অর্থবিলে থাকছে যেসব পরিবর্তন

মাহফুজুল ইসলাম, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

জাতীয় সংসদে রোববার (৩০ জুন) পাস হচ্ছে ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট। শনিবার (২৯ জুন) সংসদে উত্থাপন করা হবে অর্থবিল। নতুন অর্থবছরের বাজেটে বেশকিছু পরিবর্তন আসছে। এই পরিবর্তনগুলোর মধ্যে রয়েছে-আগাম কর, সঞ্চয়পত্রে বর্ধিত উৎসে কর ও মূলধনী যন্ত্রে অগ্রিম কর প্রত্যাহার।

পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানির রিটেইন আর্নিংস ও রিজার্ভের উপর করও বাদ যাচ্ছে। বিদ্যুৎ সংযোগে টিআইএন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকছে না। আমদানির উপর পাঁচ শতাংশ গণ হারে কর প্রত্যাহার হতে পারে। ই-কমার্সের ভ্যাট প্রত্যাহার হতে পারে।

এছাড়াও তেল, চিনি, গুঁড়া দুধসহ ভোক্তাদের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য হিসাবে বিবেচিত সব দ্রব্যে ভ্যাট কমানো বা প্রত্যাহার হতে পারে।

প্রত্যাহার হচ্ছে আগাম কর: মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট আইনের আওতায় আগাম কর (আগাম ভ্যাট)আদায়ে ছাড়া দেওয়া হচ্ছে। মূলধন যন্ত্রপাতি আমদানিসহ বেশ কিছু খাতে আমদানিপর্যায়ে আগাম কর দিতে হবে না। শনিবার বাজেটের অর্থবিল পাসের সময় এটি সংশোধন করা হতে পারে।

অর্থমন্ত্রী অসুস্থ্য থাকলে প্রধানমন্ত্রী অর্থবিল অনুমোদন ও পাসের জন্য উপস্থাপন করবেন।

নতুন ভ্যাট আইন: নতুন ভ্যাট আইনে এবার অগ্রিম ব্যবসায় ভ্যাটের (এটিভি) পরিবর্তে পাঁচ শতাংশ আগাম কর (এটি) বসানো হয়েছে। অর্থাৎ মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে ঢালাওভাবে পাঁচ শতাংশ অগ্রিম কর দিতে হবে।

এতে দেখা গেছে, প্রায় সাড়ে ছয় হাজার পণ্যে এ আগাম কর বসেছে। ভ্যাট রিটার্ন দিয়ে এই আগাম করের টাকা ফেরত নিতে হবে। এই টাকা ফেরত পাওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে ব্যাংকের সুদ গুনতে হবে ঐ ব্যবসায়ীকে। ফলে আমদানি পর্যায়ে এসব যন্ত্রপাতি ও পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়বে ভোক্তাদের উপর। বিষয়টি বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে বাজেট পাসের সময় তা পরিবর্তন করা হচ্ছে।

বাজেট ঘোষণার পর থেকেই বিভিন্ন শ্রেণীর ব্যবসায়ীরা আগাম কর নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছেন। তারা জানিয়েছেন, এতে পণ্যে বা সেবার মূল্য বাড়বে।

সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, বন্ড প্রতিষ্ঠানসহ বেশকিছু প্রতিষ্ঠানের পণ্যে আমদানির ক্ষেত্রে ৩০ জুন পর্যন্ত আমদানি পর্যায়ে মূসক বা ভ্যাট আইনের আওতায় আগাম কর কাটা স্থগিত করা হয়েছে। এটির মেয়াদও বাড়িয়ে দেওয়া হতে পারে।

সঞ্চয়পত্রে বর্ধিত উৎসে কর প্রত্যাহার হচ্ছে: প্রস্তাবিত বাজেটে সবচেয়ে সমালোচিত বিষয় হলো, মধ্যবিত্তের ভরসাস্থল সঞ্চয়পত্রে বর্ধিত উৎসে কর ধার্য। ২০১৯-২০অর্থবছরের বাজেটে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের মুনাফার উপর উৎসে কর পাঁচ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্ধিত এই কর আরোপের প্রস্তাব পাস হলে সমাজের মধ্যবিত্ত, অবসরভোগী ও ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের আয়ের উপর সরাসরি আঘাত আসবে। এটি নিয়ে সংসদেও সমালোচনা হয়েছে। তাই সরকার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার উপর বর্ধিত উৎসে কর প্রত্যাহার করতে যাচ্ছে।

