‘দেশবিরোধী চুক্তি’ সমালোচনার জবাবে যা বললেন প্রধানমন্ত্রী

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম, ঢাকা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাম্প্রতিক ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি সফর নিয়ে বুধবার সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন | ছবি: ফোকাস বাংলা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাম্প্রতিক ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি সফর নিয়ে বুধবার সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন | ছবি: ফোকাস বাংলা

  • Font increase
  • Font Decrease

সম্প্রতি ভারত সফরে দেশটির সঙ্গে স্বাক্ষর হওয়া কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক নিয়ে দেশে তৈরি হওয়া সমালোচনার যৌক্তিক কোন কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

হঠাৎ তৈরি হওয়া হৈ-চৈ কেন হচ্ছে সেটাও তিনি জানতে চেয়েছেন। বিরোধীদলগুলো থেকে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে নিয়ে ‘দেশবিরোধী চুক্তি’ করার অভিযোগকেও সপাটে উড়িয়ে দিয়েছেন সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, ‘দেশের স্বার্থ শেখ হাসিনা বিক্রি করে দেবে- এটা কখনও হতে পারে না।’

সাম্প্রতিক ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি সফর নিয়ে বুধবার (০৯ অক্টোবর) বিকেলে গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ঘড়ির কাঁটায় ঠিক সাড়ে তিনটায় সংবাদ সম্মেলন স্থলে এসে উপস্থিত হন প্রধানমন্ত্রী। তার সঙ্গে মঞ্চে আসন গ্রহণ করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন ও প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। এর পরই প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা শুরু করেন।

শুরুতেই নিউইয়র্ক ও ভারত সফরে প্রাপ্ত তিনটি পুরষ্কার ও সম্মাননার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন প্রেস সচিব। এরপরেই সূচনা বক্তব্য দিয়ে সংবাদ সম্মেলন শুরু করেন সরকারপ্রধান।

সূচনা বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশন ও ভারত সফরের খুটিনাটি বিষয়গুলো সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন।

ভারত সফর সম্পর্কে সূচনা বক্তব্যে শেখ হাসিনা বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এক বিশেষ উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে। সামগ্রিকভাবে এ সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নতুন গতির সঞ্চার হয়েছে।


প্রধানমন্ত্রীর সূচনা বক্তব্যের পর শুরু হয় প্রশ্নোত্তর পর্ব।

ভারতে এলপিজি রফতানি চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটুকু সংরক্ষিত হয়েছে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এলপিজি প্রাকৃতিক গ্যাস নয়। এটা আমার দেশে উৎপাদন হয় না। আমরা ত্রিপুরায় যে গ্যাসটা দিচ্ছি সেটা এলপিজি বোতল গ্যাস। যেটা আমরা আমদানি করছি বাল্কে। সে গ্যাস আমরা বোতলে করে আমাদের নিজেদের দেশে যেমন সরবরাহ করছি; সেই গ্যাসই আমরা কিছু ত্রিপুরায় দিচ্ছি। এটা হলো বাস্তবতা।

ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত আরেকটি চুক্তি হলো- ফেনী নদী থেকে ১.৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহার করে নেবে ভারত। এই চুক্তি নিয়েও হঠাৎ কেন হৈ-চৈ হচ্ছে সেটাও জানতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ফেনী নদী সীমান্তঘেঁষা নদী। আপনারা জানেন সীমান্ত ঘেষা নদীতে দুই দেশেরই অধিকার থাকে। ভারতের একটা জায়গা সাবরুম, রামগড়ের সাথে। ওখানকার মানুষের খাবার পানির খুব অভাব। তারা আন্ডারগ্রাউণ্ড থেকে পানি তোলে। আর আমার বর্ডারে আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে যখন পানি তোলে এতে কিন্তু ইফেক্ট আমার দেশেও হয়। আমার দেশের আন্ডারগ্রাউণ্ডের ভূগর্ভস্থ পানি চলে যায়।

‘সেখান থেকে সামান্য পানি আমরা তাদের দেব। এখানে যে চুক্তিটা ভারতের সাথে হয়েছে সেটা তাদের খাবার পানির জন্য। ১.৮২ কিউসেক পানি তারা প্রত্যাহার করে নেবে। আমরা যে পানিটুকু তাদের দিচ্ছি আসলে সেটার পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য। আসলে এত বড় একটা নদী সেখানে যে পরিমাণ পানি আসে সেটা আমরা ব্যবহার করি তারাও ব্যবহার করে। আর এটা নিয়ে হঠাৎ এত চিৎকার কিসের জন্য আমি ঠিক জানি না।’

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, কেউ যদি পানি পান করতে চায়, আমরা যদি তার পানিটা না দেই, এটা কেমন হবে। আমাদের তো আরও সীমান্ত নদী আছে, সেটাও তো আমাদের চিন্তা করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে ভারতের সঙ্গে করা চুক্তিগুলোকে নিয়ে বিএনপির সমালোচনাকে পাত্তাই দেননি প্রধানমন্ত্রী। বরং বিএনপি নেতাদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান অবৈধভাব ক্ষমতা দখল করে যখন ভারত গিয়েছিলেন কিংবা খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালে যখন প্রধানমন্ত্রী হয়ে ভারত যান, তারা কি গঙ্গার পানি চুক্তি করতে পেরেছিলেন? পারেননি। খালেদা জিয়া নাকি গঙ্গা নিয়ে কথা বলতেই ভুলে গিয়েছিলেন। যে দল গঙ্গা নদীর মতো বিশাল একটি নদীর পানির হিস্যার কথা বলতেই ভুলে যায় সেই দল এখন আবার সামান্য ১.৮২ কিউসেক পানির জন্য-সেটা নিয়ে এত কথা বলে কোন মুখে?

