স্বামীর মৃত্যু ও বিচ্ছেদের পর নারীর করণীয়

স্বামীর মৃত্যু ও বিচ্ছেদের পর নারীর করণীয়, ছবি: প্রতীকী

ইদ্দত শব্দের আভিধানিক অর্থ সময় গণনা করা। পরিভাষায় ইদ্দত বলা হয়- স্বামীর মৃত্যুর পর বা তালাকের পর নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত পরবর্তী বিয়ে থেকে বাধ্যতামূলকভাবে নিজেকে বিরত রাখা।

নারীর অবস্থার ভিন্নতায় ইদ্দতের সময়সীমায় কিছুটা ভিন্নতা আছে। আবার ইদ্দতকালীন সময়ের জন্য রয়েছে বিশেষ কিছু বিধি-বিধান।

প্রথমে আলোচনা করা যাক ইদ্দতের সময়সীমা নিয়ে। এ ক্ষেত্রে স্বামীর মৃত্যুর ইদ্দত ও তালাকের ইদ্দত কিছুটা ভিন্ন।

স্বামী মৃত্যুর ইদ্দত
যে নারীর স্বামী মারা গেছে সে যদি গর্ভবতী হয় তাহলে তার ইদ্দত সন্তান প্রসব পর্যন্ত। কেননা, এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘গর্ভবতীদের সময়কাল হলো- সন্তান প্রসব করা।’ -সূরা তালাক: ৪

আর সে যদি গর্ভবতী না হয়- তাহলে তার ইদ্দত চার মাস দশ দিন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে যারা স্ত্রী রেখে মারা গেছে তাদের স্ত্রীরা চার মাস দশ দিন পর্যন্ত নিজেদের বিরত রাখবে।’ -সূরা বাকারা: ২৩৪

তালাকের ইদ্দত
যে নারীকে তার স্বামী তালাক দিয়েছে অথবা সে নিজেই তালাক গ্রহণ করেছে সে যদি গর্ভবতী হয়- তাহলে তার ইদ্দত সন্তান প্রসব পর্যন্ত। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘গর্ভবতীদের সময়কাল হলো- সন্তান প্রসব করা।’ -সূরা তালাক: ৪

আর সে যদি গর্ভবতী না হয় এবং তার ঋতুস্রাব আসে তাহলে তার ইদ্দত পরিপূর্ণ তিন ঋতুস্রাব শেষ হওয়া পর্যন্ত। যদি ঋতুস্রাবকালে তালাক সংঘটিত হয় তাহলে ওই ঋতুস্রাব বাদ দিয়ে পরবর্তী ঋতুস্রাব থেকে তার ইদ্দত গণনা করতে হবে।

এ বিষয়ে কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তালাকপ্রাপ্ত নারী তিন ঋতুস্রাব পর্যন্ত নিজেদের বিরত রাখবে।’ -সূরা বাকারা: ২২৮

আর সে যদি গর্ভবতীও না হয় এবং তার ঋতুস্রাবও না আসে তাহলে তার ইদ্দত তিন মাস। কেননা, পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমাদের যে সকল স্ত্রীর ঋতুবতী হওয়ার আশা নাই তাদের ইদ্দত সম্পর্কে তোমারা সন্দেহ করলে তাদের ইদ্দত হবে তিন মাস এবং যাদের এখনও ঋতুস্রাব শুরু হয়নি তাদেরও।’ -সূরা তালাক: ৪

ইদ্দত যাপনকালীন নারীর জন্য বিশেষ তিনটি বিধান রয়েছে। সেগুলো হলো-

সাজগোজ না করা
এ প্রসঙ্গে হজরত নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী কোনো নারীর জন্য স্বামী ব্যতীত অন্য কারও মৃত্যুতে তিন দিনের বেশি সাজগোজ বর্জন করা জায়েজ নয়। স্বামীর মৃত্যুতে সে চার মাস দশ দিন সাজগোজ বর্জন করবে।’ –সহিহ বোখারি: ১২৮০ ও –সহিহ মুসলিম: ৩৮০৮

