loader
Foto

পিএইচপি - কেএসআরএম জমি যুদ্ধ, কে জিতল?

দুই শিল্প গ্রুপই বছরে প্রায় কয়েক হাজার কোটি টাকা লেনদেনের ব্যবসা করেন। দুই শিল্প গ্রুপের চেয়ারম্যানের ধর্মপরায়ণতা, মানবিকতা, সামাজিক মূল্যবোধ ও ব্যবসার নৈতিকতার কথা কমবেশি ব্যবসায়ীরা জানেন।

দুই জনের দান-খয়রাতের কাহিনী মানুষের মুখে মুখে। অসংখ্য মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করে দিয়েছেন দুইজনই।

কিন্তু গত মাসে শিল্পকারখানার পাশে বাংলাদেশ রেলওয়ের সরকারি মালিকানাধীন লিজ নেয়া মাত্র কয়েক হাজার টাকার জমি নিয়ে যে লঙ্কা-কাণ্ড ঘটে গেল, সেটা নিয়ে শুধু চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা নন, সরকারের নীতি-নির্ধারক মহলে চিন্তিত হয়ে পড়ে। ভাবনায় ও দ্বন্দ্বে পড়ে যায় সকলে।

দুই শিল্প মালিকের মধ্যে সামান্য জায়গা নিয়ে কেন এই বিরোধ? এর প্রকৃত মালিক আসলে কে? কোন মালিক সঠিক পথে এগুচ্ছেন? সামান্য এ জায়গা নিয়েই বা কেন এত হাকডাক?

এদের একজন হলেন- দেশের অন্যতম শিল্প প্রতিষ্ঠান পিএইচপি ফ্যামিলির সুফি মিজানুর রহমান, আরেকজন হলেন নামকরা রড উৎপাদন ও বিদেশগামী জাহাজ ব্যবসার মালিক কেএসআরএম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান।

বয়সে বড় সুফি মিজানুর রহমান। ব্যবসার পরিধিও তার অনেক, বছরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনভাতা ছাড়াও বোনাস দেন ১৪টি। কেএসআরএমও কম যায় না। মোহাম্মদ শাহজাহানও আর্থিকভাবে বেশ স্বচ্ছল। মোহাম্মদ শাহজাহান অর্ন্তমুখি স্বভাবের, সাধারণের সঙ্গে খুবই কম চলাফেরা করেন। বিপরীতে সুফি মিজানুর রহমান ধর্ম-কর্ম আর সামাজিকতা নিয়ে সাধারণের সঙ্গে চলতে-থাকতে ভালোবাসেন।

এরকম শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের মালিক হয়েও কয়েক হাজার টাকার লিজের সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের নেপথ্যের কাহিনী খুবই করুণ ও পীড়াদায়ক। তাদের দুজনের ঘনিষ্ঠদের পক্ষ থেকে সমঝোতার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল নানাভাবে, নানা উপায়ে।

কিন্তু দু'পক্ষই অনড় ছিল কিছু শর্ত জুড়ে দিয়ে। শেষ পর্যন্ত সমঝোতা হয়নি। প্রশাসনিকভাবেই বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়েছে ৪৮ দিন পর। এই ৪৮ দিনে মিডিয়াজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।

মিডিয়ার এই উত্তাপের রেশ সাধারণের মধ্যেও সংক্রমিত হয়। বলাবলি হচ্ছিলো নানা কথা ব্যবসায়ীদের মধ্যেও। একটি বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যানতো বলেই বসলেন- এতো ছোটোখাটো ইস্যূ নিয়ে কেন রশি টানাটানি, এতে তো চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদেরই সুনাম প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। আরেকজন শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী জানতে চাইলেন, প্রকৃত ঘটনা কি। কোন পক্ষ বেদখল করেছে। মাঝারি মানের এক ব্যবসায়ী বলে বসলেন- ১০ কোটি টাকা খরচ করতে পারবেন, কিন্তু আপোস করবেন না শাহজাহান সাহেব। আর ব্যবসার কথা চিন্তা করে সুফি মিজান সহজে আপোস রফা করে ফেলবেন। এতো গেল শিল্পপতি-ব্যবসায়ীদের মনোভাব।

