Barta24

সোমবার, ২৬ আগস্ট ২০১৯, ১১ ভাদ্র ১৪২৬

English

মুজিবনগর সরকার, ইন্দিরা গান্ধী ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা

মুজিবনগর সরকার, ইন্দিরা গান্ধী ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা
মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান ছবি: বার্তা২৪
মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান


  • Font increase
  • Font Decrease

১০ এপ্রিল, ১৯৭১ মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলা গ্রামে মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়। চরম ক্রান্তিকালে দেশের অভ্যন্তরে সরকার গঠনের এ ঘটনা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সরকারের অধিকাংশ কর্মকাণ্ড দেশের বাইরে থেকে পরিচালিত হতো বলে এ সরকারকে প্রবাসী মুজিবনগর সরকার বলে অভিহিত করা হতো। ১৯৭১ সালের এই দিনে ঐতিহাসিক মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণ করে।

দুই.

মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখার জন্য বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’-এ ভূষিত করা হয় (২৫ জুলাই, ২০১১) । তাঁর পুত্রবধূ সোনিয়া গান্ধী সেই সম্মাননা গ্রহণ করেন। পাশাপাশি ভারত সরকারকে ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা’ প্রদান করা হয়।

বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য প্রবল আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি; মুক্তিযুদ্ধের সময় আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন স্থানের সীমান্ত খুলে দেয়া; প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয়; কলকাতায় প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী কার্যালয় স্থাপনে সহায়তা; বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারকে সব ধরণের সহায়তা প্রদান; বিশ্বব্যাপী জনমত গড়ে তোলা; মুক্তিবাহিনীকে প্রশিক্ষণ প্রদান; অস্ত্র-গোলাবারুদ জোগান এবং সর্বোপরি মুক্তিবাহিনীর সাথে যৌথ অভিযানে অংশ নিয়ে মাত্র নয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জনে ইন্দিরা গান্ধী, তাঁর সরকার এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী যে ভূমিকা রেখেছিলেন, সেই অবদানকে বাংলাদেশের জনগণ অকৃত্রিম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।

তিন.

২৫ মার্চ, ১৯৭১ পাকিস্তানের সামরিক সরকার ‘অপারেশন সার্চলাইট’ এর মাধ্যমে ঢাকাসহ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় জাতিসংঘের যুদ্ধনীতি তোয়াক্কা না করে ইতিহাসের নির্মমতম গণহত্যা পরিচালনা করে এবং বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানের করাচি নিয়ে যায়। তারপর অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে মিয়াওয়ালি লয়ালপুর জেলে (বর্তমানে ফায়সালাবাদ কেন্দ্রীয় কারাগার) দীর্ঘ প্রায় ১০ মাস আটক করে রাখে। গ্রেফতার হওয়ার প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা টেলিগ্রাফের মাধ্যমে চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নানের কাছে পাঠাতে সক্ষম হন এবং এম এ হান্নান ২৬ মার্চ, ১৯৭১ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পাঠানো স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন।

গণহত্যার সুবিধার্থে পাক সামরিক বাহিনী বেতার ও টেলিভিশনের সম্প্রচার বন্ধ করে দেয় এবং ঢাকায় কারফিউ জারি করে। বাংলাদেশের এমন দু:সময়ে ২৭ মার্চ, ১৯৭১ ইন্দিরা গান্ধী অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে বাংলাদেশের পাশে থেকে সকল সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস দেন।

চার.

