যোগ হচ্ছে ১৪ লাখ দরিদ্র, বরাদ্দ কমছে হিজড়া-বেদে জনগোষ্ঠীর!

আসিফ শওকত কল্লোল, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

আগামী বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা খাতে নতুন করে ১৩ লাখ ৭৫ হাজার দরিদ্র মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। বর্তমানে এ খাতের ৭৩ লাখ মানুষকে ভাতা দেয় সরকার। ফলে আগামী বাজেটে সুবিধাভোগীর মোট সংখ্যা হবে ৮৭ লাখ ৭৫ হাজার। তবে নতুনদের অন্তর্ভুক্ত করলেও বরাদ্দ কমছে হিজড়া ও বেদে জনগোষ্ঠীর।

বাজেট প্রণয়নের আওতায় সামাজিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির ২৭তম সভার কার্যবিবরণী থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে, এ কর্মসূচি বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয় বা বিভাগগুলো স্বতন্ত্র তৃতীয় পক্ষ দিয়ে এ কর্মসূচির ইনপ্যাক এনালাইসিস করাতে পারবে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে মোট বাজেটের ১৩ শতাংশ অর্থ এই সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়। চলতি অর্থবছরে এ খাতে মোট বরাদ্দ দেওয়া হয় ৬৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির আড়াই শতাংশ। আগামী বাজেটে এ খাতে মোট ৭২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে।

গত ২৯ এপ্রিল বাজেট সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সামাজিক নিরাপত্তা বলয় বাড়াতে দুটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেন। যার মধ্যে-কর্মক্ষম ভাতাভোগীদের স্বাবলম্বী করা ও সব ভাতাভোগীকে দ্রুত অনলাইন ডাটাবেজের বা ডিজিটালাইজেশনের আওতায় নিয়ে আসা। ওইদিন অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, যারা এখন ভাতা পাচ্ছেন, তাদের অনেকেই কর্মক্ষম। তাদের ভাতার আওতা থেকে বের করে আনতে আয় বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। তাছাড়া বর্তমানে বয়স্ক, বিধবাসহ কিছু ভাতার টাকা পরিশোধ পদ্ধতি ডিজিটালাইজড করা হয়েছে। অন্যান্য ভাতাও যাতে উপকারভোগীর অ্যাকাউন্টে জমা হয় সেই ব্যবস্থা করতে হবে।

বয়স্ক ভাতা: আসন্ন বাজেটে বয়স্ক (৬৫ বছর) ভাতা বাড়ানো হচ্ছে না। তবে ভাতাভোগীর সংখ্যা ৪০ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৪৪ লাখ এবং বরাদ্দ ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা করা হচ্ছে। বর্তমানে প্রতিমাসে ৫০০ টাকা হারে এ ভাতা দেয়া হয়। এছাড়া বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা ভাতাও অপরিবর্তীত থাকছে।

প্রতিবন্ধী ভাতা: বর্তমানে ১০ লাখ অস্বচ্ছল প্রতিবন্ধী ৭০০ টাকা হারে ভাতা পান।  আগামী বাজেটে অসচ্ছল প্রতিবন্ধীদের আওতা বাড়িয়ে ১৫ লাখ ৪৫ হাজারে উন্নীত করা হচ্ছে। আর ভাতা বাড়িয়ে করা হবে ৭৫০ টাকা। এছাড়া বর্তমানে ৯০ হাজার অস্বচ্ছল প্রতিবন্ধী পরিবারের ছেলেমেয়ে শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে (প্রাইমারি থেকে উচ্চতর) সর্বনিম্ন মাসিক ৭০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ এক হাজার ২০০ টাকা করে বৃত্তি পায়। আসন্ন বাজেটে  প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত ভাতা ৫০ টাকা এবং উচ্চতর স্তরে ১০০ টাকা বাড়ানো হচ্ছে। সব মিলে ১৬ লাখ ৪৫ হাজার  প্রতিবন্ধী ও তাদের পরিবারের শিক্ষিত ছেলেমেয়েকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনা হচ্ছে।

