ক্রিকেটার মাশরাফির শেষের তাহলে শুরু!

মাশরাফি বিন মর্তুজা

ম্যাচ বা সিরিজ শুরুর আগে সংবাদ সম্মেলন মাশরাফি বিন মর্তুজার জন্য নতুন কিছু নয়। সেই ক্যারিয়ারের শুরুর দিন থেকেই সাংবাদিকদের কাছ থেকে উড়ে আসা সহজ প্রশ্ন, কঠিন প্রশ্ন, হাসিতে উত্তর দেয়া প্রশ্ন, ক্যামেরার ফ্লাশলাইট, শাটারের শব্দ, ভিডিও ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল বদল; এমন অনেককিছুই দেখে আসছেন। তবে শনিবার ৮ ডিসেম্বর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ শুরুর আগের সংবাদ সম্মেলনটা কি একটু অন্যরকম নয়?

যেভাবে তার ক্রিকেট ক্যারিয়ার ক্রমশ শেষের দিকে যাচ্ছে এবং রাজনীতিতে নতুন ব্যস্ত জীবনের সূর্যরেখা উদীয়মান হচ্ছে তাতে প্রায় নিশ্চিত যে ঘরের মাঠে এটাই মাশরাফির শেষ ক্রিকেট সিরিজ। কারণ সামনের বছর বিশ্বকাপের আগ পর্যন্ত দেশের মাটিতে বাংলাদেশের আর কোন ঘরোয়া ক্রিকেট সিরিজ নেই। আর ২০১৯ সালের বিশ্বকাপকে মাশরাফিও তার ‘গুডবাই ক্রিকেট’ হিসেবেই দেখছেন।

ওয়ানডে অধিনায়ক নিজেও কিছুদিন আগে বলেছেন-‘২০১৯ সালের বিশ্বকাপ পর্যন্ত খেলার একটা মাইন্ড সেটআপ আছে আমার। তারপরও রিভিউ করার সুযোগ আছে, আমি যদি সেই অবস্থায় না থাকি তাহলে অবশ্যই আমাকে কুইট করতে হবে।’

আর মাশরাফির ক্রিকেট ক্যারিয়ার কতদুর বিস্তৃত হবে সেই প্রসঙ্গে বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন বলেছিলেন- ‘...বড়জোড় বিশ্বকাপের পরে হয়তো সে অবসরে যাবে।’

এমনসব সমীকরণ মিলিয়েই শনিবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ শুরুর আগের আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের প্রথম প্রশ্নটাই মাশরাফিকে শুনতে হলো-‘এটাই কি ঘরের মাঠে আপনার শেষ সিরিজ কিনা’?
বিদায় বলাটা সবসময় কঠিন। বিদায় বলে আবার ফিরে আসাটাও ঠিক মাশরাফির ধাঁতের সঙ্গে যায় না। অধিনায়ক সম্ভবত সেজন্যই নিজের সিদ্ধান্তকে একটু শূণ্যতার সুতোয় ঝুলিয়ে রাখলেন-‘বলা কঠিন, আসলে ভবিষৎতের কথা তো বলা যায় না! আমার কোনকিছুই মাইন্ড সেট থাকে না। মাইন্ড সেট করে কিছু করি না। দেখা যাক সামনে কি হয়।’

সরাসরি শেষ না বললেও মাশরাফি কিন্তু বিশ্বকাপ পরবর্তী তার ক্যারিয়ার আর লম্বা যে হচ্ছেই সেই নিশ্চয়তাও কিন্তু দিলেন না। তবে বাস্তবতা, সামনের দিনের ব্যস্ততা ও ক্রিকেট থেকে অর্জন, সাফল্য এবং সময়; এই অনুষঙ্গগুলোকে যুক্তির নিক্তিতে নিলে যা মিলছে তার যোগফল একটাই-ক্রিকেটার মাশরাফির বিদায় বলার ক্ষণ গননার শুরু যে হয়ে গেল!

আর তাই সংবাদ সম্মেলনে মাশরাফির প্রতিটি নড়াচড়া। অনুশীলনে কাটানো ব্যস্ত সময়। বোলিং মার্কে দৌড়ানো। উইকেট শিকারের পর আনন্দ উল্লাস। ক্যাচ ধরার পর মুষ্ঠিবদ্ধ হাত। ম্যাচ জয়ের তৃপ্তিতে সতীর্থকে বুকে জড়িয়ে ধরা। ক্যামেরার ফ্লাশলাইটের আলো ও শাটারের অবিরাম শব্দে, আবৃত্তিতে যেন অধিনায়কের শেষের শুরুর প্রতিটি মুর্হূতকে ধরে রাখার সুতীব্র আকুতির ছন্দ!

শেষের শুরুর এই লগ্নে দারুণ এক সংখ্যার দেখা পাচ্ছেন মাশরাফি। রবিবার, ৯ ডিসেম্বর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ম্যাচটা মাশরাফির আর্ন্তজাতিক ওয়ানডে ক্যারিয়ারে ২০০ নম্বর ম্যাচ। বাংলাদেশের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে ওয়ানডেতে এই ক্লাবের সদস্য হচ্ছেন মাশরাফি। এখন পর্যন্ত ক্যারিয়ারের ১৯৯ ওয়ানডে ম্যাচের মধ্যে ১৯৭টি মাশরাফি খেলেছেন বাংলাদেশের হয়ে। বাকি দুটি ম্যাচে তিনি প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন এশিয়া একাদশের জার্সি গায়ে। নিজের এই অন্যরকম ডাবল সেঞ্চুরির ম্যাচ প্রসঙ্গেও মাশরাফি কিছুটা উদাসীন ভঙ্গিতেই বললেন-‘ মনে করিয়ে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ। আমার আসলে খেয়াল ছিলো না। তবে এমনসব সংখ্যা, এগুলো আমাকে তেমন স্পর্শ করে না। আমার কাছে এগুলো এত গুরুত্বপূর্ণও নয়। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সিরিজের প্রথম ম্যাচটা জেতা। তবে একটা বিষয় ভাল লাগছে যে বাংলাদেশের হয়ে ওয়ানডে ফরম্যাটে কেউ অন্তত ২০০তম ম্যাচ খেলছে। মানুষ যখন বলবে, তুমি বাংলাদেশের হয়ে দুশোটা ওয়ানডে খেলেছো, এটা তখন অবশ্যই একটা অর্জন মনে হবে। ওই জায়গা থেকে অবশ্যই ভাল লাগবে। তবে সিরিজের প্রথম ম্যাচ জেতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু নেই।’

দুই হাঁটুতে সাতবার অস্ত্রোপচার নিয়েও দৌড়াতে থাকা মাশরাফির ক্রিকেট ক্যারিয়ার সেটাই শেখাচ্ছে আমাদের-‘জিততে হবেই, জেতার আগে হারতে নেই!’

খেলা এর আরও খবর

//election count down