Alexa

ততদিন রবে কীর্তি তোমার...

ততদিন রবে কীর্তি তোমার...

প্রভাষ আমিন, ছবি: বার্তা২৪.কম

বেঁচে থাকলে আজ তাঁর বয়স হতো ৯৯ বছর, পা রাখতেন ১০০ বছরে। কেমন হতেন ৯৯ বছর বয়সী মানুষটি? গোটা জাতি আজ যখন তাঁর জন্মশতবার্ষিকী পালনে উদ্বেলিত, তখন তিনি দূর আকাশের তারা। তিনি দূর থেকে দেখছেন তার প্রিয় স্বদেশভূমিকে? দেখছেন কিভাবে প্রিয় কন্যা একে একে পূরণ করছেন তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্ন। তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। তিনি নিশ্চয়ই ওপাড় থেকে দেখে হাসছেন পরিতৃপ্তির হাসি।

এই বাংলাদেশে তার অনেক নাম। কেউ বলে জাতির পিতা, কেউ ডাকে বঙ্গবন্ধু, কারো কাছে তিনি মজিবর, কারো কাছে মুজিব ভাই, কেউ বলে শেখ সাব, বাবা-মায়ের আদরের ডাক খোকা। তিনি শেখ মুজিবুর রহমান। গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ায় তাঁর জন্ম ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ। টুঙ্গীপাড়া বললে কিন্তু আপনারা আজকের আধুনিক টুঙ্গীপাড়া ভাববেন না। তখন টুঙ্গীপাড়া সত্যি দুর্গম। সেখান থেকে একটি ছেলে কলকাতা হয়ে ঢাকা, তারপর একটা সময় গোটা বাংলাদেশে ছড়িয়ে গেলেন।

বঙ্গবন্ধু একজন আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সবচেয়ে বর্ণাঢ্য চরিত্র। এই যে আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ বললাম, আপনারা কেউ এখনকার রাজনীতিবিদদের সাথে মিলিয়ে ফেলবেন না। এখন যেমন রাজনীতিবিদ মানেই ধান্দাবাজ, চান্দাবাজ, মাস্তান। কিন্তু সত্যিকারের রাজনীতিবিদ তিনিই; যিনি একটি সুনির্দিষ্ট আদর্শের জন্য লড়াই করবেন, সংগ্রাম করবেন, মানুষকে ভালোবাসবেন, মানুষের পাশে থাকবেন। যিনি একটি জনগোষ্ঠির মানুষের আশা-আকাঙ্খাকে ধারণ করবেন।

বলছিলাম বঙ্গবন্ধু ছেলেবেলা থেকেই রাজনীতিবিদ। স্কুলে থাকতেই গরীব মানুষকে নানাভাবে সাহায্য করতেন, এমনকি নিজের পরনের কাপড়ও দান করেছেন। স্কুল পরিদর্শনে আশা সোহরাওয়ার্দীর পথ আটকে হোস্টেলের সমস্যা বলার গল্প তো এখন ইতিহাস। কলকাতায় বেকার হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করেছেন, আবার রাজনীতিও করেছেন। পাকিস্তান গড়তে সংগ্রাম করেছেন। কিন্তু পাকিস্তান যে আমাদের দেশ না, সেটা বুঝতে তাঁর সময় লেগেছে মাত্র একবছর। ৪৮ সালেই ভাষা আন্দোলন করতে গিয়ে কারাবরণ করেছেন। যদিও স্কুলজীবনেই ৭ দিনের কারাবাস পোহাতে হয়েছিল তাকে।  তবে পাকিস্তানের শুরু থেকেই কারাগার হয়ে ওঠে তার দ্বিতীয় বাড়ি।

২৩ বছরের মুক্তি সংগ্রামের ১৪ বছরই তাঁর কারাগারে কেটেছে। মোট ২৩ বারে ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাগারে ছিলেন তিনি। চাইলে আপস করে আয়েসী জীবনযাপন করতে পারতেন। কিন্তু সেই যে বলেছি আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ, এক সেকেন্ডের জন্যও আপস করেননি। ৫২ সালের ভাষা আন্দোলনেই উন্মেষ ঘটে স্বাধীনতার চেতনা। আর কেউ পারুক আর না পারুক, বঙ্গবন্ধু সেটা তখনই বুঝেছিলেন। তাই তার রাজনীতির পুরোটাই ছিল বাংলাদেশকে স্বাধীন করার লড়াই। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সেটাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হতে দেননি। ধাপে ধাপে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে জনগণকে সাথে নিয়ে এগিয়ে গেছেন লক্ষ্য নিয়ে। ৬৬ সালে দলের ভেতরের বাইরের অনেকের আপত্তির মুখেও তিনি ৬ দফা পেশ করেন। এই ৬ দফায় স্বাধীনতার কথা বলা হয়নি, কিন্তু বিরোধিতাকারীরা বুঝে গিয়েছিলেন, ৬ দফা বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তান অখণ্ড থাকা না থাকা অর্থহীন হয়ে যাবে। বুঝেছিল বাংলার জনগণও। তাই তো তারা অন্য সবাইকে ফেলে বঙ্গবন্ধুর পেছনে সমবেত হন। পাকিস্তান সরকারও যে বুঝতে পারেনি, তা নয়। তাই তো তারা বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সঙ্গীদের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দেয়। পাকিস্তান সরকার এই মামলা দিয়ে শেখ মুজিবকে ফাঁসিতে ঝোলাতে চেয়েছিল। কিন্তু উল্টো তারা এই মামলা দিয়ে শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু বানিয়ে দিলেন।