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে ইন্দিরা গান্ধী ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলের চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জে এফ আর জ্যাকব এবং চিফ অব স্টাফ জেনারেল শ্যাম মানেকশকে সমূহ যুদ্ধের জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত করতে বলেন। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি সহায়তা অব্যাহত রাখলেও বেশ কিছু কারণে ভারত সরকার একটু দেরিতে বাংলাদেশ সরকারকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়।

কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল: (১) পূর্ব পাকিস্তানের উপর পশ্চিম পাকিস্তানের জুলুম, নির্যাতন ও বঞ্চনার ব্যাপারে বিশ্ববাসীকে বুঝতে সময় দেয়া; (২) বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী ও তাঁর জীবনের ঝুঁকি থাকা; (৩) বাংলাদেশের নদী, হাওড়-বাওড়, জলাভূমির প্রাচুর্যতা ও বিস্তৃতি যুদ্ধের অনুকূলে না থাকায় ভারতীয় সেনাবাহিনী শীতকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চাওয়া; (৪) বিশ্বের গণমাধ্যমকে পাকিস্তানের প্রকৃত অবস্থা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে সময় দেয়া; (৫) সামান্য ভুলে যাতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সমূহ সম্ভাবনা নষ্ট না হয়ে যায়; (৬) ৩য় বিশ্বযুদ্ধের কোনো সম্ভাবনা যেন তৈরি না হয়; (৭) ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা বাংলাদেশের মানুষের ন্যায়সঙ্গত চাওয়া, ভারতের কোনো নিজস্ব স্বার্থ এখানে জড়িত নেই’- বিষয়টি বিশ্ববাসীকে বুঝতে সময় দেয়া; (৮) ‘সৃষ্ট মুক্তিযুদ্ধ পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বা বিদ্রোহ নয়’ বিষয়টি স্পষ্ট হতে সময় নেয়া প্রভৃতি।

পাঁচ.

১০ এপ্রিল, ১৯৭১ বাংলাদেশের অস্থায়ী মুজিবনগর সরকার গঠিত হয় এবং ১৭ এপ্রিল, ১৯৭১ অস্থায়ী সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত সাংবাদিকদেরকে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের কাছে স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান, বন্দী বঙ্গবন্ধুর নি:শর্ত মুক্তি, পাকিস্তানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি ও বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ অনুরোধ করেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Apr/17/1555491313725.jpg

পাকিস্তান সামরিক বাহিনী ২ আগস্ট, ১৯৭১ দেশদ্রোহিতার অভিযোগে কারাগারে আটক বঙ্গবন্ধুর বিচারের ঘোষণা দিলে ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ভারতের প্রধান প্রধান শহর যেমন, কলকাতা, দিল্লী, বোম্বেতে মিথ্যা ও প্রহসনের বিচারের উদ্যোগের প্রতিবাদ জানায় এবং ইন্দিরা গান্ধী স্পষ্ট ভাষায় বিচার বন্ধের আহবান জানান ।

প্রেসিডেন্ট নিক্সন এবং তাঁর প্রশাসনকে বোঝাবার জন্য নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ইন্দিরা গান্ধী যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান এবং ৪ নভেম্বর, ১৯৭১ প্রেসিডেন্ট নিক্সনের সঙ্গে ওয়াশিংটনে তাঁর বৈঠক হয়। আলোচনার সময় বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গটি উত্থাপন করা হলে নিক্সন তা উপেক্ষা করেন। নিক্সনের সাথে নৈশভোজে ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের মানুষের পাশে থাকার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এর মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্র পাকিস্তানি সৈন্যদের সাথে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর রক্তক্ষয়ী লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছিল।

অবশেষে ৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে সর্বপ্রথম রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করে।

ছয়.

শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করে পরাজিত পাক বাহিনী ৮ জানুয়ারি, ১৯৭২ বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি দেয়। স্বদেশের পথে ১০ জানুয়ারি, ১৯৭২ তিনি দিল্লির পালাম বিমানবন্দরে (বর্তমানে ইন্দিরা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট) যাত্রা বিরতি করেন। ভারতের রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, তাঁর মন্ত্রিসভার সব সদস্য এবং পদস্থ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাগণ বঙ্গবন্ধুকে বিনম্র শ্রদ্ধা ও উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।

দুই দেশের জাতীয় সঙ্গীত বাজিয়ে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জনককে রাষ্ট্রীয় অভিবাদন জানানো হয়। বঙ্গবন্ধুর সম্মানে আয়োজিত দিল্লীর প্যারেড গ্রাউন্ডের জনসভায় ইন্দিরা গান্ধী বক্তব্য শেষ করলে বঙ্গবন্ধু তাঁর বক্তব্য ইংরেজিতে শুরু করেন। কিন্তু, জনতার পক্ষ থেকে বাংলায় বক্তব্য প্রদানের প্রবল দাবি উঠে।

হৃদয়ে কৃতজ্ঞতা ও মুখে হাসির ঝলকানি নিয়ে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আমার ভাই ও বোনেরা…আপনাদের প্রধানমন্ত্রী, আপনাদের সরকার, আপনাদের সৈন্যবাহিনী, আপনাদের জনসাধারণ যে সাহায্য এবং সহানুভূতি আমার দু:খি মানুষকে দেখিয়েছেন চিরদিন বাংলার মানুষ তা ভুলতে পারবে না…’৷

২০০৯ সালে বর্তমান সরকার দ্বিতীয় মেয়াদে (২০০৯-২০১৪) ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অকুণ্ঠ সমর্থন ও অবর্ণনীয় আত্মত্যাগের মাধ্যমে নৈতিক, সাংস্কৃতিক, কূটনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক প্রভৃতিভাবে যারা সহায়তা করেছিলেন এমন ৫৬১ জন বিশ্বনেতা, ব্যক্তি ও সংগঠনের তালিকা তৈরি করেছিল। তখন পর্যায়ক্রমে সকলকে বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান করার বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। বর্তমান সরকারকে তার ৪র্থ মেয়াদে (২০১৯-২০২৪) সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা উচিত বলে আমরা মনে করি।

মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান: পি.এইচ.ডি গবেষক, ঝেজিয়াং ইউনিভার্সিটি, চীন এবং সাবেক সভাপতি, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বশেমুরবিপ্রবি, গোপালগঞ্জ।

আপনার মতামত লিখুন :

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাধা কোথায়?

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাধা কোথায়?
ফরিদুল আলম, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

টানা দ্বিতীয়বারের মতো হোঁচট খেল বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া। গত বছর ১৫ নভেম্বর প্রথমবারের মত প্রত্যাবাসনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পরও প্রত্যাবাসনের দিন বেঁকে বসেন রোহিঙ্গারা। সে দফায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া থেমে গেলে আবার মিয়ানমার সরকারের সম্মতিতে ২২ আগস্ট ৩ হাজার ৫৪০ জন রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানোর প্রস্তুতি নেয় বাংলাদেশ। কিন্তু ফলাফল একই, কারণ প্রত্যাবাসনের এই প্রক্রিয়াটি নেওয়া হয় অনেকটা বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার সরকারেরে মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে।

আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইন মোতাবেক শরণার্থীর মর্যাদা পাওয়া কাউকে যে তার সম্মতি ব্যতিরেকে প্রত্যাবাসন করা যায় না সে কথা বোধ হয় আমরা বারবার ভুলে যাচ্ছি। আরেকটি কথা, শরণার্থী জীবন অভিশাপের শামিল জানা সত্ত্বেও এদেশে বসবাসরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী কেন নিজ দেশে ফিরতে চান না সেটা রহস্যে ঘেরা। এখানে একটি যৌক্তিক বিষয় হচ্ছে, নিজ দেশে তাদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ফেরত যাবার ব্যাপারে আগ্রহী না হওয়াটাই স্বাভাবিক। আর আমরা এটাও জানি যে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নাগরিকত্ব বাতিল করলেও বিভিন্ন সময় আন্তর্জাতিক চাপ এবং বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবার বিষয়েই আশ্বস্ত করে এসেছে। কিন্তু এই প্রত্যাবাসনের পথে বড় সমস্যা হিসেবে দেখানো হয়েছে সেখানে গিয়ে রোহিঙ্গাদের সম্পত্তি, বসতভিটে এবং জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হবার বিষয়টি।

