৪ মাসে ৪ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল, স্থগিত ৩০২

মাহফুজুল ইসলাম, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

৩০৬টি প্রতিষ্ঠানের বন্ডেড লাইসেন্সের অপব্যবহারসহ নানা অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা। চলতি বছরের (মার্চ মাস থেকে জুন পর‌্যন্ত) ৪ মাসে প্রতিষ্ঠানগুলোতে অভিযান চালিয়ে এর প্রমাণ মিলেছে।

এর মধ্যে ৪ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল ও ২৮১টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স সাসপেন্ড ও বিআইএন লক করা হয়েছে। অর্থাৎ এসব প্রতিষ্ঠান যাতে পণ্য আমদানি করতে না পারে, সেজন্য তাদের ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন) লক করা হয়েছে। এছাড়াও ২২টি প্রতিষ্ঠানের সাসপেন্ড কার্যক্রম চলমান রয়েছে। কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্র মতে, কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকার অধীনে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত মোট ৬ হাজার ৮১৩টি প্রতিষ্ঠানের বন্ড লাইসেন্স রয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৯৮৩টি নিষ্ক্রিয় আর সক্রিয় রয়েছে ৩ হাজার ৮৩০ প্রতিষ্ঠানের বন্ডেড ব্যবহার। তার মধ্যে ৩০৬টির বন্ডেড লাইসেন্সের অপব্যবহারের অভিযোগ পেয়েছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।

অভিযোগ ভিত্তিতে কমিশনের কাস্টম প্রিভেন্টভ টিম পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকা ১০৫ অভিযান পরিচালনা করেছে। এ সময় ৪৭টি যানবাহন আটক, ৫টি গুদাম সিলগালা এবং ৩৭টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। আর এ অভিযানে সরকারের অন্তত ১৫৩ কোটি ৮৩ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি খুঁজে পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকার রাজস্ব আদায়ও হয়েছে।

লাইসেন্স স্থগিত করা উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে-থ্রিএমএস টেক্স (বিড), অ্যাকটিভ সোয়েটার লিমিটেড, আলম ইন্ডাস্ট্রিজ, আনারকলি নিটওয়্যার লিমিটেড, আরাফ নিটওয়্যার, বি. ব্রাদার্স গার্মেন্টস, বিআর নিটিং মিলস, বাংলাদেশ ড্রেসেস লিমিটেড, বন অ্যাসোসিয়েটস, বাংলাদেশ কাওয়া ইন্ডাস্ট্রিয়াল কো. লিমিটেড, থ্রেডস লিমিটেড, বেঙ্গল জিনস লিমিটেড, ব্লুটেক্স নিটওয়্যার লিমিটেড, বডি স্ট্রিস বাংলাদেশ লিমিটেড, ব্রাইট পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, সিটাস ইন্টারন্যাশনাল বিডি লিমিটেড, চৈতি ক্লাসিক স্পোর্টসওয়্যার লিমিটেড, চিটাগং ফ্যাশন প্যাকেজিং অ্যান্ড প্রিন্টিং লিমিটেড, চুন জি নিট লিমিটেড, কমান্ডো ফ্যাশন লিমিটেড, দারদা নিটওয়্যার লিমিটেড, ঢাকা কার্টুন অ্যান্ড প্রিন্টিং ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড, ডায়মন্ড প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেড, দোতি ফ্যাশন লিমিটেড, ইস্ট এশিয়া অ্যাকসেসরিজ লিমিটেড, ইস্টার্ন পেপার কনভারটিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেড, ইজি অ্যাকসেসরিজ কোম্পানি লিমিটেড, অ্যাপকট ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, এভার ব্রাইট পলি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, ইভিন্স অ্যাকসেসরিজ লিমিটেড, এক্সএনসিভ ফ্যাশন লিমিটেড, এক্সপোর্ট এইড প্রাইভেট লিমিটেড (ইউনিট-২), ফা অ্যাপারেলস লিমিটেড, ফিডাস অ্যাপারেলস লিমিটেড, ফিন ফ্যাশন লিমিটেড ও ফরচুন অ্যাকসেসরিজ লিমিটেড।

সার্বিক বিষয়ে কাস্টম বন্ড কমিশনারেট ঢাকার সহকারী কমিশনার আল আমিন বার্তাটোয়েন্টিফোর.কমকে বলেন, ‘চেয়ারম্যান স্যার (জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের-এনবিআর চেয়ারম্যান) একটি গতিশীল ও শক্তিশালী কাস্টমস বন্ড গঠনের দায়িত্ব দিয়েছেন কমিশনার এসএম হুমায়ুন কবীরকে স্যারকে। তিনি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তার নেতৃত্বে বন্ড ব্যবস্থাপনায় যাতে কোনো অনিয়ম না হয় সে জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনিয়ম খুঁজে বের করার জন্য ১০টি টিম গঠন করা হয়েছে। টিমগুলো রাজধানীর পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় অভিযান পরিচালনা করছে।’