নারীর যে বাড়তি বেশ-ভূষা তার প্রতি পুরুষকে আকৃষ্ট করে তাকেই সাজগোজ বলে। এটা একটি আপেক্ষিক বিষয়। যুগ, অঞ্চল, পরিবেশ, পরিবার, সমাজ, শ্রেণি প্রভৃতির তারতম্যে তাতে ভিন্নতা থাকে। তাই যেখানে সাজগোজ বলতে যা বুঝায় সেখানে তাই ইদ্দত অবস্থায় হারাম।

লাল বা হলুদ রঙের পোশাক পরিধান করা, মেহেদি লাগানো, যেকোনো সুবাস দেওয়া; কাজল, আইব্রু, লিপিস্টিকসহ বিভিন্ন মেকাপ এবং সুবাসযুক্ত প্রসাধনী ব্যবহার করা ইদ্দত অবস্থায় না জায়েজ।

তবে সাজগোজের কোনো বস্তুর ব্যবহার যদি রোগের কারণে একান্তই জরুরি হয় এবং তার কোনো বিকল্প না থাকে, লাল বা হলুদ পোশাক ব্যতীত সতর ঢাকার মতো অন্য কোনেরা বস্ত্র না থাকে তাহলে এমন আবশ্যকীয় প্রয়োজনের সময় শুধুমাত্র প্রয়োজন পরিমাণ ব্যবহার করা যাবে।

ইদ্দত অবস্থায় হালকা রঙের ছাপা কাপড় পড়া, নাকে-কানে-গলায়-হাতে সামান্য পরিমাণের হালকা গহনা ব্যবহার করা নাজায়েজ নয়। কেননা, এগুলোকে সাধারণত সাজগোজের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা হয় না।

বিয়ে বর্জন করা
এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘ইদ্দত পালনরত নারীদের কাছে ইঙ্গিতে বিয়ের প্রস্তাব করলে অথবা মনের মধ্যে বিয়ের ইচ্ছা গোপন রাখলে তোমাদের কোনো পাপ নেই। আল্লাহ জানেন যে, তোমরা তাদের সম্বন্ধে আলোচনা করবে। কিন্তু বিধিমত কথাবার্তা ব্যতীত গোপনে তাদের নিকট কোনো অঙ্গীকার করো না, ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার আগে বিয়ে সম্পন্ন করার সঙ্কল্প করো না।’ -সূরা বাকারা: ২৩৫

এ আয়াত প্রমাণ করে ইদ্দতাধীন নারীকে বিয়ে করা হারাম, বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া বা আশ্বাস দেওয়াও হারাম, বিয়ের স্পষ্ট প্রস্তাব পাঠানোও হারাম। তবে বিয়ের ইঙ্গিত দেওয়া হারাম নয়।

নিজ ঘর থেকে বের না হওয়া
এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা ইদ্দতাধীন নারীদের ঘর থেকে বের করো না এবং তারাও যেন বের না হয়, যদি না তারা স্পষ্ট অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়। এটা আল্লাহর বিধান। যে আল্লাহর বিধান লংঘন করে সে নিজের ওপরই অত্যাচার করে।’ -সূরা তালাক: ১

তালাকের সময় বা স্বামীর মৃত্যুর সময় যে ঘরটি স্ত্রীর ঘর হিসেবে পরিচিত, যে ঘরকে তার ঘর বলা হয় সে ঘরেই ইদ্দত পালন করা স্ত্রীর ওপর ফরজ। সে ঘরের মালিক স্ত্রী হোক অথবা স্বামী। তা ভাড়ায় নেওয়া হোক অথবা ধারে নেওয়া হোক।

অতএব, স্ত্রী যদি বাপের বাড়ি বেড়াতে যায় আর সে সময় তালাক সংঘটিত হয় বা স্বামীর মৃত্যু ঘটে তাহলে স্ত্রীকে বাপের বাড়ি থেকে তার ঘরে ফিরে আসতে হবে এবং নিজ ঘরেই তাকে ইদ্দত পালন করতে হবে।

