Alexa

সদ্ব্যবহার হচ্ছে না বাপেক্সের রিগগুলোর

সদ্ব্যবহার হচ্ছে না বাপেক্সের রিগগুলোর

ছবি: সংগৃহীত

গ্যাস সংকট মোকাবেলায় চড়া মূল্যে এলএনজি আমদানি করায় দাম বাড়ানো অপরিহার্য হয়ে পড়েছে- জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলা এই বক্তব্য হরহামেশাই দিয়ে যাচ্ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা একে মনুষ্যসৃষ্ট ও কৃত্রিম সংকট বলে মন্তব্য করেছেন।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) গ্যাসের দাম বৃদ্ধির গণশুনানিতে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান রুহুল আমিন বলেছেন, বর্তমানে দৈনিক ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। ২০১৯ সালের এপ্রিলে আরও ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট যুক্ত হবে। আমরা যদি বর্তমান দরে গ্যাস বিক্রি করি তাহলে বছরে সাড়ে ২৪ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি হবে।

তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি যথা সময়ে তেল-গ্যাস অনুসন্ধ্যান জোরদার করা যেত তাহলে এমন জটিল পরিস্থিতি তৈরি হতো না। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন এন্ড প্রোডাকশন কোম্পানিকে (বাপেক্স) অকার‌্যকর করে রাখাকে দায়ী করা হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাস্তবিক অর্থেই বাপেক্সের কার্যক্রম মন্থর গতিতে চলছে। বহু হাকডাক করে কেনা হয় অত্যাধুনিক অনুসন্ধ্যান রিগ বিজয়-১০। দুই হাজার হর্স পাওয়ারের এই রিগটি দেশে আনার পর থেকে সেভাবে কাজে লাগানো যায়নি, বলতে গেলে কাজে লাগানো হয়নি। রিগটি বাঙ্গুরা-৭ কূপ খনন কাজ শেষ করে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে। এরপর পুরো ২০১৭ সাল ও ২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত ১৫ মাস অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে।

এরপর মার্চে নেওয়া হয় সালদা নদীতে। সেখানে কূপ খননের কাজ শেষ হয় গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেখানে বসে রয়েছে অত্যাধুনিক রিগটি। অথচ সঙ্গে সঙ্গে নেওয়ার কথা ছিলো শ্রীকাইলে।

গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের ১৯৭ কোটি টাকা দিয়ে কেনা হয় বিজয়-১২ অনুসন্ধ্যান রিগটি। এক হাজার ৫০০ হর্স পাওয়ারের এই রিগটি দেশে আনা হয় ২০১৪ সালের অক্টোবর মাসে। প্রথমে নেওয়া হয় পাবনার মোবারকপুরে। সেখানে মাত্র একটি কূপ খনন করেছে। এরপর দীর্ঘদিন বসে থাকার পর ২০১৮ সালের মার্চে নেওয়া হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায়। সেপ্টেম্বরে কাজ শেষ করে বসে আছে। এরপর কোথায় নেওয়া হবে তার কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।

রিগটি দেশে আসার পর অতিবাহীত হয়েছে প্রায় সাড়ে চার বছর। একটি অনুসন্ধান কূপ খননে আদর্শ সময় ধরা হয় গড়ে ছয় মাস (রিগ পরিবহন ২০ দিন, সেটিং ২০ দিন, নামানো ১০দিন ও খনন ৯০ দিন)। সেই হিসেবে সাড়ে চার বছরে রিগটি দিয়ে ৯টি কূপ খনন করার সুযোগ ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে মাত্র দুইটি কূপ খনন করেই ঢেকুর তুলছে পেট্রোবাংলা।

এখানেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে দায়ী করছে বাপেক্স কর্তৃপক্ষ। অভিযোগ রয়েছে ডিপিপি পাঠালেও অনেক সময় নেওয়া হয় অনুমোদনে। আবার এমনও নজীর রয়েছে কূপ খননের জন্য ৫৫ কোটি টাকার ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) অনুমোদন হয়েছে। যে পেট্রোবাংলা অনুমোদন করে সেই কাজটি তারাই বাতিল করে ২০০ কোটি টাকা দরে বিদেশি কোম্পানিকে দিয়েছে।

অন্য চারটি রিগের একই অবস্থা। যথাযথভাবে ব্যব্হৃত হয়নি কোনোটাই। অথচ এই রিগগুলো ব্যবহার করে আরও বেশি অনুসন্ধ্যান করা সম্ভব। আর তাতে হয়তো দেশীয় গ্যাসের রিজার্ভ বাড়তো- এমনটাই মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

জ্বালানি নীতিমালায় বছরে চারটি অনুসন্ধ্যান কূপ খনন করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তার ধারের কাছেও নেই বাপেক্স। অনুসন্ধান যথাযথ না হওয়ায় সেই হারে বাড়েনি দেশের রিজার্ভ।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বার্তা২৪.কম-কে বলেন, `বাপেক্সকে বিলুপ্ত করার চেষ্টা চলছে। বাপেক্সের পরিকল্পনা গ্রহণ করার কোনো সক্ষমতা নেই। বাপেক্সের বোর্ড চেয়ারম্যান সচিব। ওনারা মন্ত্রণালয়ে বসে যে সিদ্ধান্ত দেন, সেটাই বাস্তবায়িত হয়।’

তিনি বলেন, ‘বাপেক্সকে আন্তর্জাতিক মানের কোম্পানি গড়তে বলেছিলাম। স্থলভাগে তারা এককভাবে কাজ করবে ভবিষ্যতে যাতে গভীর সমুদ্রেও কাজ করতে পারে। এর স্বপ্ন ও উদ্দেশ্য ছিল যাতে গ্যাস উৎপাদনে দেশীয় কোম্পানির শেয়ার বেড়ে যায়। গ্যাসের দাম সহনীয় পর্যায়ে থাকে। কিন্তু এখন বাপেক্সের গ্যাসক্ষেত্রে কাজ দেওয়া হচ্ছে বিদেশি কোম্পানিকে। এটাকে আমি অপরাধ বলে গণ্য করি।’

বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মোঃ আব্দুল হান্নান বার্তা২৪.কম-কে বলেন, ‘আমরা ২০২৩, ২০৩০ ও ২০৪১ সাল পর্যন্ত প্লান করেছি। ভবিষ্যতে এভাবে রিগ বসে থাকার সুযোগ কমে যাবে। ২০৩০ সাল পর্যন্ত ১৩টি কূপ খনন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’

জ্বালানি নীতিমালায় বছরে মোট চারটি কূপ খনন করার কথা বলা হয়েছে। ১১ বছরে ৪৪টি কূপ খনন করার কথা। এমন প্রশ্নের জবাবে আব্দুল হান্নান বলেন, ‘সম্ভাব্যতার প্রাক যাচাই ছাড়া কূপ খনন করলে ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। সেই কারণে একটু হলেও নিশ্চিত হয়ে অগ্রসর হতে হবে। এ জন্য টু-ডি ও ত্রি-ডি সার্ভে কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে।’

আপনার মতামত লিখুন :

অর্থনীতি এর আরও খবর