আর এসব অভিযানে ৩ শতাধিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বন্ডেড অপব্যবহারে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এর মধ্যে ৪ প্রতিষ্ঠানের বন্ডেড লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। ২২টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স সাসপেন্ড কার্যক্রম চলছে। এছাড়াও ২৮১টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স সাসপেন্ড ও বিআইএন লক করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

জানা গেছে, কাগজে-কলমে কোম্পানিগুলোর অস্তিত্ব থাকলেও বাস্তবে বেশির ভাগেরই কারখানা নেই। অথচ এসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে বন্ড সুবিধার আওতায় বিনা শুল্কে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করে আসছে।

কাঁচামালের মধ্যে সুতা, কাপড়, কাগজ, এক্সেসরিজ, পিপি দানা খোলা বাজারে বিক্রি করাই হচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠানের মূল কাজ। এক শ্রেণির অসাধু কাস্টমস কর্মকর্তার সহায়তায় চক্রটি ফ্রি স্টাইলে দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর নির্ধারিত বিভিন্ন স্পটে বন্ডের পণ্য দেদার বিক্রি করে আসছে। এ কারণে অসম প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে দেশীয় বস্ত্র শিল্প ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে।

এদিকে ঢাকা কাস্টমস বন্ড লাইসেন্স চূড়ান্তভাবে বাতিলের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের মালিকদের ব্যাংক হিসাব জব্দের মাধ্যমে পাওনা আদায়ের উদ্যোগ নিচ্ছে। শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির পর যে পরিমাণ গার্মেন্টস পণ্য রফতানি করার কথা, তা যারা করেননি তাদের কাছ থেকে সমপরিমাণ পণ্যের ডিউটি আদায় করার প্রক্রিয়া চলছে।

সম্প্রতি এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে এসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে বন্ড সুবিধায় শূন্য শুল্কে কাঁচামাল আমদানি করলেও নিজস্ব কারখানা নেই উল্লেখ্য করে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

অথচ শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাপড়সহ বিভিন্ন ক্যাটাগরির পণ্য এনে পুরান ঢাকার ইসলামপুর, নয়াবাজার, বাবুবাজার, মতিঝিলের আরামবাগে বিক্রি করে ব্যাপক বাণিজ্য করে আসছিলেন অনেকে। ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন স্থানীয় বস্ত্রশিল্পের উদ্যোক্তারা।

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঢাকা বন্ড কমিশনারেটের আওতায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর ৭০ ভাগের বেশি চোরা কারবারীর সঙ্গে জড়িত। মূলত দুইভাবে বন্ডের পণ্য খোলাবাজারে বিক্রি করা হচ্ছে।

প্রথমত, অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে বন্ড লাইসেন্স খুলে পণ্য আমদানি করে। দ্বিতীয়ত, ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কাঁচামাল শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করে। আমদানি প্রাপ্যতা নির্ধারণ পদ্ধতির দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই এ কাজটি করে অসাধু ব্যবসায়ীরা।

অনেক প্রতিষ্ঠানের রফতানি আদেশ যৎসামান্য থাকলেও কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে শুধু মেশিনের উৎপাদন ক্ষমতা অনুযায়ী প্রাপ্যতা নির্ধারণ করিয়ে নিচ্ছে। এভাবে আমদানি করা অতিরিক্ত কাঁচামাল তারা খোলাবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে।

এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই কালোবাজারে শুল্কমুক্ত পণ্য বিক্রির সঙ্গে জড়িত। এ চক্রটি বন্ডের কাপড় চট্টগ্রাম কাস্টমস থেকে খালাস হয়ে ঢাকার আশপাশের পাইকারি বাজারে নিয়ে যায়। রাতের আঁধারে নারায়ণগঞ্জের সানারপাড়, চিটাগাং রোড, কাঁচপুর এলাকায় কাপড়বোঝাই গাড়ি আনলোড হয়।

এজন্য চিটাগাং রোডের অনেক বাসা-বাড়িতে অস্থায়ী গোডাউনও গড়ে উঠেছে। এসব গোপন গোডাউন থেকে সুবিধা মতো সময়ে কাপড় হাতবদল হয়। নারায়ণগঞ্জের টানবাজারে সুতা, পুরান ঢাকার ইসলামপুরে বন্ডের কাপড়, নয়াবাজারে কাগজ ও উর্দু রোডে পিপি দানা বিক্রি হয়।

আরও পড়ুন:

বন্ডেড ওয়্যার হাউজের অবৈধ ব্যবহারকারীদের ধরিয়ে দিন: সালমান

বাতিল হচ্ছে চেক পয়েন্ট সিস্টেমসের বন্ড লাইসেন্স

চেক পয়েন্ট সিস্টেমসের ৪০ কোটি কর ফাঁকি

বন্ড অপব্যবহারকারীর মুখোশ উন্মোচন করুন: এনবিআর চেয়ারম্যান

আপনার মতামত লিখুন :