যে কারণে ‘ব্যর্থ’ ভারতের চন্দ্রযান-২ অভিযান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
ভারতের চন্দ্রযান-২

ভারতের চন্দ্রযান-২

  • Font increase
  • Font Decrease

চন্দ্রযান-২ অভিযান নিয়ে এক বুক আশা বেধেছিল ভারত। নতুন মেয়াদে ক্ষমতায় আরোহনের ১০০ দিন পূরণ হওয়ার আগে বিজেপি চাওয়া ছিল- চাঁদে সফল অভিযানের মধ্যদিয়ে তারা ভারত তথা বিশ্ববাসীকে বড় চমক উপহার দেবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ ১৪০ কোটি ভারতবাসী তাই শনিবার দিবাগত রাতে(৭ সেপ্টেম্বর) অপলক নয়নে চেয়েছিল ইন্ডিয়ান স্পেস এজেন্সির (ইসরো) দিকে।

কিন্তু ভাগ্য বিধি বাম! চন্দ্রপৃষ্ঠ থেকে ২.১ কি.মি উপরে থাকতে চন্দ্রযান-২ সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয় ইসরোর। মিশন হয় ব্যর্থ।

রুদ্ধশ্বাস কয়েক মুহূর্ত পর করে সে রাতে ইসরো প্রধান ও ভারতের ‘রকেটম্যান’ খ্যাত কে. সিভান ঘোষণা দিয়েছিলেন ‘চন্দ্রযান-২ এর সঙ্গে কন্ট্রোল স্টেশনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে।’

হৃদয় ভেঙে যায় কোটি কোটি ভারতবাসীর। অনেকের কাছেই ছিল যেন তীরে এসে তরী ডুবে যাওয়ার মতো। আর ইসরোর বিজ্ঞানীদের জন্য সেটা ছিল হাতে নাগালে আসা কিন্তু মুঠোবন্দী করতে না পারা।

চন্দ্রযান-২ এর সঙ্গে কন্ট্রোল স্টেশনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণগুলো নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোন তথ্য প্রকাশ করেনি ইসরো। তবে এই ব্যর্থতার বেশ কিছু কারণ খোঁজার চেষ্টা করেছে প্রতিষ্ঠানটির সাবেক কয়েকজন বৈজ্ঞানিক। বিবিসির সঙ্গে এক আলাপচারিতায় তারা নিজেদের অভিমত তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।

২০ আগস্ট চাঁদের কক্ষপথে প্রবেশ করেছিল চন্দ্রযান-২। ৭ আগস্ট দিবাগত মধ্যরাতের কিছু পরে (১৮.০০ জিএমটি) চাঁদের পৃষ্ঠে তার অবতরণের কথা। কিন্তু চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে যখন চন্দ্রযানটির ল্যান্ডার ‘বিক্রম’ নামার প্রত্যাশায় সবাই তার কিছুক্ষণ আগে কন্ট্রোল স্টেশনের সঙ্গে ল্যাণ্ডারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। এখন পর্যন্ত সেই সংযোগ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি বিজ্ঞানীরা।

জানা গেছে, চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণের ক্ষণগণনা যখন শুরু হয়ে তখন চন্দ্রযানটির গতিবেগ ছিল ১৬৪০ মি./সে.। বিজ্ঞানীদের মতে, পরিকল্পনা মাফিক অবতরণের দিকেই ছিল চন্দ্রযান। ‘রাফ ব্রেকিং’ ও ‘ফাইন ব্রেকিং’ পর্যায় দুটি নির্বিঘ্নে পার হলেও বিপত্তি বাধে চূড়ান্ত পর্যায়ে। যেটাকে বলা হয় ‘হোভারিং পর্যায়।’ সমস্যার সূত্রপাত সেখানেই।

ইসরোর সাবেক সদস্য অধ্যাপক রোদ্দাম নরসিংহার মতে,  চন্দ্রযানটি অভিযান নিয়ে লাইভ স্ক্রিনে ভেসে ওঠা তথ্যসমুহ বিশ্লেষণ করে দেখা যায় সমস্যাটি  ল্যান্ডারের কেন্দ্রিয় ইঞ্জিনে হতে পারে।

তিনি বলেন, একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে যে ল্যান্ডারটি পরিকল্পনার চেয়ে দ্রুতগতিতে নিচের দিকে যাওয়া। কেননা চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণের সময় এটির গতিবেগ থাকার কথা ২মি/সে। কিন্তু চাঁদের অভিকর্ষ শক্তির টান এটাকে হয়ত দ্রুত গতিতে নিচের দিকে টেনে নিয়েছে।

ল্যান্ডারের কেন্দ্রীয় ইঞ্জিনের সমস্যার কারণে এই পরিস্থিতি সেখানে সৃষ্টি হয়েছিল বলেই বিশ্বাস নরসিংহার। যার কারণে এক পর্যায়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ল্যান্ডারের সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

ভারতের আরেকজন স্বনামখ্যাত বিজ্ঞানী মাইসোয়ামী আন্নাদুরাই। দেশটির প্রথম চন্দ্রঅভিযানের প্রধান নায়ক তিনি। চন্দ্রযান-২ এর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পেছনে তিনি শেষ মুহূর্তের ‘অসঙ্গতিপূর্ণ’ গতিবেগকেই দায়ী করেছেন। আর সেটি হয়েছে ল্যান্ডারে কিছু একটা গোলযোগের কারণেই।

তিনি বলেন, ল্যান্ডারের অবস্থানগত বিপত্তির কারণে এটা হতে পারে। পরিপূর্ণ তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে যে সেখানে আসলে কী হয়েছিল? তবে এটা মনে হচ্ছে, হয়ত কোন সেন্সর বা থ্রাস্টার ঠিকমত কাজ করেনি।

অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের নিউক্লিয়ার এন্ড স্পেস পলিসি ইনিশিয়েটিভের প্রধান ড. রাজেশ্বরী রাজাগোপালান এর মতে, ইঞ্জিনের ত্রুটি সম্ভাব্য কারণ।

তিনি বলেন, পর্যাপ্ত তথ্য উপাত্ত না পেয়ে উপসংহার টানা যাবে না। তবে স্ক্রিনে প্রাপ্ত তথ্য থেকে দেখা যায়, কিছু একটা সেখানে ঠিক ছিল না।

আরেকটি সম্ভাবনা হতে পারে যে চন্দ্রযানটি যখন দ্রুত গতিতে চন্দ্রপৃষ্টে অবতরণ করছিল তখন সেখানকার অভিকর্ষজ শক্তির দরুণ উৎপাদিত প্রচুর ধুলা চন্দ্রযানটিকে প্রচণ্ড ধাক্কা দিয়েছে।

প্রসঙ্গত, ইসরোর ইতিহাসে চন্দ্রযান-২ অভিযানটি সবচেয়ে জটিল মিশন ছিল। চাঁদের মাটি বিশ্লেষণের জন্য ল্যান্ডারটি ২৭ কেজি ওজনের একটি যন্ত্র বহন করছিল। যার নাম প্রজ্ঞান। ল্যান্ডারটি থেকে ৫০০ মিটার দূরত্ব পর্যান্ত যাওযার সক্ষমতা ছিল প্রজ্ঞানের। ১৪ দিন পর্যন্ত সেটি বিভিন্ন তথ্য, উপাত্ত ও ছবি পৃথিবীতে পাঠাতে পারত।

 

আপনার মতামত লিখুন :