Alexa

আশ্বাসে ভরসা নেই বিনিয়োগকারীদের, বাস্তবায়ন চান

আশ্বাসে ভরসা নেই বিনিয়োগকারীদের, বাস্তবায়ন চান

দেশের দুই পুঁজিবাজার ডিএসই ও সিএসই/ ছবি: সংগৃহীত

চলতি বছরের শুরু থেকেই পুঁজিবাজারে চলছে দরপতন। আর এই পতন ঠেকাতে সরকার একের পর এক আশ্বাস দিয়েছে। যার কিছু কিছু বাস্তবায়নও হচ্ছে। কিন্তু এসবেও ভরসা নেই বিনিয়োগকারীদের। ফলে বাজারে এখন নতুন করে বিনিয়োগ করছেন না বিনিয়োগকারীরা। তাদের দাবি, আগে সরকারের প্রতিশ্রুতি বা উদ্যোগগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন হওয়া দরকার। যাতে বাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্যমতে, গত ২৭ জানুয়ারি থেকে ১ মে পর্যন্ত বিনিয়োগকারীরা ৬৩ হাজার কোটি টাকার মূলধন হারিয়েছেন। প্রতিদিনই মূলধন কমছে।

আর বাজার বিশ্লেষকদের পরামর্শ, সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে হবে এবং তারল্য সংকট দূর করতে হবে। কারণ খারাপ কোম্পানির সাথে সাথে ভালো কোম্পানির শেয়ারের দামও কমছে। ফলে দেশি বিনিয়োগকারীর পাশাপাশি বিদেশিরাও বিনিয়োগ তুলে নিচ্ছেন।

গত কয়েক মাসের বাজার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি থেকে পুঁজিবাজারে দরপতন শুরু হয়। এরপর উদ্যোক্তাদের শেয়ার বিক্রির হিড়িক ও অনৈতিক প্লেসমেন্ট বিক্রিসহ বেশ কিছু ইস্যু যোগ হয়ে মার্চ পর্যন্ত চলে দরপতন। এ সময় বিনিয়োগকারীরদের প্রত্যাশা ছিল, অর্থমন্ত্রী পুঁজিবাজারকে স্থিতিশীল রাখতে উদ্যোগ নেবেন।

কিন্তু অর্থমন্ত্রী উল্টো সংবাদপত্র ও বিনিয়োগকারীদের সমালোচনা করে বলেন, ‘পুঁজিবাজার ভালো আছে। কিন্তু মিডিয়া উল্টাপাল্টা লিখছে। পুঁজিবাজারের দরপতনের সঙ্গে কারা জড়িত সেটা চিহিৃত করা হয়েছে। কিন্তু তাদের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না ‘

এর কয়েকদিন পর তিনি আরও জানান, ‘পুঁজিবাজার সিংহ ও ছাগলের বাচ্চার বাজার। এখানে ৫ লাখ কোটি টাকা দিলেও খেয়ে ফলেবে’, ‘পুঁজিবাজারসরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই’।

অর্থমন্ত্রীর এসব নেতিবাচক মন্তব্যের পাশাপাশি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান এবং কমিশনের দায়িত্বহীনতার কারণে টানা চার মাস দরপতন চলছে। যা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। ১৯৯৬ ও ২০১০ সালেও পুঁজিবাজারে টানা চার মাস ধস হয়নি।

এদিকে, পুঁজিবাজারে দরপতনের প্রতিবাদে ও বিএসইসির চেয়ারম্যানের পদত্যাগের দাবিতে রাস্তায় নেমেছে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

এছাড়াও গত ৩০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পুঁজিবাজারে আমরা সব ধরণের সুযোগ দিচ্ছি। এখানে আগে অনেক ঘটনা ঘটেছে। আমরা স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছি। এ নিয়ে খুব বেশি শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। বাজার নিয়ন্ত্রণে যা যা করা দরকার আমরা সেগুলো করছি। তবে কেউ যদি গেইম খেলতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি ও নেব। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’

প্রধানমন্ত্রীর ঐ বক্তব্যের পর পুঁজিবাজারে গতি ফেরাতে তৎপর হয়ে উঠে বিএসইসি। বাজার সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠকে বসে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। পরে স্টক এক্সচেঞ্জ, মার্চেন্ট ব্যাংক ও শীর্ষ ব্রোকারেজ হাউসগুলো থেকে নেয়া হয় মতামত। ব্যাংকের বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকে ছুটে যান বিএসইসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক খায়রুল হোসেন।

স্টক এক্সচেঞ্জ, মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজগুলোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আইপিও আবেদন গ্রহণ ও প্লেসমেন্ট বন্ধের ঘোষণা দেয় বিএসইসি। একইসঙ্গে আইপিও প্রক্রিয়ায় তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালক ও প্লেসমেন্টধারীদের শেয়ারের লক ইন (বিক্রির উপর নিষেধাজ্ঞা) সীমা বাড়ানো হয়। পাশাপাশি আইপিও, প্লেসমেন্ট, আইপিও পরবর্তী বোনাস শেয়ার এবং উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের এককভাবে ২ শতাংশ ও সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণ সংক্রান্ত বিদ্যমান নোটিফিকেশনে সংশোধনী আনতে গঠন করা হয় দুটি কমিটি।

এদিকে সরকারের নির্দেশে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য আইসিবিকে ৮৫৬ কোটি টাকার তহবিল দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি বাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ বাড়াতে অতালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর শেয়ার বিনিয়োগ সীমার মধ্যে না ধরার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এক্সপোজারে সংশোধনী আনা এবং আইসিবিতে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একক গ্রাহকের ঋণসীমার শর্ত শিথিলের আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তুতাতেও দরপতন থামছে না।

বর্তমান বাজার পরিস্থিতির বিষয়ে বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের নেতা আতা্উল্লাহ নাইম বার্তা২৪.কম-কে বলেন, ‘পুঁজিবাজার এখন মুমূর্ষু অবস্থায় রয়েছে। পুঁজি হারিয়ে বিনিয়োগকারীরা এখন দোটানায় পড়েছেন। প্রতিদিন সূচকের পতন হচ্ছে, আর আমরা চেয়ে চেয়ে দেখছি।’

তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) এবং মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো আস্থা ও তারল্য সংকট দূর করতে কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। বিনিয়োগকারীদের কাঁধে বন্দুক রেখে তারা সুবিধা আদায়ে ব্যস্ত। কিন্তু ব্যাংকগুলোর এক্সপোজার বৃদ্ধির পাশাপাশি যেসব উদ্যোগের কথা সরকার ঘোষণা করেছে সেগুলো বাস্তবায়ন হলেই মার্কেট ঘুরে দাঁড়াবে। পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরাতে উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন জরুরি।’

ডিএসইর সাবেক প্রেসিডেন্ট শাকিল রিজভী বার্তা২৪.কম-কে বলেন, ‘পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা নেই। আস্থা ফেরাতে সরকার প্রতিশ্রুত উদ্যোগ বাস্তাবয়ন করা জরুরি। তাহলেই বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিনিয়োগকারীরা এখন আর আশ্বাসে বিশ্বাস করেন না, তারা অনেক বার প্রতারিত হয়েছেন।’

পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু আহমেদ বার্তা২৪.কম-কে বলেন, ‘সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রণোদনার কথা বলা হলেও তার ইতিবাচক প্রভাব বাজারে পড়ছে না। বাজারে ভালো শেয়ার আনতে হবে। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় ও বিএসইসি এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না।’

আপনার মতামত লিখুন :

অর্থনীতি এর আরও খবর