ইতিহাসের স্মৃতিচারণা করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, স্থল সীমানা চুক্তি জাতির পিতা যখন করলেন সেটা করার পরে ‘দেশ বেঁচে দিল দেশ বেঁচে দিল। বেরুবাড়ী চলে গেল/বেরুবাড়ী চলে গেল’ কত ধরনের কথা। ৭৩, ৭৪ সালের পত্রপত্রিকা পড়ে দেখবেন, ৭৫ সালের পত্রিকা পড়ে দেখলেই সেটা দেখতে পাবেন।

তিনি বলেন, আমাদের সীমান্ত চুক্তিটা জাতির পিতা যে করে গেলেন, এবং করার পরে তিনি পার্লামেন্টে আইন পাশ করলেন। সংবিধান সংশোধন করে আমাদের সীমানাটা ঠিক করা হলো। সেটা নিয়ে কত সমালোচনা ছিল। অথচ আঙ্গরপোতা-দহগ্রাম আমরা পেলাম, আমাদের তিনবিঘা করিডর।

শুধু জাতির পিতার আমলেই নয়, সমালোচকরা তাকেও যে ছাড়েনি সেটাও উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা । তিনি বলেন, আমি ৮১ সালে দেশে ফেরার পরেও শুনেছি দেশ বেচার চুক্তি। ২৫ বছরের চুক্তি দেশ বেচার চুক্তি। আর এরপর যখন আমি দ্বিতীয় বার সরকারে এসে যখন আমরা সীমানা নির্দিষ্ট করলাম। ভারতের পার্লামেন্টে সর্বসম্মতিক্রমে আইনটা পাস হলো, আপনারা নিজেরাই বিবেচনা করে দেখেন।


সমালোচকদের জবাবে সরকারপ্রধান বলেন, যারা এত কথা বলেছিল তারা ক্ষমতায় এসেই সীমানা চুক্তি বাস্তবায়নের চেষ্টা করেনি কেন? পঁচাত্তরের পরে যারা ক্ষমতায় এসেছিল তারা কী করেছিল? নাকে তেল দিয়ে ঘুমুচ্ছিল সব? তারা কখনো সমুদ্রসীমার কথা বলেছে? বলেনি। স্থল সীমানা চুক্তি করেছে? করেনি। তাহলে তারা আবার এত কথা বলে কী করে?

‘আবার মিছিল আন্দোলন অনেকে করেই ফেলল। আর আমাদের কিছু আল্ট্রা বাম নেতারা আছে তারাও দেখি নেমে পড়েছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার কথা হচ্ছে- তারা যখন বলতেন বেরুবাড়ী গেল, বেরুবাড়ী গেল কিন্তু আমাদের সীমনা চুক্তি সম্পন্ন হলো, এখন কী তারা বলবেন কতটা গেছে আর কতটা পেয়েছি?

শেখ হাসিনা বলেন, পঁচাত্তর থেকে আওয়ামী লীগ সরকারে আসা পর্যন্ত দেশের কী উন্নয়নটা হয়েছে, কোন উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। নেবার মতো সে সাহসই নেই। ভারতের কাছে কিছু তুলবে সে সাহসটাই ছিল না। ভারতে গিয়ে কেউ হাঁটু ধরে মাটিতেই বসে পড়েছে। এমন বহু ঘটনা আমার জানা ছিল। সব জায়গায় আমরা আমাদের নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করেছি।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বুয়েটের ছাত্র আবরার হত্যায় জড়িতদের কোন ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানান। এ ক্ষেত্রে কে কোন দল সেটাও দেখা হবে না। তার ভাষায়, ‘অপরাধী অপরাধীই।’

বুয়েট প্রশাসন যদি চায় তবে তারা ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে পারে, তবে সারা দেশে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের সম্ভাবনা তিনি নাকচ করে দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটা ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি ওঠাবে যে, ছাত্র রাজনীতি ব্যান। আমি নিজেই যেহেতু ছাত্র রাজনীতি করে এসেছি। সেখানে আমি ছাত্র রাজনীতি ব্যান বলব কেন?

‘এই যে একটা সন্ত্রাসী ঘটনা বা এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই তো সংগঠন করা নিষিদ্ধ আছে। বুয়েট যদি মনে করে তারা সেটা নিষিদ্ধ করে দিতে পারে। এটা তাদের ওপর… কিন্তু একবারে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করে দিতে হবে, এটা তো মিলিটারি ডিক্টেটরদের কথা। আসলে তারা এসে তো সবসময় পলিটিকস ব্যান …. স্টুডেন্ট পলিটিক্স ব্যান তারাই করে গেছে।’

দেশব্যাপী চলমান শুদ্ধি অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও পুনর্বার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী।

সংবাদ সম্মেলনের আগে আমন্ত্রিত সাংবাদিকদের জন্য গণভবনের সবুজ লনে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করা হয়।

আরও পড়ুন:
‘আমি সরকার প্রধান, ঘুমিয়ে দেশ চালাই না’
বুয়েট চাইলে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে পারে
প্রাকৃতিক গ্যাস নয়, এলপিজি আমদানি করে রফতানি করছি
‘কিসের ছাত্রলীগ, ‘অপরাধী অপরাধীই’
‘বাংলাদেশের স্বার্থ শেখ হাসিনা বিক্রি করবে এটা হতে পারে না’

আপনার মতামত লিখুন :