গত মাসে আন্তর্জাতিক অটিজম দিবসের অনুষ্ঠানে সব প্রতিবন্ধীদের মাসিক ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণের নিদের্শ দেন প্রধানমন্ত্রী। জরিপে ১৫ লাখ ৫০ হাজার প্রতিবন্ধী চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে ১০ লাখকে ইতোমধ্যে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা হয়েছে, বাকিদের পর্যায়ক্রমে আনা হবে।

মুক্তিযোদ্ধা ভাতা: আসন্ন বাজেটে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সুখবর থাকছে। বর্তমানে প্রায় দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা নগদ ১০ হাজার টাকা করে মাসিক ভাতা পান। যা বাড়িয়ে ১২ হাজার টাকা করা হচ্ছে। ‍এর বাইরে দুই ঈদের বোনাস, বিজয় দিবস ভাতা ও বৈশাখী ভাতা অপরিবর্তীত থাকছে।

বিধবা ভাতা:  বর্তমানে ১৪ লাখ বিধবা মাসে ৫০০ টাকা করে ভাতা পান। নতুন বাজেটে তাদের সংখ্যা বাড়িয়ে ১৭ লাখে উন্নীত করা হচ্ছে। তবে ভাতার পরিমাণ অপরিবর্তীত থাকছে।

মাতৃত্বকালীন ভাতা: বর্তমানে সাত লাখ নারী মাসে ৮০০ টাকা করে মাতৃত্বকালীন ভাতা পান। আসন্ন বাজেটে আরও ৭০ হাজার দরিদ্র মাকে এর আওতায় আনা হচ্ছে। তবে ভাতা বাড়ানো হচ্ছে না।

হিজড়া জনগোষ্টি: হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কার্ষক্রম আগামী অর্থ বছর বরাদ্দ রাখা হচ্ছে মাত্র ৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। বরাদ্দ কমানোর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, কয়েক অর্থ বছর ধরে চলা প্রশিক্ষণ আগামী অর্থ বছর বন্ধ হয়ে যাবে। এ প্রশিক্ষণ দিয়ে কোনো হিজড়া কর্ম ক্ষেত্রে ফিরে আসছে না । অন্যদিকে আগামী বছর বেদে জনগোষ্ঠীর বরাদ্দ ৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকা কমে গেছে। কারণ উপকার ভোগীর সংখ্যা ৬১ হাজার ৫০০ জন থেকে কমে ১০ হাজারে দাঁড়িয়েছে।

কার্যপত্র অনুযায়ী, বর্তমানে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সবচেয়ে বেশি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নাধীন আছে। এর মধ্যে বয়স্ক, বিধবা, অস্বচ্ছল প্রতিবন্ধী, প্রতিবন্ধী শিক্ষা উপবৃত্তি, ক্যানসার, কিডনিসহ বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তি, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী তথা বেদে সম্প্রদায় ও তাদের ছেলেমেয়েদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি, হিজড়া জনগোষ্ঠী ও চা-বাগানের শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে গৃহীত কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন অঙ্কের মাসিক ভাতা দেওয়া হয়। এর বাইরে ত্রাণ-দুর্যোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ ২২ মন্ত্রণালয় ও সংস্থা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় ১৩০টি কর্মসূচি বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।

যেমন-পেনশন সুবিধা এক ধরনের সামাজিক কর্মসূচি। এতে বছরে সরকারের ব্যয় হয় ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি। আবার কম দামে গরিবদের চাল দেওয়া, ভিজিডি, ভিজিএফ, ঘরে ঘরে চাকরি দেওয়ার লক্ষ্যে বাস্তবায়নাধীন ন্যাশনাল সার্ভিসের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন করা হয়। এরকম ১৩০টি কর্মসূচি আছে, যা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবে জনপ্রিয় এবং বড় কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন সমাজসেবা অধিদপ্তর।

আপনার মতামত লিখুন :