আতঙ্কে বিনিয়োগকারীরা!

মাহফুজুল ইসলাম, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম, ঢাকা
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বিভিন্ন ইস্যুতে টানা সাড়ে সাত মাস ধরে চলা দরপতনের পর নতুন করে যোগ হয়েছে সরকারি করপোরেশনের উদ্বৃত্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে নেওয়ার সিদ্ধান্ত। এর ফলে আগামীতে পুঁজিবাজারে কী হবে? কোন দিকে যাবে পুঁজিবাজার? এসব নিয়ে আতঙ্কে রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাত ইস্যুতে চলমান দরপতনে এমনিতেই অস্বস্তিতে রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। আর তাতে বিনিয়োগকারীদের পুঁজি অর্থাৎ বাজার মূলধন কমেছে ৪৫ হাজার ২৭০ কোটি টাকা। তার সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে সরকারি করপোরেশনের উদ্বৃত্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে নেওয়ার সিদ্ধান্ত। ফলে অস্বস্তি আতঙ্কে পরিণত হয়েছে।

পুঁজিবাজারে সরকারি কোম্পানির শেয়ারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। দাম কমার আশঙ্কায় এরই মধ্যে বিভিন্ন বিনিয়োগকারী সরকারি শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছে। বিশেষ করে বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান গত তিন দিনে প্রচুর শেয়ার বিক্রি করেছে।

বিনিয়োগকারীরা বলছেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিশাল অংকের টাকা বিভিন্ন ব্যাংকে এফডিআর করা আছে। এখান থেকে বছরে সুদ বাবদ অনেক টাকা আয় হয়। আর এ তহবিল কোষাগারে তুলে নিলে এসব প্রতিষ্ঠানের আয় কমবে। তাদের মতে, শেয়ার বিক্রি আরও বাড়লে বাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়, এ তহবিল তুলে নিলে সরকারি কয়েকটি ব্যাংকও সমস্যায় পড়বে।

রূপালী ইনভেস্টমেন্টের বিনিয়োগকারী অরুণ কর্মকার বার্তাটোয়েন্টিফোর.কমকে বলেন, ‘পুঁজিবাজারে সবচেয়ে ভালো দু’টি কোম্পানির শেয়ার কিনেছি। একটি স্কয়ার ফার্মা অপরটি হলো গ্রামীণফোন। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই সে দু’টি কোম্পানির শেয়ারের দাম কমেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘শেষ চার মাসে গ্রামীণফোনের শেয়ারের দাম ১০০ টাকার বেশি কমেছে। ১ এপ্রিল এ কোম্পানির শেয়ারের দাম ছিল ৪৭১ টাকা। সেখান থেকে ১২৭ টাকা কমে ৪ সেপ্টেম্বর দাঁড়িয়েছে ২৮৯ দশমিক ৪ টাকায়। ধরুন, গ্রামীণফোনের শেয়ারের দাম কমার জন্য বিটিআরসির সঙ্গে বকেয়া পওনা নিয়ে চলা দ্বন্দ্বকে দায়ী করা যায়। কিন্তু স্কয়ার ফার্মার শেয়ারের দাম কমার পেছনে কোনো ‍যুক্তি আছে? এক মাসে কোম্পানির প্রতিটি শেয়ারের দাম কমেছে প্রায় ২০ টাকা করে। ফলে নতুন করে বিনিয়োগ করে বড় ধরনের পুঁজি হারানোর আতঙ্কে রয়েছেন অনেকে।’

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ বার্তাটোয়েন্টিফোর.কমকে বলেন, ‘সরকারের এ সিদ্ধান্তে পুঁজিবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এখানে দু’টি দিক রয়েছে, প্রথমত, বাজেট বাস্তবায়নে চাপ বাড়ছে। ফলে অর্থ সংকটে পড়েছে সরকার। সে কারণে এ তহবিল নেওয়ার চিন্তা করছে। তবে ভালো কাজে বিনিয়োগ করলে সমস্যা নেই। কিন্তু এ তহবিল দিয়ে প্রশাসনিক ব্যয় মেটানো হলে, তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। অন্যদিকে এ টাকা তুলে নিলে ব্যাংক চাপে পড়বে। কারণ ব্যাংকগুলো এ টাকা বিভিন্ন জায়গায় বিনিয়োগ করে রেখেছে। তাই তাদের সময় দিয়ে এগুলো তুলে নিতে হবে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য মতে, চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি থেকে থেমে থেমে চলা দরপতনে সোমবার (০৯ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত সাড়ে ২৫ লাখ বিনিয়োগাকারীর পুঁজি অর্থাৎ বাজার মূলধন কমেছে ৪৭ হাজার কোটি টাকা। ফলে বিনিয়োগকারীর পাশাপাশি দুই স্টক এক্সচেঞ্জ, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও সরকার অস্বস্তিতে রয়েছে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৯ সালের প্রথম ছয় মাসে মুদ্রানীতির ঘোষণাকে কেন্দ্র করে চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি থেকে পুঁজিবাজারে দরপতন শুরু হয়। এরপর অনৈতিক প্রাইভেট প্লেসমেন্ট, উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার বিক্রির হিড়িক এবং মন্দ কোম্পানির আইপিওর অনুমোদনকে কেন্দ্র করে জুন মাস পর্যন্ত পুঁজিবাজারে দরপতন চলে।

তারপর নতুন অর্থবছরের বাজেট ঘোষণাকে কেন্দ্র করে শুরু হয় পুঁজিবাজারে টালমাটাল অবস্থা, আর তার সঙ্গে যোগ হয় অর্থমন্ত্রীর বিরূপ মন্তব্য। এরপর বাজেট ঘোষণা হয়, কিন্তু প্রত্যাশা অনুসারে বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য প্রণোদনা না থাকায় চলতেই থাকে দরপতন। এগুলো কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই নতুন করে বকেয়া পাওনা আদায়ে শুরু হয় বিটিআরসি ও গ্রামীণফোনের প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব। তাতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বাজারে।

এর পরপরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোর উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে ‘জমা আইন ২০১৯’-এর খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়। খসড়ায় গত মে পর্যন্ত ৬৯টি প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত অর্থ দুই লাখ ১২ হাজার একশ’ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে আনার কথা বলা হয়েছে।

বাজারে তালিকাভুক্ত ৩৫৬টি কোম্পানির মধ্যে সরকারি কোম্পানি ২০টি। এর মধ্যে পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের ইস্টার্ন লুব্রিকেন্টস, মেঘনা পেট্রোলিয়াম এবং যমুনা অয়েল, পেট্রোবাংলার আওতাধীন তিত্যাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি এবং ঢাকা ইলেকট্রনিক সাপ্লাই কোম্পানি রয়েছে।

এছাড়া অন্যান্য খাতের যেসব কোম্পানি রয়েছে, সেগুলো হলো-রেইন উইক যজ্ঞেশ্বর, ন্যাশনাল টিউব, রূপালী ব্যাংক, ইস্টার্ন ক্যাবল, আইসিবি, বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল, উসমানিয়া গ্লাস, বাংলাদেশ সার্ভিস, এটলাস বাংলাদেশ, শ্যামপুর সুগার, জিলবাংলা সুগার এবং বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন :