চট্টগ্রাম বন্দর ‘তিন’ বছর ভুল পথে

চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম বন্দরের আগামীর বন্দর হিসেবে পরিচিত বে টার্মিনাল। নগরীর ইপিজেডের পেছন থেকে দক্ষিণ কাট্টলী রাসমনি ঘাট পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকায় সাগরের ভেতরের অংশে ২৩০০ একর ভূমিতে গড়ে উঠতে যাচ্ছে বে টার্মিনাল। দিন রাত ২৪ ঘন্টা নেভিগেশন সুবিধার সম্ভাবনার এই টার্মিনালের ভূমি বরাদ্দ প্রক্রিয়া ঘুরছে তিন বছর ধরে। ২০১৫ সালে ভূমি বন্দোবস্তের আবেদন করার পর এখন আবার তা অধিগ্রহণের আওতায় যাচ্ছে।

বন্দোবস্ত হিসেবে আবেদনের তিন বছর পর একই ভূমি বরাদ্দের জন্য আবার অধিগ্রহণে কেন যেতে হচ্ছে এ বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে বেরিয়ে আসে চট্টগ্রামের নতুন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াসের কথা।

দীর্ঘদিন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) হিসেবে কর্মরত থাকা মোহাম্মদ ইলিয়াস চট্টগ্রাম বন্দরের বে টার্মিনালের জন্য ভূমি বরাদ্দের জন্য আবেদন করা বন্দোবস্তের পরিবর্তে অধিগ্রহণের আওতায় আবেদন করার পরামর্শ দেন।

এবিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান কমডোর জুলফিকার আজিজ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের বে টার্মিনালের জন্য ৬৮ একর ভূমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে বরাদ্দ পাওয়া গেছে। কিন্তু আরো ৮২০ একর ভূমি বন্দোবস্তের মাধ্যমে বরাদ্দ পেতে আবেদন করা হয়েছিল। এখন এই ভূমিও অধিগ্রহণের আওতায় আবেদন করার পরামর্শ দিয়েছেন জেলা প্রশাসক। জেলা প্রশাসকের পরামর্শে আমরা আমাদের মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন চেয়েছিলাম, মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন দিয়েছে অধিগ্রহণের মাধ্যমে আবেদন করার জন্য।’

কিন্তু তিন বছর পর আবার প্রথম থেকে শুরু করতে কেন হলো জানতে চাইলে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস বলেন, বে টার্মিনালের এই জায়গাটি আগে অনেককে ইজারার মাধ্যমে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এছাড়া এসব জায়গা নিয়ে মামলাও রয়েছে। তাই ভূমি আইন অনুযায়ী এগুলো বন্দোবস্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। এজন্য বন্দোবস্তের পরিবর্তে অধিগ্রহণে গেলে দ্রুত ভূমির বরাদ্দ পাওয়া যাবে। এজন্য অধিগ্রহণের মাধ্যমে বরাদ্দ পেতে বন্দরকে বলেছিলাম।

এদিকে বন্দর সূত্রে জানা যায়, ইতিমধ্যে ভূমি অধিগ্রহণের জন্য নৌ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের প্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করেছে। জেলা প্রশাসন তা বরাদ্দের অনুমোদনের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। এখন ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে কেন্দ্রীয় ভূমি বরাদ্দ কমিটিতে বিষয়টি উত্থাপিত হবে।

জানা যায়, ২২ বছর আগে পতেঙ্গা থেকে দক্ষিণ কাট্টলী পর্যন্ত সাগরের উপকূলের খাসজমিগুলো প্রায় ৫০টি ব্লকে ভাগ করে জেলা প্রশাসন বরাদ্দ দিয়েছিল। ১৯৯৬-৯৭ সালের দিকে রেজিস্ট্রি দলিলের মাধ্যমে চিংড়ি চাষের জন্য ৯৯ বছরে মেয়াদে ইজারা হিসেবে বরাদ্দ দেয়া হয় এসব ভূমি। কথা হয় বরাদ্দপ্রাপ্তদের মধ্যে ১০ একর জায়গা বরাদ্দ পাওয়া মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলামের সাথে।

তিনি বলেন, ‘আমরা টাকা দিয়ে সরকারের কাছ থেকে ভূমি বরাদ্দ নিয়েছি। সরকার রেজিস্ট্রি দলিলের মাধ্যমে আমাদেরকে তা বরাদ্দ দিয়েছে। এখন এই জমি জেলা প্রশাসন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে কিভাবে বরাদ্দ দেবে? এক জমি কি দুই জায়গায় বরাদ্দ দেয়া যায়?’

তিনি আরো বলেন, ‘দেশের উন্নয়নে বন্দরকে বরাদ্দ দেয়া হলে আমাদের আপত্তি নাই। তবে বর্তমান মৌজামূল্যে আমাদেরকে ভূমির মূল্যবাবদ অর্থ বুঝিয়ে দেয়া হউক।‘

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হালিশহর ও দক্ষিণ কাট্টলী উপকূলে এধরনের প্রায় অর্ধশত লোককে এসব ভূমি বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। কাউকে পাঁচ একর আবার কাউকে ১০ একর করে ভূমি বরাদ্দ দেয়া হয়। পরবর্তীতে সাগরের ভেতরের এসব ব্লকেই গড়ে তোলা হয়েছিল বিভিন্ন ধরনের মাছের খামার।