গণঅভ্যুত্থানে পতন ঘটে আইয়ুব খানের, উত্থান ঘটে বঙ্গবন্ধুর। ৭০এর নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের ১৬৭টি আসনই পায় আওয়ামী লীগ। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে ন্যায্য ক্ষমতা না দিয়ে টালবাহানা শুরু করে পশ্চিমারা। মার্চের শুরু থেকে ২৫ মার্চ রাত পর্যন্ত চলে কৌশলের খেলা। কিন্তু সবচেয়ে বড় কৌশলটা ছিল বঙ্গবন্ধুরই। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার সামনে বঙ্গবন্ধু পাঠ করলেন, তাঁর অমর কবিতাখানি। যা এখন বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। সেদিন বঙ্গবন্ধু ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলার আহবান জানিয়ে, যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকতে বললেন।

ভাষণ শেষ করলেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। সবকিছুই তিনি বলে দিলেন। কিন্তু পাকিস্তানীরা তাকে আটকানোর উপায় পায়নি। পাকিস্তানীরা বহু উসকানি দিয়েছে, কিন্তু বঙ্গবন্ধু সেই ফাঁদে পা দেননি। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বানাতে দেননি। ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইটের নামে গণহত্যা শুরু করে পাকিস্তানী হানাদারেরা। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে গ্রেপ্তারের আগ মুহুর্তে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে কিন্তু তাঁর নামেই চলে মুক্তিযুদ্ধ। পশ্চিম পাকিস্তানে কারাগারে সেলের পাশে কবর খোড়া হয়েছিল, কিন্তু টলানো যায়নি তাকে। মৃত্যুকে পরোয়া করেননি তিনি।

স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে দেশ গড়ার সংগ্রাম বেশি কষ্টকর হয়ে যায়। আগে শত্রু ছিল পশ্চিমারা। আর পরের শত্রুরা ঘরের। যে শত্রুদের তিনি ভালোবাসেন। বাংলার মানুষকে ভালোবাসাই ছিল তার সবচেয়ে বড় শক্তি। আবার বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল মানুষের প্রতি তার এই অগাধ ভালোবাসা আর অন্ধ বিশ্বাস। বাংলাদেশের কেউ তাকে মারতে পারে, এটা তিনি বিশ্বাসই করেননি। স্বাধীনতা বিরোধী, অতি বাম আর বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ক্রীরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পটভূমি তৈরি করে। আর দেশী-বিদেশী চক্রান্তে কয়েকজন বিপথগামী সেনা সদস্য সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। তার ২১ বছর এই ভূখন্ডে বঙ্গবন্ধু নিষিদ্ধ ছিলেন। কিন্তু তাঁকে মানুষের হৃদয়ে নিষিদ্থ রাভা যায়নি। এখন বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুময়। ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর মরদেহ টুঙ্গীপাড়ায় নিয়ে গিয়েছিল মানুষের মন থেকে মুছিয়ে দেবে বলে। কিন্তু তিনি ছড়িয়ে গেছেন সারা বাংলাদেশে।

আমি সবসময় বলি দলমত নির্বিশেষে সবার বঙ্গবন্ধুকে পাঠ করা উচিত। তার জীবন থেকে, আদর্শ থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত। তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী' ও 'কারাগারের রোজনামচা' সবার অবশ্যপাঠ্য।

আগেই বলেছি বাংলাদেশ এখন বঙ্গবন্ধুময়। এটাই হওয়া উচিত, এটাই হওয়ার কথা। কিন্তু কখনো কখনো মনে হয়, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বাণিজ্যও কম হয় না। প্রতিবছর অনেকগুলো অপ্রয়োজনীয় বই প্রকাশিত হয় বঙ্গবন্ধুর নামে। অনেকগুলো সংগঠন আছে নামের আগে পরে ‘বঙ্গবন্ধু' ব্যবহার করে। নিষিদ্ধ করে বঙ্গবন্ধুকে নিশ্চিহ্ন করা যায়নি। কিন্তু অতি ব্যবহারে যেন বঙ্গবন্ধুকে অবমাননা করা না হয়। বঙ্গবন্ধু হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। তবু তিনি দোষে-গুণে মানুষ। তাঁর অনেক কাজ সবার পছন্দ নাও হতে পারে। যেমন আমার কাছে বাকশাল ভালো লাগলেও অনেকের কাছে ভালো নাও লাগতে পারে। এই ভালো না লাগার কথাটা বলার স্বাধীনতা থাকতে হবে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা আজ উন্নয়নের রোল মডেল। কিন্তু সাথে সাথে নিশ্চিত করতে হবে, ভোটাধিকার, মানবাধিকার, আইনের শাসন আর সুশাসন।

বঙ্গবন্ধু একজন অতি সাধারণ মানুষ থেকে হয়ে উঠেছিলেন অসাধারণ একজনে। কিন্তু জাতির পিতা হওয়ার পরও ছিলেন অতি সাধারণই। তিনি গণভবনে থাকেননি, বঙ্গভবনে থাকেননি, থেকেছেন ধানমন্ডির অতি সাধারণ বাড়িতে। শেষ পর্যন্ত সে বাড়ি ছিল সবার জন্য খোলা। এখনও সেই বাড়ি সবার জন্য খোলা। তবে এখন সেটা বঙ্গবন্ধু জাদুঘর। তবে সেখানে গেলে যে কেউ চমকে যাবেন দেশের রাষ্ট্রপতি কি সাধারণ জীবন-যাপন করতেন। প্লিজ সাধারণের বঙ্গবন্ধুকে সাধারণেরই থাকতে দিন। তাকে বিচ্ছিন্ন করবেন না। ঘাতকরা অনেক চেষ্টা করেও বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাস মুছতে পারেনি। পারবে যে না, সেটা অনেক আগেই জানতেন অন্নদাশঙ্কর রায়- যতদিন রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান, ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মজিবুর রহমান...

প্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।

আপনার মতামত লিখুন :