Barta24

মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০১৯, ১১ আষাঢ় ১৪২৬

English Version

মুজিবনগর সরকার, ইন্দিরা গান্ধী ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা

মুজিবনগর সরকার, ইন্দিরা গান্ধী ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা
মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান ছবি: বার্তা২৪
মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান


  • Font increase
  • Font Decrease

১০ এপ্রিল, ১৯৭১ মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলা গ্রামে মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়। চরম ক্রান্তিকালে দেশের অভ্যন্তরে সরকার গঠনের এ ঘটনা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সরকারের অধিকাংশ কর্মকাণ্ড দেশের বাইরে থেকে পরিচালিত হতো বলে এ সরকারকে প্রবাসী মুজিবনগর সরকার বলে অভিহিত করা হতো। ১৯৭১ সালের এই দিনে ঐতিহাসিক মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণ করে।

দুই.

মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখার জন্য বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’-এ ভূষিত করা হয় (২৫ জুলাই, ২০১১) । তাঁর পুত্রবধূ সোনিয়া গান্ধী সেই সম্মাননা গ্রহণ করেন। পাশাপাশি ভারত সরকারকে ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা’ প্রদান করা হয়।

বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য প্রবল আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি; মুক্তিযুদ্ধের সময় আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন স্থানের সীমান্ত খুলে দেয়া; প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয়; কলকাতায় প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী কার্যালয় স্থাপনে সহায়তা; বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারকে সব ধরণের সহায়তা প্রদান; বিশ্বব্যাপী জনমত গড়ে তোলা; মুক্তিবাহিনীকে প্রশিক্ষণ প্রদান; অস্ত্র-গোলাবারুদ জোগান এবং সর্বোপরি মুক্তিবাহিনীর সাথে যৌথ অভিযানে অংশ নিয়ে মাত্র নয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জনে ইন্দিরা গান্ধী, তাঁর সরকার এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী যে ভূমিকা রেখেছিলেন, সেই অবদানকে বাংলাদেশের জনগণ অকৃত্রিম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।

তিন.

২৫ মার্চ, ১৯৭১ পাকিস্তানের সামরিক সরকার ‘অপারেশন সার্চলাইট’ এর মাধ্যমে ঢাকাসহ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় জাতিসংঘের যুদ্ধনীতি তোয়াক্কা না করে ইতিহাসের নির্মমতম গণহত্যা পরিচালনা করে এবং বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানের করাচি নিয়ে যায়। তারপর অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে মিয়াওয়ালি লয়ালপুর জেলে (বর্তমানে ফায়সালাবাদ কেন্দ্রীয় কারাগার) দীর্ঘ প্রায় ১০ মাস আটক করে রাখে। গ্রেফতার হওয়ার প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা টেলিগ্রাফের মাধ্যমে চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নানের কাছে পাঠাতে সক্ষম হন এবং এম এ হান্নান ২৬ মার্চ, ১৯৭১ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পাঠানো স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন।

গণহত্যার সুবিধার্থে পাক সামরিক বাহিনী বেতার ও টেলিভিশনের সম্প্রচার বন্ধ করে দেয় এবং ঢাকায় কারফিউ জারি করে। বাংলাদেশের এমন দু:সময়ে ২৭ মার্চ, ১৯৭১ ইন্দিরা গান্ধী অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে বাংলাদেশের পাশে থেকে সকল সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস দেন।

চার.

