Alexa

নতুন সরকারের ব্যতিক্রমী বাজেট

নতুন সরকারের ব্যতিক্রমী বাজেট

বাজেট অধিবেশনে প্রবেশ করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, ছবি: সংগৃহীত

 

দেশের সংসদীয় ইতিহাসে একটি অনন্য নজির সৃষ্টি হলো। সাধারণত সরকারের আর্থিক আয়-ব্যয়ের হিসাব সম্বলিত বাজেট দিয়ে থাকেন অর্থমন্ত্রী। এর আগে কখনোই অর্থমন্ত্রীর ছাড়া অন্য কাউকে বাজেট দিতে দেখা যায়নি।

এবার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের অসুস্থতার কারণে জাতীয় সংসদে তার পক্ষে বাজেটের সিংহভাগই উত্থাপন করেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা।

সংসদীয় ইতিহাসে প্রধানমন্ত্রীর বাজেট উপস্থাপনায় অংশগ্রহণের ঘটনা এই প্রথম। বৃহস্পতিবার (১৩ জুন) বিকেল ৪টা ১০ মিনিট থেকে ৪টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত মোট আধা ঘণ্টা অবশিষ্ট বাজেট বক্তব্য শেষ করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা দীর্ঘক্ষণ টেবিল চাপড়ে প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান। তবে হাসপাতাল থেকে সরাসরি সংসদে এসে প্রচণ্ড অসুস্থ অবস্থায়ই প্রথম এক ঘণ্টা বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। এ সময় স্পিকারের পরনে ছিল হলুদ শাড়ি। বাজেট পেশ উপলক্ষে অধিবেশন কক্ষ ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। সংসদ গ্যালারি থেকে ভিআইপি লাউঞ্চ সবখানেই ছিল উপচে পড়া ভিড়। বিকেল ৩টা ২৫ মিনিটে সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে নিজের জীবনের প্রথম বাজেট প্রস্তাবনা পড়তে শুরু করেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। ‘সমৃদ্ধির সোপানে বাংলাদেশ, সময় এখন আমাদের’ এই শিরোনামে পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব উত্থাপন শুরু করেন তিনি।

তবে অসুস্থতার কারণে ঠিকমতো বাজেট বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারছিলেন না অর্থমন্ত্রী। পাশ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং 0সাবেক কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী তাকে বার বার সহযোগিতা করছিলেন। কিন্তু বিকেল ৪টার দিকে একটু বেশিই অসুস্থ হয়ে পড়েন অর্থমন্ত্রী। তিনি চোখে ওষুধ দেওয়ার জন্য স্পিকারের কাছে পাঁচ/সাত মিনিট সময় চান। ওই সময়ে উপস্থিত কয়েকজন চিকিৎসক তার শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করেন। কিন্তু চোখে ওষুধ দেওয়ার পরও শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় বাকি বাজেট বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অনুরোধ করেন অর্থমন্ত্রী।

এতে অধিবেশনের চিত্রই পাল্টে যায়। সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাকি বাজেট উপস্থাপনের প্রস্তাবকে পূর্ণ সমর্থন জানান। এ সময় প্রধানমন্ত্রী দাঁড়িয়ে প্রস্তাবিত বাজেটের বাকি অংশটুকু উপস্থাপনের জন্য স্পিকারের অনুমতি চান। স্পিকার অনুমতি দিয়ে বলেন, ‘আপনি দাঁড়িয়ে বা বসে বাজেট উপস্থাপন করতে পারেন।’

বাজেট উপস্থাপনের জন্য ফ্লোর নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের অর্থমন্ত্রী খুবই অসুস্থ। তার চোখে অপারেশন হয়েছে। ১৫ মিনিট পর পর তার চোখে ড্রপ দিতে হয়। আমারও চোখে অপারেশন হয়েছে, ঠাণ্ডা লেগেছে। কথা বলতে গেলে কাশি আসে। এটাই হচ্ছে আমাদের দুর্ভাগ্য। তারপরও আপনি (স্পিকার) অনুমতি দিলে বাজেটের বাকিটা আমি উপস্থাপন করব।’

এ সময় প্রধানমন্ত্রী বাজেট উপস্থাপন শুরু করলে টেবিল চাপড়ে তাকে অভিনন্দন জানান সংসদ সদস্যরা।

তবে বাজেট বক্তৃতার বইয়ের অনেকাংশেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়ে কিছু বক্তব্য রয়েছে। সেসব অংশ পড়ার সময় প্রধানমন্ত্রী হেসে স্পিকারকে বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, এটি আমার বক্তব্য নয়, এটি হচ্ছে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য। বাজেট বক্তৃতায় যেখানে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানানো হয়েছে, সেটি আমি পড়ব কি না?’ জবাবে স্পিকার বাজেট বক্তৃতায় যেভাবে রয়েছে সেভাবেই উপস্থাপনের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানান। প্রধানমন্ত্রী বাজেট উপস্থাপন শেষ করলে স্পিকার বলেন, বাজেটের অপঠিত অংশগুলো পঠিত বলে গণ্য করা হলো।