তাদের বরাবরের আশ্বাসের পর দুবার এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া থমকে যাবার পেছনে আরেকটি বড় কারণ এদেশে কর্মরত বেসরকারি সাহায্য সংস্থাগুলো। গত ২২ জুন দ্বিতীয়বারের মত এই প্রক্রিয়া ভণ্ডুল হবার পর জাতীয় সংসদ ভবনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির এক সভায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত সব সাহায্য সংস্থার কার্যক্রম মনিটর করার সুপারিশ জানানো হয়।

কথিত রয়েছে যে এদেশে কর্মরত এনজিওগুলো বারবার এই প্রত্যাবাসনের পথে বড় অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। এর আগেরবারও যখন এই প্রত্যাবাসন বাঁধাগ্রস্ত হয়েছিল সেদিনও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ নিয়ে কথা হয়েছিল। কিন্তু এর পরও এসব এনজিওর কার্যক্রমের যথাযথ মনিটরিং সম্ভব হয়নি। কিছুদিন আগে সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছিলেন, এনজিওগুলো ‘ইল মোটিভ’ নিয়ে কাজ করছে।

পরপর দ্বিতীয়বারের মত এই প্রত্যাবাসন ব্যর্থ হবার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আবারও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর আশাবাদ জানানো হলেও পরিস্থিতি এখন কিন্তু আসলে জটিল আকার ধারণ করছে। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে, বিষয়টি নিয়ে ষড়যন্ত্রের ডালপালা বিস্তৃত হচ্ছে। আর এই ষড়যন্ত্রের মূল হচ্ছে বাংলাদেশকে একটি অস্থিতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত করা। আর এক্ষেত্রে যতটুকু না আন্তর্জাতিক মহল যুক্ত তার চেয়ে বেশি যুক্ত আভ্যন্তরীণ কর্মকগুলো। এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে না পারলে এক সমূহ দুর্যোগের সম্মুখীন হবে বাংলাদেশ।

কিছুদিন আগে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে মিয়ানমার সরকার যদি প্রতিদিন ৩০০ জন করে রোহিঙ্গাকে ফেরত নেয়, তবে এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লাগবে ৭ বছর, আর এই সময়ে খরচ হবে ৪৪৩ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়েছে যে রোহিঙ্গাদের জন্য ক্যাম্প তৈরি করতে ৬ হাজার একর বনভূমি উজাড় করা হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য ৭৪১ কোটি টাকা। এছাড়া প্রতিদিন রোহিঙ্গাদের অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ডের ফলে বনভূমি এবং জীব বৈচিত্র্যের ক্ষয়ক্ষতি হয়েই চলছে।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এই অবস্থা নিয়ন্ত্রণে সাময়িকভাবে কিছু সংখ্যক রোহিঙ্গাকে নোয়াখালীর ভাসানচরে স্থানান্তরিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হলেও তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে দেশি এবং বিদেশি এনজিওগুলো কর্তৃক রোহিঙ্গাদের এ বিষয়ে নিরুৎসাহিত করার কারণে। এক কথায় সরকারের বর্তমান তৎপরতায় এক ধরনের অসহায়ত্ব প্রকাশ পাচ্ছে, যা আমাদেরও দারুণভাবে চিন্তিত করে তুলছে।