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে ইন্দিরা গান্ধী ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলের চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জে এফ আর জ্যাকব এবং চিফ অব স্টাফ জেনারেল শ্যাম মানেকশকে সমূহ যুদ্ধের জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত করতে বলেন। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি সহায়তা অব্যাহত রাখলেও বেশ কিছু কারণে ভারত সরকার একটু দেরিতে বাংলাদেশ সরকারকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়।

কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল: (১) পূর্ব পাকিস্তানের উপর পশ্চিম পাকিস্তানের জুলুম, নির্যাতন ও বঞ্চনার ব্যাপারে বিশ্ববাসীকে বুঝতে সময় দেয়া; (২) বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী ও তাঁর জীবনের ঝুঁকি থাকা; (৩) বাংলাদেশের নদী, হাওড়-বাওড়, জলাভূমির প্রাচুর্যতা ও বিস্তৃতি যুদ্ধের অনুকূলে না থাকায় ভারতীয় সেনাবাহিনী শীতকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চাওয়া; (৪) বিশ্বের গণমাধ্যমকে পাকিস্তানের প্রকৃত অবস্থা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে সময় দেয়া; (৫) সামান্য ভুলে যাতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সমূহ সম্ভাবনা নষ্ট না হয়ে যায়; (৬) ৩য় বিশ্বযুদ্ধের কোনো সম্ভাবনা যেন তৈরি না হয়; (৭) ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা বাংলাদেশের মানুষের ন্যায়সঙ্গত চাওয়া, ভারতের কোনো নিজস্ব স্বার্থ এখানে জড়িত নেই’- বিষয়টি বিশ্ববাসীকে বুঝতে সময় দেয়া; (৮) ‘সৃষ্ট মুক্তিযুদ্ধ পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বা বিদ্রোহ নয়’ বিষয়টি স্পষ্ট হতে সময় নেয়া প্রভৃতি।

পাঁচ.

১০ এপ্রিল, ১৯৭১ বাংলাদেশের অস্থায়ী মুজিবনগর সরকার গঠিত হয় এবং ১৭ এপ্রিল, ১৯৭১ অস্থায়ী সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত সাংবাদিকদেরকে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের কাছে স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান, বন্দী বঙ্গবন্ধুর নি:শর্ত মুক্তি, পাকিস্তানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি ও বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ অনুরোধ করেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Apr/17/1555491313725.jpg

পাকিস্তান সামরিক বাহিনী ২ আগস্ট, ১৯৭১ দেশদ্রোহিতার অভিযোগে কারাগারে আটক বঙ্গবন্ধুর বিচারের ঘোষণা দিলে ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ভারতের প্রধান প্রধান শহর যেমন, কলকাতা, দিল্লী, বোম্বেতে মিথ্যা ও প্রহসনের বিচারের উদ্যোগের প্রতিবাদ জানায় এবং ইন্দিরা গান্ধী স্পষ্ট ভাষায় বিচার বন্ধের আহবান জানান ।

প্রেসিডেন্ট নিক্সন এবং তাঁর প্রশাসনকে বোঝাবার জন্য নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ইন্দিরা গান্ধী যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান এবং ৪ নভেম্বর, ১৯৭১ প্রেসিডেন্ট নিক্সনের সঙ্গে ওয়াশিংটনে তাঁর বৈঠক হয়। আলোচনার সময় বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গটি উত্থাপন করা হলে নিক্সন তা উপেক্ষা করেন। নিক্সনের সাথে নৈশভোজে ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের মানুষের পাশে থাকার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এর মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্র পাকিস্তানি সৈন্যদের সাথে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর রক্তক্ষয়ী লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছিল।

অবশেষে ৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে সর্বপ্রথম রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করে।

ছয়.

শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করে পরাজিত পাক বাহিনী ৮ জানুয়ারি, ১৯৭২ বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি দেয়। স্বদেশের পথে ১০ জানুয়ারি, ১৯৭২ তিনি দিল্লির পালাম বিমানবন্দরে (বর্তমানে ইন্দিরা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট) যাত্রা বিরতি করেন। ভারতের রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, তাঁর মন্ত্রিসভার সব সদস্য এবং পদস্থ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাগণ বঙ্গবন্ধুকে বিনম্র শ্রদ্ধা ও উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।

