ঘুষ-দুর্নীতিতে নাজেহাল বিজিএমইএ’র সদস্যরা!

ঊর্মি মাহবুব, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট, ঢাকা, বার্তা২৪.কম
ঘুষ-দুর্নীতিতে নাজেহাল বিজিএমইএ’র সদস্যরা। ছবি: সংগৃহীত

ঘুষ-দুর্নীতিতে নাজেহাল বিজিএমইএ’র সদস্যরা। ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

দেশের রফতানির প্রায় ৮০ শতাংশ আয় আসে পোশাক শিল্প থেকে। আর সেই পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতিতে (বিজিএমইএ) ঘুষ-দুর্নীতির যেন শেষ নেই। ইউটিলাইজেশন ডিক্লিয়ারেশনের (ইউডি) অনুমতি, কারখানা পরিদর্শনসহ এমন কোনো খাত নেই যেখানে ঘুষ বিনিময় হয় না। আর এই ঘুষ দুর্নীতিতে নাজেহাল বিজিএমইএ’র সদস্যরা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিজিএমইএ’র পরিচালনা বোর্ডের এক সদস্য বার্তা২৪.কমকে বলেন, ‘প্রতিদিনই কেউ না কেউ ইউডি সার্টিফিকেটের জন্য আসেন। কিন্তু সবাইকে বাড়তি টাকা দিয়েই ওই সার্টিফিকেট নিতে হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কারো অভিযোগ করার সাহস নেই। এছাড়াও কারখানা পরিদর্শন করাতে বিজিএমইএ’কে ঘুষ দিতে হয়। কারণ এই টাকার ভাগবণ্টন হয় সর্বোচ্চ মহল পর্যন্ত। কেউ যদি অভিযোগ করতে চান তাহলে তার পরবর্তী ইউডি আটকে দেওয়া হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রতি বছর বিজিএমইএ’র গড় আয় ১০০ কোটি টাকার বেশি। কিন্তু এই টাকা কোন খাতে ব্যয় হয় তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না।’

মুনলাক্স নিটওয়্যার গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. শামসুল আলম বার্তা২৪.কমকে বলেন, ‘অর্থ ছাড়া বিজিএমইএ’তে কোনো কাজ হয় না। আমার একটি নতুন কারখানার পরিদর্শন করাতে দীর্ঘদিন ঘুরতে হয়েছে, ঘুষও দিতে হয়েছে। এটা শুধু আমার ক্ষেত্রে না, অসংখ্য মালিক আছেন যাদের ঘুষ দিয়েই কাজ করাতে হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিজিএমইএ’তে ব্যাপক অনিয়ম হলেও এর কোনো সমাধান নেই। কারণ অভিযোগ করলে কমিটি মালিকদের সঙ্গে যে ব্যবহার করে তা খুবই অপ্রত্যাশিত।’

এদিকে এসব ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগে ফুঁসে উঠেছেন বিজিএমইএ’র সাধারণ সদস্যরা। সম্প্রতি সংগঠনটির এক অভ্যন্তরীণ বৈঠকে এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশও ঘটেছে।

জানা গেছে, গত ৩ জানুয়ারি রাজধানীর রেডিসন ব্লু হোটেলে বিজিএমইএ সদস্যদের নিয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে অনেকে বিজিএমইএ’র দুর্নীতির প্রতিবাদ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ওই অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ও সংগঠনটির সহ-সভাপতি (অর্থ) মোহাম্মদ নাসির কাউকে প্রশ্ন করা বা কথা বলার সুযোগ দেননি। তবে বৈঠকের শেষে সদস্য মো. শামছুল আলমকে এক মিনিট বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।

কথা বলার সুযোগ পেয়ে মো. শামসুল আলম বলেন, ‘বিজিএমইএ’তে এখন কোনো কাজই ঘুষ ছাড়া হয় না। যে কাজই করতে চাই তাতে ঘুষ দিতে হয়।’

এ সময় তার কথার সমর্থন করে অন্য সদস্যরা হাততালি দিতে থাকেন। তাৎক্ষণিকভাবে মোহাম্মদ নাসির ধমক দিয়ে শামসুল আলমকে তার অভিযোগের প্রমাণ নিয়ে পরের দিন তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।

এর প্রতিক্রিয়ায় সংগঠনটির স্বাধীনতা পরিষদের আহ্বায়ক মো. জাহাঙ্গীর আলম মোহাম্মদ নাসিরকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘দেখুন সাধারণ সদস্যদের সমস্যা নিয়ে অভিযোগ করার পূর্ণ অধিকার আছে। আপনি প্রমাণ চেয়ে যেভাবে শাসাচ্ছেন এটা খুবই দুঃখজনক।’

এ সময় বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি ও বর্তমান বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সী বলেন, ‘এ সমস্যার সমাধান করা উচিত। সত্যিই যদি কাজ করাতে ঘুষ দিতে হয়, তাহলে সেটা খুবই অন্যায়। শিগগিরই এই সমস্যার সমাধান করা উচিত।’

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সদস্যদের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়কালে নীরব ভূমিকা পালন করেন বিজিএমইএ’র বর্তমান সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান।

তবে এসব ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বিজিএমইএ’র স্বাধীনতা পরিষদের আহ্বায়ক মো. জাহঙ্গীর আলম বার্তা২৪.কমকে বলেন, ‘সাধারণ সদস্যরা সমস্যায় পড়লে কমিটির কাছে অভিযোগ করবে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেদিন যেভাবে শামসুল আলম ভাইয়ের কথার জবাব দেওয়া হয়েছিল তাতে আমি বেশ অবাক হয়েছি। আমার মনে হয়েছিল একজন সাধারণ সদস্য হিসেবে কমিটির এমন প্রতিক্রিয়ার প্রতিবাদ করা উচিত। তাই সেদিন প্রতিবাদ করেছিলাম।’

তবে এসব বিষয়ে বিজিএমইএ’র অবস্থান জানতে সহ-সভাপতি (অর্থ) মোহাম্মদ নাসিরের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি।

আপনার মতামত লিখুন :