অবস্থা এখন যা দাঁড়িয়েছে তা থেকে মনে হচ্ছে, এই সমস্যা সহজে মেটার নয়। আপাতদৃষ্টিতে বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের জন্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত ত্রাণ সহায়তা দিলেও এই সহায়তা দীর্ঘকালীন সময় ধরে চলবে এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। ইতোমধ্যে গত ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্ব খাদ্য সংস্থার নির্বাহী পরিচালক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতে জানিয়েছেন যে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের খাদ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে তাদের আর্থিক সঙ্কট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। উল্লেখ্য, রোহিঙ্গাদের খাদ্য সরবরাহের কাজটি বিশ্ব খাদ্য সংস্থা করে থাকে এবং এই খাতে তাদের প্রতি মাসে খরচ হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ মিলিয়ন ডলার।

এই অবস্থায় আমরা যদি নিকট ভবিষ্যতে এসব দাতাগোষ্ঠীকে পিছু হটে যেতে দেখি তবে অবাক হবার কিছু থাকবে না। তাই দ্রুত এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনের কোনো বিকল্প নেই। এখানে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার সরকারের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মধ্য দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে বলেও মনে হচ্ছে না, কারণ মিয়ানমার নামমাত্র সংখ্যক রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে রাজি হলেও আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়নি। দরকার তাই মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের জন্য ‘সেইফ হোম’ প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সমন্বয়ে যৌথ নজরদারি এবং সেই সঙ্গে এনজিওগুলোর ওপর কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করা। প্রয়োজনে প্রত্যাবাসনের স্বার্থে জাতিসংঘ ব্যতীত অপরাপর এনজিওগুলোর কার্যক্রম সাময়িকভাব বন্ধ করে দেওয়া যেতে পারে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ব্যক্তিত্ববানরা শ্রদ্ধার পাত্র হবেন-এটাই স্বাভাবিক 

ব্যক্তিত্ববানরা শ্রদ্ধার পাত্র হবেন-এটাই স্বাভাবিক 
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

 

ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব একটা ভাবি না বিধায় পরিবার থেকে আমাকে অনেক কথা শুনতে হয়। নিজের কাজগুলোকে ভালোভাবে উপভোগ করাটাকেই আমি মুখ্যভাবে দেখি। পারিবারিক জীবনের পাশাপাশি পেশাগত জীবনেও এর প্রতিফলন ঘটে বলে আমি মনে করি।

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের একজন কর্মকর্তা হিসেবে অনেকের সাথে মেলামেশা করতে হয়।মানুষের সাথে মেলামেশা করতে ভালোই লাগে। যদিও মানুষের সঙ্গে মেশা ও মানুষকে জানার আগ্রহ ছিল ছোটবেলা থেকেই। খুব সহজেই পরিচিত-অপরিচিত সবার সঙ্গেই মিশতে পারি, সেজন্য বন্ধুর সংখ্যাও কম নয়।

পারিবারিক হোক আর পেশাগত হোক আমরা মাঝে মাঝে কিছু মানুষকে দেখতে পাই যাদের ব্যক্তিত্বের সৌন্দর্যে আমরা আটকে যাই-বিমোহিত হই। মানুষের চলাফেরা, কথাবার্তা, অঙ্গভঙ্গি এবং তার চিন্তাধারায় ব্যক্তিত্ব ফুটে ওঠে। আচরণই যেহেতু ব্যক্তিত্ব, তাই আমরা চাইলেই আমাদের ব্যক্তিত্ব পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করতে পারি। বেহুদা যুক্তিতর্ক না করে ব্যক্তিত্ব উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন নিজের কথার সাথে কাজের মিল রাখা। সময় ও অবস্থান বুঝে আচরণ করা। উদাহরণ স্বরূপ-পরিবারের মানুষের সঙ্গে একরকম আচরণ, প্রতিবেশীদের সঙ্গে একরকম, বয়সভেদে একরকম এবং পরিচিতদের সঙ্গে একরকম ও অপরিচিতদের সঙ্গে একরকমের আচরণ হওয়া উচিত।