দুই দেশের জাতীয় সঙ্গীত বাজিয়ে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জনককে রাষ্ট্রীয় অভিবাদন জানানো হয়। বঙ্গবন্ধুর সম্মানে আয়োজিত দিল্লীর প্যারেড গ্রাউন্ডের জনসভায় ইন্দিরা গান্ধী বক্তব্য শেষ করলে বঙ্গবন্ধু তাঁর বক্তব্য ইংরেজিতে শুরু করেন। কিন্তু, জনতার পক্ষ থেকে বাংলায় বক্তব্য প্রদানের প্রবল দাবি উঠে।

হৃদয়ে কৃতজ্ঞতা ও মুখে হাসির ঝলকানি নিয়ে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আমার ভাই ও বোনেরা…আপনাদের প্রধানমন্ত্রী, আপনাদের সরকার, আপনাদের সৈন্যবাহিনী, আপনাদের জনসাধারণ যে সাহায্য এবং সহানুভূতি আমার দু:খি মানুষকে দেখিয়েছেন চিরদিন বাংলার মানুষ তা ভুলতে পারবে না…’৷

২০০৯ সালে বর্তমান সরকার দ্বিতীয় মেয়াদে (২০০৯-২০১৪) ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অকুণ্ঠ সমর্থন ও অবর্ণনীয় আত্মত্যাগের মাধ্যমে নৈতিক, সাংস্কৃতিক, কূটনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক প্রভৃতিভাবে যারা সহায়তা করেছিলেন এমন ৫৬১ জন বিশ্বনেতা, ব্যক্তি ও সংগঠনের তালিকা তৈরি করেছিল। তখন পর্যায়ক্রমে সকলকে বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান করার বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। বর্তমান সরকারকে তার ৪র্থ মেয়াদে (২০১৯-২০২৪) সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা উচিত বলে আমরা মনে করি।

মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান: পি.এইচ.ডি গবেষক, ঝেজিয়াং ইউনিভার্সিটি, চীন এবং সাবেক সভাপতি, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বশেমুরবিপ্রবি, গোপালগঞ্জ।

আপনার মতামত লিখুন :

বিয়ের দিন আইন প্রয়োগ কেন!

বিয়ের দিন আইন প্রয়োগ কেন!
আলম শাইন, ছবি: বার্তা২৪

আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েরা আঠারো বছরেই ভোটাধিকারের সুযোগ পায়। কিন্তু বিধান অনুযায়ী একই বয়সে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সুযোগ হয় না। কারণ বিয়ের জন্যে দেশে আলাদা আইন-কানুন রয়েছে। ছেলে-মেয়েদের বিয়ের বয়সের ক্ষেত্রে সেই আইনে সামান্য হেরফের রয়েছে। যেমন ছেলেদের ক্ষেত্রে একুশ, মেয়েদেরে ক্ষেত্রে আঠারো বছর। এর চেয়ে কমবয়সী কেউ বিয়ে করলে কাবিন রেজিস্ট্রিতে বিঘ্ন ঘটে।

বিধান অমান্য করে কেউ কাবিননামা রেজিস্ট্রি করলে তাকে অবশ্যই আইনের সন্মুখীন হতে হয়। তারপরও আমরা লক্ষ্য করছি, আইনিবাধা উপেক্ষা করে দেশে এ ধরনের বিয়েশাদী প্রায়ই ঘটছে যা কোনমতেই সমর্থনযোগ্য নয়। এর ফলাফলও ভয়ঙ্কর। অপ্রাপ্ত বয়সে গর্ভধারণ করে অনেক কিশোরী মৃত্যুবরণ করছে। এসব বেআইনি ও অনৈতিক ঘটনা বেশি ঘটছে দেশের গ্রামাঞ্চল কিংবা চরাঞ্চালের দরিদ্র ও অশিক্ষিত পরিবারে। মাঝে মধ্যে মফস্বল শহরেও দেখা যায়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বাল্যবিবাহের অন্যতম কারণ হচ্ছে ইভটিজারদের ভয়। যার ফলে বাবা-মা মেয়েকে অপ্রাপ্ত বয়সেই বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এ কাজটি যেসব বাবা-মায়েরা করছেন তারা কিন্তু ঘুণাক্ষরেও জানছেন না, আঠারো বছরের কমবয়সী মেয়েকে বিয়ে দেওয়া আইনের পরিপন্থী। বিষয়টা অজানা থাকাতেই দরিদ্র বাবারা অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যার বিয়ের দিনক্ষণ ধার্যকরে সাধ্যানুযায়ী ভোজের আয়োজন করেন। ঠিক এমন সময়েই ঘটে অপ্রত্যাশিত সেই ঘটনাটি; বিয়ের বাড়িতে দারোগা-পুলিশের হানা! যা সত্যিই বেদনাদায়ক। এ বেদনার উপসম ঘটানো সহজসাধ্য নয়।

দুঃখজনক সেই ঘটনায় কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাকে পর্বতসম ওজনের ভার বহন করতে হয়। বিষয়টা যে কত মর্মন্তুদ তা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কারো জানার কথাও নয়। একে তো দরিদ্র বাবা, তার ওপর মেয়ের বিয়ের আয়োজন করতে ঋণ নিতে হয়েছে তাকে। সেই ঋণ এনজিও, ব্যাংক কিংবা ব্যক্তি পর্যায়েরও হতে পারে। হতে পারে তিনি জমিজমা বিক্রয় করেও মেয়ের বিয়ের আয়োজন করেছেন। এ অবস্থায় মেয়ের বিয়েটা ভেঙ্গে গেলে ঋণগ্রস্ত পিতার অবস্থাটা কি হতে পারে তা অনুমেয়। কারণ ইতোমধ্যেই অর্থকড়ি যা খরচ করার তা করে ফেলেছেন। আর্থিক দণ্ডের শিকার হয়ে কনের বাবা তখন মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেন। তার সেই মানসিক যন্ত্রণার কথা সচেতন ব্যক্তিমাত্রই বুঝতে সক্ষম হবেন। বিষয়টা বিশ্লেষণ করে বোঝানোর কিছু নেই বোধকরি।

গ্রামাঞ্চলে এভাবে বিয়ে ভেঙ্গে গেলে ওই পাত্রী বা কনের ওপর নেমে আসে মহাদুর্যোগ। পাড়া পড়শীরা অলুক্ষণে অপয়া উপাধি দিয়ে কনের জীবনটাকে অতিষ্ট করে ফেলেন। এতসব কথাবার্তা সহ্য করতে না পেরে অনেকক্ষেত্রে সেই কন্যাটি আত্মহত্যার চিন্তা করেন অথবা বিপদগামী হন।

প্রশ্ন হচ্ছে, এ ধরনের ঘটনার জন্য কে দায়ী থাকবেন- প্রশাসন না কনের বাবা? আমরা জানি, আইনের দৃষ্টিতে বাবাই দায়ী, প্রশাসন নয়। তারপও জিজ্ঞাসাটা থেকেই যাচ্ছে, কনের বাবাকে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করার আগে স্থানীয় প্রশাসন বাধা দেয়নি কেন! এখানে স্বভাবসুলভ জবাব আসতে পারে যে, বিষয়টা প্রশাসনের দৃষ্টিগোচর হয়নি বিধায় বাধা দেওয়া হয়নি। কিন্তু বিষয়টা তা নয়। যতদুর জানা যায়, এলাকার কিছু বদমানুষ অথবা ইভটিজার জেনেও জানাননি প্রশাসনকে। কনের বাবাকে নাজেহাল করার উদ্দেশে বিয়ের দিন প্রশাসনকে চুপিচুপি জানিয়ে দেন, যা আগে জানালেও পারতেন। তাতে করে কনের বাবা সাবধান হতেন এবং বিয়ের আয়োজন থেকে সরে আসতেন। অথচ সেই কাজটি করছেন না মানুষেরা। প্রায়ই এ ধরনের হীনমন্যতার বলি হচ্ছেন দেশের নিরীহ সাধারণ।

