পবিত্র রোজা ও রমজানের প্রস্তুতি



মাওলানা আবদুল জাব্বার, অতিথি লেখক, ইসলাম
পবিত্র রোজা ও রমজানের প্রস্তুতি, ছবি: সংগৃহীত

পবিত্র রোজা ও রমজানের প্রস্তুতি, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

চাঁদ দেখা সাপেক্ষে মঙ্গলবার অথবা বুধবার দিবাগত রাত থেকে রোজা পালনের উদ্দেশ্যে তারাবির নামাজ ও সাহরি খাওয়া শুরু করতে হবে। অর্থাৎ রমজান মাস শুরু হবে। প্রতিবছর মানবজীবনের সব কালিমা দূর করার বিশেষত্ব নিয়ে পবিত্র রমজান মাস আসে। রমজান মাস হচ্ছে আল্লাহতায়ালার নৈকট্য লাভের বিশেষ মৌসুম। বছর ঘুরে সেই রমজান আমাদের মাঝে উপস্থিত হতে যাচ্ছে। এ মাসে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে আল্লাহতায়ালার নৈকট্য অর্জন করাই হলো রমজানের অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। এ প্রসঙ্গে কোরআনে কারিমে ইরশাদ হচ্ছে, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর, যেন তোমরা পরহেজগারী অর্জন করতে পার।’- সূরা বাকারা: ১৮৩

রোজায় পানাহার এবং শারীরিক চাহিদাকে সংযত করার মাধ্যমে এবং আল্লাহর নির্দেশিত পন্থায় জীবন পরিচালনার মাধ্যমে মানুষের মাঝে এক আধ্যাত্মিক বোধ তৈরি হয়। ফলে মানুষ যাবতীয় অহঙ্কার, কুপ্রবৃত্তি ও নফসের দাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে আল্লাহর প্রিয় বান্দায় পরিণত হয়। যার প্রেক্ষিতে রোজাদারের জন্য ইহজগতের শান্তি, পারলৌকিক কল্যাণ ও মুক্তির সনদ ঘোষিত হয়।

রোজা ফরজ হয় হিজরি দ্বিতীয় সালে। রোজার তাৎপর্য সম্পর্কে হাদিসে এসেছে, ‘যখন রমজান মাসের প্রথম রাত আসে তখন জান্নাতের সব দরজা উম্মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং মাসব্যাপী তা খোলা থাকে, কোনো দরজাই বন্ধ করা হয় না।’

শেষ নবীর উম্মত হিসেবে রমজান মাসের বিশেষ কিছু ফজিলত শুধু আমাদেরকেই দেওয়া হয়েছে; যা পূর্ববর্তী কোনো উম্মতকে দেওয়া হয়নি। যেমন- পানাহার না করার কারণে মুখ থেকে যে দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয় তা আল্লাহতায়ালার নিকট মিশকে আম্বরের চেয়েও অধিক সুগন্ধযুক্ত; ফেরেশতারা ইফতার পর্যন্ত রোজাদারের জন্য প্রার্থনা করতে থাকেন; শয়তানকে এ মাসে আবদ্ধ করে রাখা হয়; প্রতিদিন আল্লাহতায়ালা জান্নাতকে নতুন সাজে সজ্জিত করেন ও রমজানে প্রত্যেক রাতের শেষে রোজাদারের গোনাহ মাফ হয়ে যায়।

ইসলামের অনুসারীদের জন্য আল্লাহতায়ালার বিরাট নিয়ামত রমজান মাস। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত রমজানের জন্য যথাযথভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করা।

মাহে রমজান মুসলমানদের জন্য এক প্রশিক্ষণের মাস। যার মাধ্যমে রোজাদারদের জীবন প্রভাবিত হয়। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যেব্যক্তি পবিত্র রমজান মাস ভালোভাবে যাপন করবে, তার সমগ্র বৎসর ভালোভাবে যাপিত হবে।’ বলা হয়, ‘রজব মাসে শস্য বপন করা হয়, শাবান মাসে খেতে পানি সিঞ্চন করা হয় এবং রমজান মাসে ফসল কর্তন করা হয়।’

সুতরাং এ শ্রেষ্ঠতম মাসে নামাজ, রোজা পালন, কোরআন তেলাওয়াত তথা আল্লাহতায়ালার ইবাদত-বন্দেগি করে কাঙ্খিত লক্ষ্যপানে ধাবিত হওয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অবশ্যকর্তব্য। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) রোজার কয়েক মাস পূর্ব থেকেই রোজার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করতেন। তিনি এ মাসের আগমনে পুলকিত হয়ে সাহাবায়ে কেরামদের (রা.) মোবারকবাদ পেশ করতেন।

তাই নৈতিক পরিশুদ্ধি ও আত্মগঠনের এই মাসে মুসলমানদের রোজার সার্বিক প্রস্তুতি এখনই সম্পন্ন করতে হবে। রমজান শুরু হলে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার স্বাভাবিক কাজকর্ম সম্পাদন করে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়সহ তারাবির নামাজ, পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত, নফল ইবাদত, জিকির-আজকার, তাসবিহ-তাহলিল, দোয়া-ইস্তেগফার, দান-সদকা করে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের প্রতিযোগিতায় নামতে হতে হবে। বিপদগ্রস্ত অসহায় মানুষকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করতে হবে। নানাবিধ সঙ্কট, দুঃখ ও ক্লেশের সময় ও ধৈর্যধারণ করতে হবে। এছাড়া রোজার আবশ্যকীয় বিধি-বিধানসহ রোজার মাসয়ালা সম্পর্কেও প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করতে হবে।

রমজানের প্রস্তুতিকে একশ্রেণির মুসলমান বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে থাকেন, আবার অন্য একটি শ্রেণি রয়েছেন যারা এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন। মুসলমান হিসেবে সবার জন্য প্রয়োজন রমজানের প্রস্তুতির বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে যথাযথভাবে রমজানের ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল হওয়া। কারণ এ মাসের ইবাদত-বন্দেগির সওয়াব অন্যসব মাসের ইবাদত-বন্দেগি থেকে ৭০ গুণ বেশি।

রমজানের এক মুহূর্ত সময়ও অযথা নষ্ট না করা যাবে না। রোজাদারকে সর্বোতভাবে ঝগড়া-বিবাদ এড়িয়ে চলতে হবে। মিথ্যা কথা ও অশ্লীল কোনো কিছু থেকে চোখ-কান এবং ইন্দ্রিয়সমূহকে দূরে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, রমজান মাসে শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে রাখা হয় বলে সে মানুষকে ধোঁকা দিতে পারে না- এটা সত্য। কিন্তু পূর্ববর্তী সময়ে কৃত বিভিন্ন পাপাচার-অনাচারগুলো মানুষকে পাপের পথে টেনে নিয়ে যায়। আর পূর্বের মন্দ অভ্যাসগুলোর সঙ্গে লড়াই করার জন্যই রমজানের আগমন। তাই সেদিকে কঠোর নজর রাখতে হবে। কোনো অবস্থাতেই পাপ ও মন্দ কাজে লিপ্ত হওয়া যাবে না। এই চেষ্টার বিনিময়েই তো আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘রোজা আমারই জন্য, আমি নিজেই তার প্রতিদান দেব।’ না জানি সেই প্রতিদান কতো মনোরম!