ার কথা বলা হয়েছে। আর এক্ষেত্রে তাদের ভাষায় সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে বর্তমান সরকার পদত্যাগ করলেই একটি নির্দলীয় সরকার গঠনের পথ সুগম হবে।

এক্ষেত্রে তারা একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তিকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করে তার অধীনে ১০ জন উপদেষ্টা নিয়োগ দিয়ে একটি নির্বাচনকালীন মন্ত্রীসভা গঠনের প্রস্তাব করেন। তাদের এধরণের প্রস্তাবে সরকার পক্ষের জিজ্ঞাসা ছিল এধরণের সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে পরবর্তীতে যদি কেউ সংক্ষুব্ধ হয়ে আদালতে যায় এবং আদালত যদি এমন নির্বাচিত সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করে তখন কি হবে? এর কোন সদুত্তর আসেনি ঐক্যফ্রন্টের নেতৃবর্গের কাছ থেকে। একই সাথে প্রধানমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনের কাছে জানতে চান ৭২ এর সংবিধানে সংসদ ভেঙে নির্বাচন করার কোন বিধান ছিল কি না। ড. কামাল এর কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তাছাড়া উপদেষ্টা পরিষদ নিয়ে দেশ পরিচালনার বিষয়ে আমাদের সংবিধানে কোনো নির্দেশনা আছে কি না এক্ষেত্রেও তাদের সবাই নিরব থাকেন।

ইতোমধ্যে গত ১ নভেম্বর বর্তমান নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতির সাথে সাক্ষাত করে তাদের প্রস্তুতির বিষয়ে অবহিত করে ৮ নভেম্বর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার যে সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন, সে অনুযায়ী তফসিল ঘোষিত হয়ে যাবার পর কার্যত বিরোধীদলের সাথে সরকারের নির্বাচন সংক্রান্ত কোনো সংলাপের সুযোগ রইল না।

ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে বারবার এই তফসিল পেছানোর জন্য সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের কাছে অনুরোধ সত্ত্বেও তাদের দাবি পূরণ না হবার পেছনে মূলত তিনটি কারণ রয়েছে; প্রথমত, ঐক্যফ্রন্ট ব্যতীত অপর কোনো দল তফসিল স্থগিত কিংবা পেছানোর দাবি জানায়নি, দ্বিতীয়ত, ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে নির্বাচনের তফসলি পেছানোর দাবির প্রতি যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছে যে তারা সরকারের সাথে তাদের দাবি নিয়ে সংলাপ করছে, কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে সংবিধানের ভেতর থেকে সমাধানের ক্ষেত্রে ঐক্যফ্রন্টের অনীহা এই সংলাপকে অর্থহীন করে তুলে এবং তাই তাদের দাবিরও যৌক্তিকতা থাকে না, এবং তৃতীয়ত, সরকারের পক্ষ থেকে এবং সম্ভবত নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেও এমন ধারণা কিংবা অনুমান থাকতে পারে যে তফসিল পেছানোর দাবির মধ্য দিয়ে একধরণের সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টির অপপচেষ্টা থাকতে পারে।

সংলাপের মাধ্যমে ঐক্যফ্রন্ট তাদের দাবির বিষয়ে সরকারের কাছে এমন কোনো জোরালো অবস্থান তুলে ধরতে পারেনি যার কারণে নির্বাচনের তফসিল পেছানো যেতে পারে। এ নিয়ে গত ৪ নভেম্বর ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে সিইসি বরাবর একটি চিঠি দেয়া হয়েছে এবং ৫ নভেম্বর ঐক্যফ্রন্টের একটি প্রতিনিধিদল কমিশনের সাথে বৈঠক করে তফসিল পেছানোসহ তাদের ভাষায় সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে কমিশনকে পদত্যাগ করার আহবান জানায়।

কমিশনের পক্ষ থেকে সেদিন তফসিল পেছানোর আবেদনের বিষয়ে সুস্পষ্ট আশ্বাস দেয়া না হলেও জানানো হয়েছিল যে তারা (কমিশন) ৭ নভেম্বর সরকারের সাথে ঐক্যফ্রন্টের সংলাপ পর্যবেক্ষণ করবেন এবং ওই সংলাপের ফলাফল তফসিল ঘোষণার ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হবে। অবশেষে সংলাপ শেষে যা দাঁড়ায় তা নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে তফসিল ঘোষণার ক্ষেত্রে অন্তরায় হতে পারেনি।