এবিষয়ে কথা হয় ভূমি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ( অধিগ্রহন-১) মির্জা তারিক হিকমতের সঙ্গে। উদাহরন হিসেবে তিনি বলেন,‘ সরকারের কোনো একটি সংস্থার জন্য এক হাজার একর ভূমি প্রয়োজন। যদি এই এক হাজার ভূমির সবটা সরকারের খাস জমি হয় তাহলে তা বন্দোবস্ত প্রক্রিয়ায় বরাদ্দ নিতে হবে। আর যদি ৯৫০ একর জমি খাস ও ৫০ একর জমি ব্যাক্তি মালিকানাধীন, অথবা অল্প পরিমান জায়গাও ব্যক্তি মালিকানাধীন থাকে তাহলে পুরো জায়গাটি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় বরাদ্দ নেয়ার সুযোগ রয়েছে।’

তাহলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বে টার্মিনালের জন্য ৮২০ একর জায়গা প্রথমে বন্দোবস্ত ও এখন অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় যাচ্ছে কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যেহেতু এখানকার কিছু জায়গা জেলা প্রশাসন ৯৯ বছরের ইজারা দলিলের মাধ্যমে বরাদ্দ দিয়েছিল। তাই এখন আর এখানে বন্দোবস্ত হবে না, এই ভূমি বরাদ্দ পেতে অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় যেতে হবে।’

এদিকে বে টার্মিনালের নির্মাণের সম্ভাব্যতা জরিপের কার্যক্রম শেষ করে জার্মানির হামবুর্গ পোর্ট কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান বন্দরের কাছে রিপোর্ট জমা দিয়েছে। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে বন্দর কর্তৃপক্ষ ব্রেক ওয়াটার নির্মাণের মাধ্যমে বে টার্মিনাল গড়ে তোলবে। বে টার্মিনালে তিনটি টার্মিনাল থাকবে। একটি মাল্টিপারপাস টার্মিনাল ও দুটি কনটেইনার টার্মিনাল। প্রাথমিকভাবে সবার আগে বে টার্মিনাল থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনারগুলো ডেলিভারি দেয়ার জন্য স্পেস তৈরি করা হবে। এতে বন্দরের জেটিতে প্রবেশ করা প্রতিদিন প্রায় ছয় হাজার ট্রক নগরীতে প্রবেশ করতে হবে না।

উল্লেখ্য, ইপিজেড থেকে দক্ষিণ কাট্টলী রাসমনি ঘাট পর্যন্ত সাগরের ভেতরের প্রায় ২৩০০ একর জায়গায় নির্মিত হবে বে টার্মিনাল। জোয়ার-ভাটা, দিন-রাত, বাঁকা চ্যানেল কিংবা ড্রাফটের বিবেচনা কর্ণফুলী নদীর জেটিতে জাহাজ ভিড়তে হলেও বে-টার্মিনালের ক্ষেত্রে সেই সীমাবদ্ধতা নেই। বর্তমানে কর্ণফুলী নদীর জেটিতে পৌছাতে একটি জাহাজকে ১৫ কিলোমিটার ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। কিন্তু বে টার্মিনাল নির্মাণ করা হলে তা শূন্য কিলোমিটারের মধ্যেই বার্থিং করতে পারবে।

বে টার্মিনাল নির্মাণ হলে যেকোনো দৈর্ঘ্য ও প্রায় ১২ মিটার ড্রাফটের জাহাজ এখানে ভিড়তে পারবে। বিপরীতে বর্তমান চ্যানেলে মাত্র ১৯০ মিটার দৈর্ঘ্য ও সাড়ে ৯ মিটার ড্রাফটের জাহাজ কর্ণফুলীতে প্রবেশ করতে পারে। সেইক্ষেত্রেও জাহাজকে দুটি বাঁক অতিক্রম করতে হয় এবং দিনের মাত্র চার ঘন্টা সময় পাওয়া যায়। কিন্তু বে টার্মিনালে ২৪ ঘন্টা জাহাজ পরিচালনা করা যাবে। বিদ্যমান জেটিতে একসাথে ১৬টি জাহাজ বার্থিং করা গেলেও বে-টার্মিনালে গড়ে প্রায় ৫০টি জাহাজ একইসাথে বার্থিং করা যাবে। বন্দরের জেটির দৈর্ঘ্য চার কিলোমিটার হলেও বে টার্মিনালের দৈর্ঘ্য হবে ৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার। ল্যান্ড লর্ড পদ্ধতিতে চালু হতে যাওয়া বে টার্মিনাল চট্টগ্রামের গভীর সমুদ্র বন্দরের অভাব গোচাবে বলে বন্দর সংশ্লিষ্টদের ধারনা।

পতেঙ্গা ইপিজেডের পেছন থেকে দক্ষিণ কাট্টলী রাসমনি ঘাট পর্যন্ত সাগরের অংশে ৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকায় গড়ে তোলা হচ্ছে বে টার্মিনাল। এই বে টার্মিনালের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ৬৮ একর ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় বরাদ্দ পেতে এবং ৮২০ একর ভূমি বন্দোবস্ত প্রক্রিয়য় বরাদ্দ পেতে ২০১৫ সালে আবেদন করা হয়েছিল। বন্দর কর্তৃপক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে গত বছরের সেপ্টেম্বরে ৬৮ একর ভূমি অধিগ্রহণের জন্য কেন্দ্রীয় ভূমি বরাদ্দ কমিটি অনুমোদন দেয়। সরকারের বিধি অনুযায়ী মৌজা মূল্যের তিনগুণ মূল্য পরিশোধ সাপেক্ষে এই ভূমি বরাদ্দ পাবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।

সে অনুযায়ী ফিল্ড বুক তৈরির কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে। এখন শুধু টাকা পরিশোধের চিঠি ইস্যু বাকি রয়েছে। কিন্তু আটকে থাকে বন্দোবস্ত প্রক্রিয়ায় আবেদন করা ৮২০ একর ভূমির বরাদ্দ পেতে।

অর্থনীতি এর আরও খবর