এ থেকে উত্তরণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে বলে মনে করছি আমরা। ইচ্ছে করলে স্থানীয় প্রশাসন উত্তরণের জন্য জনসচেনতা বৃদ্ধির প্রয়াসে কিছু প্রদক্ষেপ নিতে পারে। যেমন এলাকায় মাইকিং করে বাল্যবিবাহ যে অপরাধ, তা জানিয়ে দেয়া। এছাড়া হ্যান্ডবিলের ব্যবস্থাও করতে পারেন। অথবা এলাকার মেম্বার, চৌকিদার বা গণ্যমাণ্য ব্যক্তির ওপরে এ দায়িত্ব আরোপ করতে পারেন। যাতে করে কোন অভিভাবক অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে-মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করার সাহস না পায়। এ ধরনের বিয়ের কথাবার্তার সংবাদ কানে এলেই তাৎক্ষণিকভাবে তা যেন প্রতিহত করেন তারা। এবং কেন তিনি বাল্যবিবাহের ব্যবস্থা করছেন প্রশাসন সেটিও উদঘাটন করার চেষ্টা করবেন। যদি ইভটিজারদের ভয়ে মেয়ে বিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন, তাহলে অবশ্যই তার ব্যবস্থা নিবেন।

উল্লেখ্য, এসব বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা নিতে পারেন এলাকার তরুণ সমাজ, মসজিদের ইমাম কিংবা মন্দিরের পুরোহিতও। তাতে করে বাল্যবিবাহ রোধের ব্যাপক সম্ভবনা রয়েছে। রয়েছে দরিদ্র কনের বাবার আর্থিক দণ্ড থেকে মুক্তি মেলার সুযোগও। ফলে বিয়ের দিন আইন প্রয়োগের হাতে থেকে রক্ষা পাবেন মেয়ের বাবা ও পরিবার-পরিজন।

আলম শাইন: কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট ও বন্যপ্রাণী বিশারদ।

জামিন হয়ে যাচ্ছে সবার!

জামিন হয়ে যাচ্ছে সবার!
তুষার আবদুল্লাহ, ছবি: বার্তা২৪.কম

সবার জামিন হয়ে যায়। এই সবাই কারা? শুনে মনে হয় অনেক মানুষ। একটি মহল্লায়, একটি গ্রামে, একটি শহরে কতো মানুষই তো থাকে। তাহলে সবাই বলতে কি মহল্লার সব মানুষের কথা বলা হচ্ছে? গ্রাম-শহরের মানুষও নিশ্চয়ই এই গোনার মধ্যে আছে। সবাই মানে তো অসংখ্য। তাহলে জামিন হয়ে যাচ্ছে অসংখ্য মানুষের।

আচ্ছা জামিন মানে কী? অপরাধের দায় থেকে মুক্তি পাওয়া, নাকি অপরাধ প্রমাণের আগ পর্যন্ত মুক্ত বাতাসে চলাচল করার স্বাধীনতা? এমনও তো হতে পারে জামিন মানে কাউকে পরোয়া না করার দাম্ভিকতা। মহল্লা, গ্রাম, শহরের সবাই কি অপরাধী? কারণ শুরুতেই যে বলা হয়েছে, সবাই জামিন পেয়ে যাচ্ছে। কে দিল এই খবর? টিনে বারি দিয়ে মহল্লা, গ্রাম, শহরে খবর ছড়াচ্ছে কে, সবার যে জামিন হচ্ছে? মানুষ। হুম, মানুষ তার দুঃখের কথা জানাচ্ছে। মানুষ তার অসহায়ত্বের কথা জানাচ্ছে। তাহলে এই যে বলা হলো সবাই, সেখানে কি মানুষ নেই?