কোন সমস্যার সন্মুখীন হলে অভিযোগ করার পরিবর্তে কীভাবে সমাধান করা যায় তার চেষ্টা করা দরকার। যিনি নিজের সমস্যা নিজে সমাধান করতে পারেন, তিনি শুধু নিয়োগকর্তা কর্তৃক নয় পারিবারিকভাবেও প্রশংসিত হোন। সমস্যার সন্মুখীন হয়ে যদি কেউ তা কোন অভিযোগ ছাড়াই উতরানোর চেষ্টা করেছেন-যদি তিনি সমাধান করতে ব্যর্থও হোন তবুও তাতে তার জানার আগ্রহ প্রকাশ পায়।

প্রখর বাস্তব বুদ্ধি, চতুরতা ও সহিষ্ণুতা থাকলে পুঁথিগত বিদ্যা না থাকা সত্ত্বেও উন্নত ব্যক্তিত্বের অধিকারী হওয়া যায়।

তাই কারো করুণার পাত্র না হয়ে নিরপেক্ষভাবে বুদ্ধিমত্তার সাথে কথা বলার অভ্যাস করতে হবে। ব্যক্তিত্ব বিকাশের মূল উৎস হচ্ছে মানসিকতা আর বিবেক ও আবেগ দ্বারাই মানসিকতা গড়ে ওঠে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় বেরিয়েছে পৃথিবীর ৮৭% লোক তাদের অ্যাটিচুডের কারণে সফল হয়। আর এই অ্যাটিচুড দুই প্রকার। যথা:- ১.রি-অ্যাক্টিভ Vs ২.প্রো-অ্যাক্টিভ।

দেয়াশলাই এর একটি কাঠি দিয়ে যেমন ঘর পোড়া যায় আবার আলোকিত হয় তেমনি একটি গ্লাস দিয়ে মদ খাওয়া যায় আবার দুধ খাওয়া যায়। একইভাবে একটি সেলফোন দিয়ে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক তৈরি করা যায় আবার প্রয়োজনীয় যোগাযোগ করা যায়। তাই প্রো-অ্যাক্টিভ হওয়ার জন্য পাঁচটি জিনিস অন্যকে দিতে হবে। যথা:- ১.Respect (সম্মান) ২.Influence (উৎসাহ) ৩.Help (সহযোগিতা) ৪.Gratitude (কৃতজ্ঞতা) ৫.Experience (অভিজ্ঞতা)।

ব্যক্তিত্বের অনুভূতি অন্য রকম। আমরা বলে থাকি-তিনি চমৎকার কথা বলেন, তার চমৎকার ধৈর্য, মানুষকে সহজেই মেনে নিতে পারে। আহা! তার মতো যদি হতে পারতাম...।  

ব্যক্তিত্ববানরা সকল ভয়, হীনম্যনতা ও অসুখীর মায়াজাল থেকে মুক্ত থাকতে পারে বিধায় তারা সফল এবং সন্মানের যোগ্য। জীবনে সফল হওয়া সহজতর না হলেও ব্যক্তিত্ববানরা এক্ষেত্রে এগিয়ে থাকেন। কেবল সুন্দর পোশাক আর বিলাসিতায় মজে থাকলে ব্যক্তিত্ব ফুটে ওঠে না, প্রয়োজন শুধু ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি।

ব্যক্তিত্ববানরা অনেক সাধারণ পোশাক যেমন সুন্দরভাবে পরিধান করে, আবার অনেক সাধারণ কথাও সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে। তাদের তাকালেই শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছে করে। ব্যক্তিত্ববান মানুষ ধনী-গরীব, জাত-কুল নির্বিশেষে মানুষের শ্রদ্ধার পাত্র হয়। তাই ব্যক্তিত্ববানরা আমাদের উপর বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারেন। যে মানুষগুলো এত সংযম রেখে চলেন-তারা আমাদের ওপর প্রভাব ফেলবেন এবং শ্রদ্ধার পাত্র হবেন এটাই স্বাভাবিক। 

মুত্তাকিন হাসান: কবি, প্রাবন্ধিক ও মানব সম্পদ পেশাজীবী   

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র