বাজেট বক্তব্য শেষে প্রধানমন্ত্রী ব্যাগ থেকে ওষুধ বের করে নিজের চোখে নিজেই ড্রপ দেন। সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য, সিনিয়র নেতা থেকে শুরু করে বিরোধী দলের নেতারাও প্রধানমন্ত্রীর আসনের সামনে এসে তার এই দৃঢ়তার ভূয়সী প্রশংসা করেন।

উৎসব মুখর পরিবেশ
বাজেট অধিবেশন উপলক্ষে রীতিমতো উৎসব মুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয় জাতীয় সংসদে। অতীতের মতো কোনো রাজনৈতিক দলের বর্জন নেই। বরং নিকট ইতিহাসের মধ্যে এবারই সরকার ও বিরোধী দল মিলে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে দেশের ৪৮তম বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। শুধু অধিবেশনই নয়, দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আকারের এই বাজেট উপস্থাপন প্রত্যক্ষ করতে ভিভিআইপি, ভিআইপি ও দর্শক গ্যালারি সব জায়গাই ছিল কানায় কানায় পরিপূর্ণ।

দেশের ৪৮তম বাজেট পেশ উপলক্ষে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের সরব উপস্থিতি ছিল সংসদ অধিবেশনে। উৎসব মুখর পরিবেশে ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে। এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়।

শুরুতেই অর্থমন্ত্রী নিজের অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে পুরো সময় না দাঁড়িয়ে মাঝে মধ্যে বসে বাজেট উপস্থাপন করার অনুমতি চান স্পিকারের কাছে। স্পিকার তাকে অনুমতি দিলে শুরুতেই অর্থমন্ত্রীর অনুরোধে বাংলাদেশ শীর্ষক একটি দীর্ঘ প্রমাণ্যচিত্র তুলে ধরা হয়। প্রামাণ্যচিত্রে পাকিস্তান আমলে বাঙালি জাতির ওপর বৈষম্য, শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, দীর্ঘ নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা অর্জন, পরবর্তী স্বৈরশাসকদের দুঃশাসন শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে টানা তিন মেয়াদে দেশের অভূতপূর্ব উন্নয়ন-অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির সোপানে অগ্রযাত্রার চিত্র তুলে ধরা হয়।

এদিকে বাজেট বক্তৃতার আগে সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রতি বছর বাজেট উত্থাপনের আগে রেওয়াজ অনুযায়ী এই বৈঠকটি সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত হয়। মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদন পাওয়ার পর বাজেট বিলে স্বাক্ষর করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।

উৎসব মুখর সংসদে বাজেট বক্তৃতা শুনতে আসেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। সংসদে নিজ কক্ষে বসে বাজেট উপস্থাপন প্রত্যক্ষ করেন তিনি। এর আগে রাষ্ট্রপতিকে সংসদ ভবনে স্বাগত জানান সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ছাড়াও প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান, প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা জেনারেল (অব.) তারেক সিদ্দিকী,পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চোধুরী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা, মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব নজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর কন্যা সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুল, কূটনীতিক, সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বাজেট বক্তৃতা দেখেন।

pm
অসুস্থ থাকায় অর্থমন্ত্রীর হাত ধরে রাখেন একজন (বায়ে), ডানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ছবি: সংগৃহীত

 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কালো সুটকেস হাতে বেলা পৌনে ৩টায় বাজেট অধিবেশনে প্রবেশ করেন অর্থমন্ত্রী। মঙ্গলবার হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। বৃহস্পতিবার হাসপাতাল থেকে সরাসরি সংসদ ভবনে আসেন অর্থমন্ত্রী। তারপরও তার চেহারায় ছিল উচ্ছ্বাস। বাজেট বক্তৃতার মাঝে মাঝে সরকারি দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়ে অর্থমন্ত্রীকে উৎসাহ যোগান।

কঠোর নিরাপত্তা
বাজেট পেশ উপলক্ষে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় নেওয়া হয় বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বৈধ পাস ছাড়া কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি সংসদ ভবন এলাকায়। এমনকি দর্শক গ্যালারিতে পাস ইস্যুতেও ছিল কড়াকড়ি। র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)-পুলিশসহ গোয়েন্দা সংস্থার বিপুল সংখ্যক সদস্য পুরো ভবনে নিরাপত্তার ঘেরাটোপ গড়ে তোলেন। বাজেট বক্তৃতার পরে আমন্ত্রিত অতিথিরা যাতে নির্বিঘ্নে বের হতে পারেন সেজন্য সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার পিজিয়ন হলের গেটটিও খোলা রাখা হয়। আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থাও করা হয় আলাদাভাবে।

অর্থ বিল উত্থাপন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাজেট বক্তৃতা শেষ হলে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল দাঁড়িয়ে অর্থ বিল- ২০১৯ সংসদে উত্থাপন করেন। সরকারের আর্থিক প্রস্তাবগুলো কার্যকর এবং কিছু আইন সংশোধনের লক্ষ্যে বিলটি উত্থাপন করা হয়। সংসদের কার্যউপদেষ্টা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিলটি আগামী ৩০ জুন পাস হবে। এর আগে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সরকার ও বিরোধী দলীয় সদস্য ৪৫ ঘণ্টা আলোচনা করবেন।

আপনার মতামত লিখুন :