সবাই বলতে তো অগণিত, অসংখ্য বোঝায়, সেখানে মানুষ থাকবে না কেন? মানুষেরা নির্বাসনে গেছে? এমন সংবাদই পাওয়া যাচ্ছে। যাবে না কেন? মহল্লার দু’পায়ের যে প্রাণী পাশের বাড়ির শিশুকে জমির লোভে মাটিতে পুঁতে রেখেছিল, সে এখন শীষ বাজিয়ে ঘুরে বেড়ায়। দু’পায়ের দল গ্রামের কিশোরীকে ধর্ষণ করার পরেও হুঙ্কার থামায়নি। নতুন কিশোরী তাদের নজরে। চাকায় মানুষ পিষে ফেলে ছিল যে, তাকে এখনও দেখা যায় রঙিন কাঁচের আড়ালে শীতাতাপ মোটর যানে। আগুনে পুড়ে গেল কতো প্রিয় মুখ। পুড়িয়ে মারলো যে সংঘ, তারা আষাঢ়ে ক্ষমতার রোদ পোহায়।

মানুষ নামে আছে যে বিলুপ্ত প্রায় সম্প্রদায়, তারা ক্রমশ গুহাবাসী হয়ে পড়ছে। কোনোভাবে মুখ বের করে দেখছে- কোথাও কোনো অপরাধ নেই। যেহেতু অপরাধ নেই, তাই সবাই শরতের রোদ্দুর দেখছে। আগাম হৈমন্তী হাওয়া শরীরে মাখিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মহল্লায় তাদের সালিশে ডাকবে কে, গ্রামে সালিশ বসানোর মুরোদ কার, আর শহর? রঙিলা শহরের নকশাকার তো ওই ওরাই। যাদের জামিন হয়ে যায়। সংখ্যায় ওরা লঘিষ্ঠই ছিল। ক্রমশ ওরা নদর্মার কালো জলের মতো বুদঁ বুঁদ ছড়াতে থাকে। সেই ছোট একটি বুঁদ বুঁদের উৎস থেকে তৈরি হয়েছে কালো জলের জলাশয়। সেই জলও নাকি কালো নয়। সেই জলের দুর্গন্ধেরও নাকি সুবাস আছে। মহল্লা, গ্রাম, শহরে সেই গল্পের বয়ান চলছে। কাগজের জাদুর পরশে কালো সাদা হয়ে যাচ্ছে। অপরাধী সুবোধ হয়ে যাচ্ছে। সুবোধকে দেওয়া হচ্ছে অপরাধীর বেশ।

ওদের জামিন হয়ে যাচ্ছে বলে রাতের বাঁদুরও ভয়ে আছে। নেকড়েরা মহল্লা, গ্রাম, শহর ছেড়েছে। কিন্তু গুটিকয় সেই মানুষেরা? ওরা নির্বসানে যাবে কোথায়, গোলকে এমন কোনো ভূখণ্ড আছে, ব-দ্বীপে এমন আছে কোনো শুদ্ধ জমিন? যেখানে মানুষ মিশে যেতে পারবে দোঁ-আশের সঙ্গে? মানুষ এক আশ্চর্য প্রাণ। কি মহাকাশ, মহাকাল সমান ধৈর্য্য তার। আবার তার গরিষ্ঠ হবার সাধ।

জামিন যাদের হচ্ছে হোক না। কতোদূর যাবে ওরা, পোড়াবে, নষ্ট করবে কতোটা? মানুষ জানে সেই দু’পায়ের প্রাণীদের মুরোদ। ওদের আত্মমৃত্যুর উৎসব সন্নিকটে। মহাকার লাখ প্রাণীর মতোই, মহাদানব এই দু’পায়ের অপরাধীরা বিলুপ্ত হবেই। সবাই, অসংখ্য বলতে আসলে মানুষই সত্য। ক্ষুদ্র শুধু জামিন পেয়ে যাওয়ার দল। ওদের আসলে জামিনের সুযোগ নেই।

তুষার আবদুল্লাহ: বার্তা প্রধান, সময় টেলিভিশন

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র