সরকারের সাথে চলমান সংলাপের বিষয়ে লক্ষ্য করলে আমরা দেখতে পাব যে কেবল ঐক্যফ্রন্ট ছাড়া অপরাপর দল এবং জোটের তরফ থেকে তফসিল পেছানোর বিষয়ে জোরালো দাবি উত্থাপিত হয়নি। এখানে বুঝতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না যে অন্যান্য দলগুলো বিদ্যমান বাস্তবতা এবং কাঠামোর ভেতর থেকেই আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিলেও ঐক্যফ্রন্ট কিছু লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য সামনে রেখে তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। এমনিতেই অনেক দেরি করে নির্বাচনের মাত্র কয়েকমাস আগে এমন একটি জোট গড়ে ওঠায় তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি এখনও একটা কাঠামোর ওপর দাঁড়াতে পারেনি।

কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ গত ৫ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে এই জোটে যোগ দিয়েছে। নতুন কিছু দলকে এই জোটের ভেতর আনার বিষয় এখনও প্রক্রিয়াধীন। তার ওপর তাদের পক্ষ থেকে রয়েছে নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারের সম্মতি আদায়ের চেষ্টা। রয়েছে বিএনপির চাপিয়ে দেয়া খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং দলীয় গ্রেফতারকৃত নেতা কর্মীদের মুক্তির দাবীসহ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুণর্বহাল এবং নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগের মত কিছু জটিল ইস্যু।

এই অবস্থায় নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হবার ফলে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম অসমাপ্ত রেখে তাদের নির্বাচনমুখী হতে বাধ্য করছে, যার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি তাদের নেই।

জানা গেছে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর ঐক্যফ্রন্টের ভেতরের দলগুলোর মধ্যে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মনোনয়নপত্র দাখিল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নির্বাচনে যাওয়া সম্ভব কি না সেটা নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। আবার নির্বাচনে না গিয়েও কেবলমাত্র আন্দলনেরে মাধ্যমে এই মুহূর্তে দাবী আদায়ের সাংগঠনিক শক্তিও তাদের নেই বলে তারা উপলব্ধি করছে। এই অবস্থায় সবাই নির্ভর করছে ফ্রন্টের বড় দল বিএনপির সিদ্ধান্তের ওপর। বিএনপির মধ্যে এই নিয়ে মিশ্র বক্তব্য থাকলেও তারা বর্তমানে নির্বাচনের পক্ষ্যেই রয়েছে বলে জানা যায়। সেক্ষেত্রে আগামী দু একদিনের মধ্যে তারা মনোনয়নপত্র জমাদানের সময় দু’সপ্তাহ বৃদ্ধির দাবি নিয়ে আবার নির্বাচন কমিশনে যাবার পরিকল্পনা করছে।

পাশাপাশি রয়েছে বেগম জিয়াকে আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করাতে আইনী লড়াইয়ের প্রশ্ন। সেক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আদালতে গিয়ে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার সাজা স্থগিত করাতে না পারলে তার নির্বাচন করা হবে না। এই সবকিছু মিলে এই নির্বাচন তাদের জন্য কঠিন হলেও সম্ভবত এতে অংশগ্রহণ ছাড়া ভালো কোনো বিকল্প তাদের সামনে নেই।

ফরিদুল আলম: সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে বেইজিং এর ইউআইবিই-তে উচ্চশিক্ষারত।

যুক্তিতর্ক এর আরও খবর

বিএনপির হাতে লাঠি কেন?

দেশ এখন পুরোপুরি নির্বাচনমুখী। ঐক্যফ্রন্ট ও বিশ দলীয় জোটও নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। নির্বাচন কমিশন তার সা...

ফাও এমপি হওয়ার দিন শেষ

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন দেশের রাজনীতির অনেক ক্ষতি করেছে। দীর্ঘমেয়াদি সে ক্ষতি শুধু রাজনীতি ও নির্বাচনী ...

সুলভ মনোনয়নপত্র!

মনোনয়নপত্র সুলভে পাওয়া যাচ্ছে? মোটেও তা নয়। আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র বিক্রি হচ্ছে ৩০ হাজার টাকায়। বিএনপির মনোনয়ন...