সরকারের নীতিনির্ধারকদের ঘনিষ্ঠ এক প্রশাসনিক কর্মকর্তা সরাসরি জানতে চাইলেন, প্রকৃত ঘটনা আসলে কি? অর্থাৎ সীতাকুন্ডের বাড়বকুন্ড এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম রেললাইনের পাশে রেলওয়ের লিজ নেয়া জমিতে কেএসআরএম কর্তৃপক্ষ অবৈধভাবে কাটা তারের বেড়া দিয়ে পিএইচপির জমি দখলে নেয়ার বিষয়টি এতো বিস্তৃত রূপ নেয়।

৬০ শতক ও এক দশমিক ৬ একর জায়গা ২০০৫ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে রেলওয়ে থেকে লিজ নেয় পিএইচপি- এমন দাবি তাদের। ২০১৭ সালে ওই জায়গা লিজ নেয় রেল থেকে কেএসআরএম- এমন পাল্টা দাবিও তাদের।

দুই পক্ষের এমন অনড় দাবিতে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী নেতা, পুলিশ প্রশাসন, গোয়েন্দা কর্মকর্তা, সংবাদকর্মী থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ পর্যন্ত দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে যান- একই সঙ্গে চাপ অনুভব করতে থাকেন। এরকম নাটকীয় ঘটনা এর আগে কখনও ঘটেনি, দেখেওনি কেউ।

যে এলাকায় রেলের জমি নিয়ে দুই শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকদের মধ্যে এতো টানাপোড়েন, সেখানে উভয় প্রতিষ্ঠানের ভারী শিল্পের কারখানা রয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেললাইনের একপাশে পিএইচপি ফ্লোট গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজ, অপর প্রান্তে বিরল প্রজাতির হাজার হাজার গাছের বন রয়েছে। অর্থাৎ দুই পাশেই পিএইচপির স্থাপনা।

এর কিছু দূরেই কেএসআরএমের শিল্প প্রতিষ্ঠান। রেল লাইন অতিক্রম করে পিএইচপির ১৬০ একর বনে ঢোকার প্রবেশপথসহ কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে বন্ধ করে কেএসআরএম। যেদিন অর্থাৎ গত ২৯ মার্চ কেএসআরএম এই কাঁটা তারের বেড়া দেয়, তখন পিএইচপি ফ্যামিলির চেয়ারম্যান-পরিচালকদের সবাই ছিলেন ঢাকায় তাদের প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় ইউআইটিএস এর কনভোকেশনে। সেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে কোনো অনুষ্ঠানে মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে দেয়া হয় না। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার সুযোগটি গ্রহণ করে কেএসআরএম।

বিভিন্ন ফলজ ও বিলুপ্ত প্রজাতির গাছের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পিএইচপির কর্মচারীরা বাগানে যেতে পারছে না। বাগান আর গাছ রক্ষা করার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে উভয় পক্ষের সামাজিক মর্যাদার ইস্যুটি। মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধও তো আছেই। পণ্য বেচাকেনার বাজার বা শেয়ার দখল করার চাইতেও জমি দখলের এই যুদ্ধ অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তাদের কাছে। দেন-দরবারও চলতে থাকে উভয় পক্ষের। থানা, পুলিশ, সংবাদকর্মী, রাজনীতিবিদ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সরকারি নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বিভ্রান্ত হতে থাকে- আসলেই ঘটনা কি?