তবে এ নিয়ে এখনো দুটি চিন্তা রয়েছে। এর একটি হলো, বাজারে প্রচলিত সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের উপর থেকে বর্ধিত কর প্রত্যাহার করা হবে। অন্যটি হলো, শুধু পরিবারভিত্তিক সঞ্চয়পত্র ও পেনশনার সঞ্চয়পত্রের উপর তা প্রত্যাহার করা হবে। এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত গড়াতে পারে। অবশ্য সব বিষয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বোনাস শেয়ার ও রিজার্ভের উপর কর প্রত্যাহার: বাজেটে পুঁজিবাজার বিকাশেএকগুচ্ছ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। তবে সব কিছু ছাপিয়ে আলোচিত ও সমালোচিতহয়েছে তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের চেয়ে রিটেইন আর্নিংস ও রিজার্ভ ৫০ শতাংশের বেশি হলে ১৫ শতাংশ কর ধার্য করার বিষয়টি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশঙ্কা করছেন, এই কর বহাল হলে কোম্পানির পুঁজি গঠনের পথ রুদ্ধ হবে। রিজার্ভ মূলত ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বা ব্যবসা সম্প্রসারণে ব্যবহার করে কোম্পানি। এই কর থাকলে ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসতে নিরুৎসাহিত হবে। তাই এটি পরিবর্তন করা হচ্ছে। প্রস্তাবিত বাজেটে স্টক ডিভিডেন্ডের পরিবর্তে ক্যাশ বা নগদ ডিভিডেন্ড প্রদানকে উৎসাহিত করতে কোনো কোম্পানি স্টক ডিভিডেন্ড প্রদান করলে এ লভ্যাংশের উপর ১৫ শতাংশ করারোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ সংযোগে টিআইএন: বিদ্যুতের নতুন সংযোগ নিতে ও পুরনো গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিল দিতে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়েছে ২০১৯-২০ সালের বাজেটে। এর আগে বিদ্যুতের সংযোগ পেতে আবেদনের সঙ্গে আবেদনকারীর দুই কপি ছবি, জাতীয়পরিচয়পত্র বা পাসপোর্টের ফটোকপি, জমির দলিল বা লিজের ফটোকপি, ১০ তলার বেশি হলেঅগ্নিনির্বাপণ সনদ, সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার মধ্যে হলে ভবন নির্মাণের বৈধ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ফটোকপিএবং গ্রাহকের দুই কিলোওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ লোড হলে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সনদ জমা দিতে হতো।

প্রস্তাবিত বাজেটেটিআইএন বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন স্বয়ং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুলহামিদ। গত সোমবার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালকে পাঠানো এক চিঠিতে (ডিও লেটার) তিনি এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনাকরার কথা বলেছেন।

ই-কমার্সের ভ্যাট প্রত্যাহার:

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (ফেসবুক, টুইটার ইত্যাদির মাধ্যমে ব্যবসা) ও ভার্চুয়াল বিজনেস বা অনলাইনে পণ্যবেচাকেনাসহ বেশ কিছু খাতে সাড়ে সাত শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। এ ভ্যাট হার কমানো হতে পারে।

সিমেন্ট ও রডে অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহার: বাজেটে সিমেন্টের কাঁচামাল আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট ১৫ শতাংশ ধরা হয়েছে। পাশাপাশি অগ্রিম আয়কর (এটি) ধরা হয়েছে অতিরিক্ত পাঁচ শতাংশ। এর ফলে এখন এ খাতে মোট ২০ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে। ভ্যাট ও অগ্রিম কর আরোপ করার কারণে সিমেন্টের এক টন কাঁচামাল আমদানিতে খরচ বাড়বে ৮৫০ টাকা। এক টনে ২০ ব্যাগ সিমেন্ট হয়। সে হিসাবে প্রতিব্যাগ সিমেন্টে দাম ৪২ টাকা বেড়ে যাবে।

বাজেটে রড শিল্পের ওপর ৬৫০ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। কাঁচামালে আগাম কর আরোপ ও অগ্রিম আয়করের প্রভাবে টন প্রতি রডের দাম বাড়বে প্রায় ১১ হাজার টাকা। সিমেন্ট ও রডের দামবাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়বে সরকারের উন্নয়নমূলক মেগা প্রকল্পে ও আবাসন খাতে। মধ্যবিত্তদেরও গৃহনির্মাণ খরচবাড়বে। এ দুটির নেতিবাচক প্রভাব এবং ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে শেষ পর্যন্ত অগ্রিম আয়কর বা এটি তুলে দেওয়াহচ্ছে।

এদিকে তেল, চিনি, গুঁড়ো দুধসহ ভোক্তাদের জন্য নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য হিসাবে বিবেচিত সব দ্রব্য ভ্যাটের আওতামুক্তরাখার দাবি জানিয়েছে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ক্যাব। ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে ভ্যাট আইন কার্যকরহলে ভোক্তারা যাতে একই পণ্যে একাধিকবার ট্যাক্স দিতে বাধ্য না হন সেদিকেও লক্ষ রাখার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

জানা গেছে,সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বিষয়ে কথা বলতে পারেন। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কথা মাথায় রেখেতেল, চিনি, গুঁড়ো দুধের ওপর ভ্যাট কমানো বা প্রত্যাহার হতে পারে।

পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটে যেসব বিষয় সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও সমালোচিত হয়েছে সেগুলোতে পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। আগের কয়েকটি অর্থবছরের ধারাবাহিকতায় এবারও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাজেট পাসের আগে আলোচিত, সমালোচিত বিষয়ে পরিবর্তন আনবেন।

অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআর কর্মকর্তারা আশা করছেন, এসব পরিবর্তনে মধ্যবিত্ত ও ব্যবসায়ীরা খুশি হবেন। গত ১৩ জুন২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ও অর্থবিল-২০১৯ জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হয়। এরপর প্রস্তাবিত বাজেটের বেশকিছু বিষয় নিয়ে সংসদের ভেতরে ও বাইরে আলোচনা-সমালোচনাশুরু হয়।

আপনার মতামত লিখুন :