ঘরে ইদ্দত পালন করার অর্থ হলো- দিনরাত ঘরে থাকা। এটা ফরজ। কোনো গুরুতর সমস্যা ব্যতীত দিনের বেলা ঘর ছেড়ে অন্যত্র যাওয়া অথবা অন্য কোথাও রাতযাপন করা ইদ্দতাধীন স্ত্রীর জন্য হারাম। তার ঘর যদি বসবাস অযোগ্য হয়ে যায়, ধ্বসে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়, ঘরের ভাড়া পরিশোধে অসামর্থ্যবান হয়ে পড়ে, স্বামী বা তার স্বজনরা তার অবস্থানকে অনিরাপদ ও হুমকির সম্মুখীন করে ফেলে তাহলে সে সেই ঘর ত্যাগ করতে পারবে। যদি চিকিৎসার প্রয়োজন হয় অথবা ব্যয় নির্বাহের কেউ না থাকায় উপার্জনের প্রয়োজন হয় তাহলে প্রয়োজন পরিমাণ বের হওয়া জায়েজ।

ইদ্দত শেষ হওয়ার আগে স্ত্রীকে তার বসবাসের ঘর থেকে বের করে দেওয়া স্বামী ও তার স্বজনদের জন্য হারাম। তবে সে যদি ব্যভিচার ও অশ্লীলতায় লিপ্ত হয় তাহলে তাকে বের করে দেওয়া জায়েজ হবে। তালাকের ইদ্দতকালীন স্ত্রীর নাফাকাহ্ অর্থাৎ খাদ্য ও বস্ত্র সরবরাহ করাও স্বামীর ওপর ফরজ।

যেহেতু আবশ্যিক প্রয়োজন ব্যতীত দিনে ইদ্দতের ঘর থেকে বের হওয়া স্ত্রীর জন্য জায়েজ নেই, সেহেতু স্বামীকে যদি গ্রামের বাড়িতে কবর দেওয়া হয় তাহলে সেক্ষেত্রে স্ত্রীকে স্বামীর লাশের সাথে শহর থেকে গ্রামের বাড়ি নিয়ে যাওয়া জায়েজ হবে না। যারা গ্রামের বাড়ি রেখে সপরিবারে শহরে বসবাস করে তাদের অনেকই না জানার কারণে বা গুরুত্যপূর্ণ মনে না করার কারণে বিধবা মহিলাকে এ হারামে লিপ্ত করে ফেলে।

ইদ্দতের বিধান আমাদের দেশে দু’ধরণের প্রান্তিকতার শিকার। কেউ কেউ না জানার করণে অথবা গুরুত্বপূর্ণ মনে না করার কারণে ইদ্দতের প্রতি কোনো ভ্রুক্ষেপ করে না। ইদ্দত অবস্থায় বিভিন্ন উপলক্ষে কড়া সাজগোজ করে, বেড়াতে চলে যায়। এমনকি বিয়ে পর্যন্ত সংগঠিত হতে শোনা যায়। আবার কেউ কেউ সাধারণ হালকা রঙের পোশাক পরিহার করে নিছক সাদা রঙের পোশাককে বাধ্যতামূলক মনে করে। নাক-কানের হালকা, সামান্য গহনা যা বাড়তি কোনো আকর্ষণ সৃষ্টি করে না সেগুলোকেও নিষিদ্ধ মনে করে। এ ধরণের বাড়াবাড়ি-ছাড়াছাড়ি উভয় প্রান্তিকতাই বর্জনীয়।

ইসলাম এর আরও খবর

'হজ আপনার খেদমত আমাদের'

কয়েক বছর আগে এক রমজানে মক্কার মসজিদুল হারামে তার সঙ্গে দেখা। তখন ইফতারের সময়। আল্লাহর ঘরের ঐতিহ্যানুসারে লাখো মু...

//election count down