নানা তৎপরতা ও উদ্যোগ শেষে ৪৮ দিন পর রেলওয়ের কর্মকর্তা ও পুলিশের উপস্থিতিতে ৬০ শতক লিজের জমি থেকে কেএসআরএম কর্তৃপক্ষ অবৈধ কাঁটাতারের বেড়া তুলে নিতে বাধ্য হয়। কারণ রেল কর্তৃপক্ষই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয় যে, এই জায়গার মালিক ছিল পিএইচপি ফ্যামিলি। ওই জায়গার পাশে ১ দশমিক ৬ একর লিজের জায়গা নিয়ে এখনো বিরোধ। দুই পক্ষের দাবি এটা তাদের জায়গা। জায়গা-জমির মালিকানা সংক্রান্ত বিষয়টি প্রমাণ করতে হয় বৈধ কাগজপত্রের মাধ্যমে। আগামীতে বোঝা যাবে ১ দশমিক ৬ একর লিজ নেয়া জায়গাটি আসলেই কার ।

মাত্র ৬০ শতক লিজের জায়গা, যার লিজমূল্য মাত্র ২৫ হাজার টাকার মতো। এই সামান্য টাকার জমি দখলে নিয়ে যে উত্তেজনা তৈরি করেছে চট্টগ্রামের দুটি নামকরা শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সেটি খুবই হাস্যকর সাধারণের কাছে। কেউ কেউ ভাবতে পারে ভারত-পাকিস্তানের সীমান্ত বিরোধের মতোই বিশাল এক উত্তেজনাপূর্ণ ব্যাপার বুঝি। কিন্তু যখন কাঁটাতারের বেড়া সরিয়ে দখল করা জায়গা ছেড়ে দিতে হয়, তখন কি একটু লজ্জা হয় না কিংবা অনুশোচনা!

বছরে কেএসআরএমের ব্যবসায়িক লেনদেন কয়েক হাজার কোটি টাকা। তার মধ্যে সরকারকে রাজস্ব দেয় প্রতি বছর কয়েকশ কোটি টাকা। লাভের বিশাল অঙ্ক দান খয়রাত করেন কেএসআরএমের মালিক মোহাম্মদ শাহজাহান। তিনি ধর্মপ্রাণ ও দানবীর। ইসলাম এমন এক ধর্ম, যেখানে শান্তি ও মানবিকতার কথা বলে।

অন্যের জমিতে জোর করে কাঁটাতারের বেড়া দেয়ার ঘটনার পর মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, ধর্মের শিক্ষা আর শান্তির কথা তখন কি মনে ছিল না?

এরপর গত ১২ মে কয়েক হাজার মানুষকে ইফতার সামগ্রী বিতরণ করতে চেয়েছিলেন নিজের এলাকা সাতকানিয়ায়। সেখানে হুড়োহুড়ি আর ঠেলাঠেলিতে প্রাণ গেছে নয় জন নিরীহ মহিলার। সে মামলায় আসামি করা হয়েছে কেএসআরএমের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহানকে। তিনি এখন পলাতক বলে জানিয়েছেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা।

মজার ব্যাপার হলো- যেদিন এই অপ্রীতিকর ঘটনা সাতকানিয়ায় তার পরের দিন বাড়বকুণ্ডের অবৈধ দখল থেকে কাঁটাতারের বেড়া সরিয়ে নেয় মোহাম্মদ শাহজাহানের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা।

বিপদ যখন আসে তখন চারদিক থেকেই আসতে শুরু করে। এখানে ধর্মের শিক্ষা হলো ধৈর্য্য ধরা। জোর করে বেড়া না দিয়ে ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করলে কিংবা নিজেরা বসে সমঝোতা করলে কি ভালো হতো না? সময়, টাকা, আত্মমর্যাদা সবই তখন রক্ষা পেত।

Author: বিশেষ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম

অর্থনীতি

এ সম্পর্কিত আরও খবর

barta24.com is a digital news outlet

© 2018, Copyrights Barta24.com

Editor in Chief: Alamgir Hossain

Email: [email protected]

[email protected], [email protected]

+880 1707 082 000

8/1 New Eskaton Road, Gausnagar, Dhaka-1000, Bangladesh