বিশ্ব বাণিজ্যে হরমুজ প্রণালি ও ইরান সমাচার

ফাতিমা তুজ জোহরা, আন্তর্জাতিক ডেস্ক, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

২০১৫ সালে প্রভাবশালী ছয়টি দেশের মধ্যে পরমাণু সমঝোতা চুক্তি হয়। ঠিক তিন বছরের মাথায় ২০১৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেই সমঝোতা চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসে। ওই চুক্তির আওতায় ছিল ইরানও। যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু সমঝোতা চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার পর ইরানের সঙ্গে দ্বন্দ্বের সূচনা হয়। যদিও যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব স্বার্থ আদায়ে ব্যর্থ হয়ে এই চুক্তি থেকে সরে আসে বলে বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কূটনৈতিক রেষারেষিতে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ববাজারে ইরানের তেল বিক্রি নিষিদ্ধ করে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার জের ধরে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দেয়। তবে এটিই প্রথম নয়। বিভিন্ন সময় নানান ইস্যুতে ইরান হরমুজ প্রণালিকে নিজেদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।

যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নিষেধাজ্ঞায় ইরানের বক্তব্য—তারা বিশ্ববাজারে তেল বিক্রি করতে না পারলে অন্য কোন দেশকেও তাদের সমুদ্র সীমানা দিয়ে তেলের জাহাজ নিয়ে যেতে দেবে না।

দুই দেশের মধ্যকার পরমাণু চুক্তি এবং তেল বাণিজ্যের দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছালে চলতি বছরের এপ্রিলে ইরান আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেয়। সম্প্রতি ওমান সাগরে দুটি তেলের জাহাজে আগুন লাগার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরকে ঘটনার জন্য দোষ দিতে থাকে। ঠিক এমন সময়ই ইরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি ড্রোন ভূপাতিত করে। দুই দেশের মধ্যে বিবাদের এক পর্যায়ে ইরানের আকাশ পথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমান চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। আকাশপথে নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে সম্প্রতি ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক প্লেন চলবে না বলে ঘোষণা দেয়। অন্য রুট দিয়ে প্লেন চলার জন্য অতিরিক্ত ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা প্লেনের ভাড়া বেশি গুণতে হবে বলেও জানায় এয়ারলাইন্সটি।

হরমুজ প্রণালি কী?

একটি সরু জলপথ যা পশ্চিমের পারস্য উপসাগরকে পূর্বে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সাথে সংযুক্ত করেছে। এটি আরব উপদ্বীপকে ইরান থেকে পৃথক করেছে। ৩৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই চ্যানেলটি পারস্য উপসাগরের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ওমান ও ইরানকে সংযুক্ত করেছে।

এই রুট আন্তর্জাতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ তেলবাহী জাহাজ যাতায়াতের এটিই একমাত্র পথ। বিশ্বব্যাপী পেট্রোলিয়াম পরিবহনে প্রণালিটির কৌশলগত গুরুত্ব ব্যাপক। জলপথটির সবচেয়ে সরু অংশের দৈর্ঘ্য ২১ মাইল এবং প্রস্থ দুই মাইল। সরু জলপথ হলেও গভীরতা বেশি হওয়াতে তেলবাহী জাহাজ সহজে আসা যাওয়া করতে পারে এই পথ দিয়ে।

হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব

বিশ্বে যে পরিমাণে তেল রপ্তানি হয় তার পাঁচ ভাগের এক ভাগ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। ২০০৯ সালে হরমুজ প্রণালি দিয়ে মোট সমুদ্র বাণিজ্যের ৩৩ শতাংশ, ২০০৮ সালে ৪০ শতাংশ হয়। বর্তমানে বিশ্বের ৩০ শতাংশ জ্বালানি তেল এই জলপথ দিয়ে রপ্তানি হয়।

এই জলপথ দিয়ে নির্বিঘ্নে তেল পরিবহনের জন্য মার্কিন যুদ্ধজাহাজ প্রতিনিয়ত পাহারা দিচ্ছে। সম্প্রতি (২৫ জুন) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন তাদের যুদ্ধ জাহাজ আর তেলবাহী জাহাজের নিরাপত্তা দিতে চায় না।

এই প্রণালি দিয়ে রপ্তানি তেল বেশিরভাগই যায় এশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতে। জাপানের তিন-চতুর্থাংশ এবং চীনের প্রায় অর্ধেক তেল যায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। প্রতিদিন এক কোটি ৯০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি হয় এই জলপথে।

ইরান কি আসলে হরমুজ প্রণালি বন্ধে সক্ষম?

জাতিসংঘ সমুদ্র আইনে একটি দেশের ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত এলাকা সেই দেশের সমুদ্র সীমা হিসেবে বিবেচিত হবে। পারস্য রুটে যেতে যেসব জাহাজ উত্তর ও দক্ষিণ রুট ব্যবহার করে সেসব জাহাজকেও ইরান বাধা দিতে পারে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে কী হতে পারে?

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে আকাশপথ ও সমুদ্রপথ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গত (১৩ জুন) ওমান সাগরে দুটি তেলের ট্যাংক বিস্ফোরণের ঘটনায় কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তেলের দাম বেড়ে যায় বিশ্ববাজারে। এমনকি ইরান মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করার পর সৃষ্ট উত্তেজনা এড়াতে ওমান সাগর ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক ফ্লাইটগুলো অন্য রুটে চলার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে প্লেনের টিকেটের দাম বৃদ্ধি ও কেবিন ক্রুদের অতিরিক্ত পরিশ্রমের ফলে বাতিল হয় বেশকিছু ফ্লাইট। এরই ধারাবাহিকতায় বলা যায়, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে বিশ্বে বাণিজ্য বেশ বড় প্রভাব ফেলবে। আকাশপথ ও জলপথ ঘিরে সৃষ্টি হবে নানা জটিলতা।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে কি ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হবে?

হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানি করে ইরান বছরে ৫ হাজার কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে ইরানের তেল বাণিজ্যও ক্ষতির সম্মুখীন হবে। ইরান নিজেও এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশে তেল রপ্তানি করে থাকে।

বর্তমানে আমেরিকার মূল উদ্দেশ্য বিশ্ববাজারে ইরানের তেলের বাজার পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া। যদিও জাপান কিংবা চীনের মত দেশগুলো ইরান থেকে তেল নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

সম্প্রতি ইরান ইস্যুতে সৌদি সরকারের হস্তক্ষেপে বিশ্বব্যাপী আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তেলের ট্যাংকারে হামলায় সৌদি সরকার ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একই সুরে কথা বলছে। যদিও পর্যাপ্ত তথ্য প্রমাণ দিতে তারা উভয়ই ব্যর্থ হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন :