Alexa

‘দয়া করে আমাদের এখানে ইফতার করে যান’

‘দয়া করে আমাদের এখানে ইফতার করে যান’

মিসরের রাস্তায় ইফতারের দৃশ্য, ছবি: সংগৃহীত

পিরামিড, নীল নদ আর তুর পর্বতের দেশ মিসর। দেশটিতে ফানুস দিয়ে পবিত্র রমজান মাস বরণ করা হয়। রাস্তাঘাট, দোকানপাট, বাড়িঘর- সবখানে জ্বলে রঙিন কাঁচের লণ্ঠন, ওরা বলে ফানুস। রমজানের সময় ছেলেপুলেরা মোমবাতি দিয়ে ফানুস বা লণ্ঠন জ্বালায় এবং তারা রাস্তায় রাস্তায় প্রদক্ষিণ করে। আনন্দ করে।এসময় তারা আল্লাহর নামে গানও করে।

যেমন ‘যদি রমজান না আসতো, আমরা আসতাম না।’ ‘হাঁটতে হাঁটতে আমাদের পা ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে, হে দয়ালু আল্লাহ...’। অন্য গানে আছে- ‘ও সুলতানের কন্যা ইয়াহা! তোমার সুন্দর জালওয়া, মাথার ঝলকানো টিকলি মুসাফিরকে আর আকৃষ্ট করবে না। রমজান এসেছে দ্বারে এসো আল্লাহর ইবাদতে শামিল হই!’

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মিসরের মানুষ রমজানে প্রথম ফানুস ব্যবহার শুরু করে ৩৫৮ হিজরির (২৪ জুলাই ৯৬৮) ৫ রমজান তারিখে। এই তারিখে ফাতেমি খলিফা আল মুয়িজ রাতে কায়রো প্রবেশ করে। স্থানীয়রা টর্চ, বাতি, মোমবাতি- এ সব নিয়ে তাকে স্বাগত জানায়। মোমবাতিগুলো যাতে বাতাসের বেগে নিভে না যায় সেজন্য তারা মোমবাতিকে কাঠের ফ্রেমে রেখে কয়েকটি দিক বন্ধ করে দেয় পাম পাতা ও চামড়ার টুকরা দিয়ে। সেই থেকে শুরু। এখন তা রমজান ঐতিহ্য হিসেবে পরিগণিত।

মিসরের রমজান চিত্র, ছবি: সংগৃহীত
Caption

মিসরীয় শিশুদের কাছে রমজান মাসটি সবচেয়ে বেশি আনন্দময়। তারা এ সময় আমাদের দেশের বাচ্চাদের মতো পিতামাতার কাছে রোজা রাখার জন্য দাবী জানায়। মিডিয়ার তথ্য মতে মিসরের মোট জনসংখ্যার ৫-১০% খ্রিস্টান (৫০ লাখের মতো)। তারা রমজান মাসের প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখে প্রকাশ্যে ধুমপান ও খাদ্যগ্রহণ করেন না। অনেক উদারপন্থি খ্রিস্টান জাতীয় ঐক্য সমুন্নত রাখতে এ মাসে উপবাস করেন। মিসরের নারীরা বাংলাদেশের মতো হিজাব ও ননহিজাবে বিভক্ত হলেও রমজানে তারা পর্দার ব্যাপারে বেশ যত্নবান থাকেন।


আমরা যেমন ঈদের আগে-পরে পরিচিত কাউকে দেখলে বা কারও সঙ্গে কথা হলেই ‘ঈদ মোবারক’ বলি, ওরা তেমনই পুরো রোজার মাস চালিয়ে যায় বিভিন্ন ধরণের সম্ভাষণ। তার মধ্যে রয়েছে-‘রামাদ্বান কারীম’। এর উত্তরে বলা হয়, ‘আল্লাহু আকরাম’। আরও বলা হয়- ‘কুল্লু সানা ওয়া আনতুম তাইয়্যিব’ অর্থাৎ সারা বছর তুমি ভালো থেকো।


মিসরের রাজধানী কায়রো। জোহরের নামাজের পর থেকে ‘বাজারের শহর’নামে খ্যাত কায়রো শহরের অলিগলিতে ঢাকার চকবাজারের ন্যায় ছড়িয়ে পড়ে হরেক রকম ইফতারের আয়োজন। মিসরীয় মুসলিমরা সাধারণত হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত অনুসরণ করে পানি ও খেজুর দিয়ে রোজা ভেঙে থাকে।

মিসরে অধ্যয়নরত বাংলাদেশী শিক্ষার্থী আশরাফ মাহদি বলেন, তামার হিন্দের শরবত ছাড়া মিসরিদের ইফতার হয় না বললেই চলে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে এই শরবত বিক্রির জন্য রমজান উপলক্ষে অস্থায়ী দোকানও বসতে দেখা যায়। তামার হিন্দ তেঁতুলকে বলা হলেও এই শরবতে তেঁতুলের স্বাদ না থাকায় এটাকে তেঁতুলের শরবত বলতে কষ্ট হয়।

মিসরিদের অভিজাত খাবারের মধ্যে একটি হচ্ছে মাহশি। মূলতঃ উসমানি খেলাফতকালে তুর্কিরাই মিসরে এ শাহি খাবারের প্রচলন ঘটিয়েছিল। রেসিপিটা হচ্ছে, প্রথমে বিশেষ মসলার মাধ্যমে ভাত ও সেদ্ধ গোশতের মিশেলে ভেতরের উপকরণ তৈরি করা হবে। এরপর সেটার ওপর কোনো সবজি জাতীয় খাদ্য অথবা আঙ্গুরের পাতার আবরণ দেওয়া হবে। কিছু কিছু দস্তরখান থাকে বাঁধাকপিতে মোড়ানো, বেগুনে মোড়ানো ও ক্যাপ্সিক্যামে মোড়ানো মাহশি। শুধু এই এক মাহশির জন্যেই প্রায় বিশের অধিক রেসিপি এপ্লাই করে থাকেন মিসরি ললনারা। ঘরোয়া পদ্ধতি এই খাদ্য তৈরি করতে বেশ মেহনতেরও প্রয়োজন। ইফতারের আইটেমে স্যুপ থাকাটা মিসরিদের জন্য বাধ্যতামূলক। তম্মধ্যে অন্যতম হলো- লিসানে উসফুর, মুলুখিয়্যা ও গরুর গোশতের স্যুপ।

লিসানে উসফুর হচ্ছে এক ধরণের শস্য। যার ধরণ অনেকটা চড়ুই পাখির জিভের মত। সে কারণেই হয়তো এই নাম রাখা হয়েছে। ইফতারির আরেকটি আইটেম হচ্ছে, শারিয়্যা দিয়ে রুজ। যা অনেকটা পোলাওয়ের বিকল্প বলা যায়। এ ছাড়া আছে, টমেটো দিয়ে মিসরিয় স্টাইলে বানানো আলুর দম।
মিসরের রমজান চিত্র, ছবি: সংগৃহীত


রোজাদারদের ইফতার করানোর লক্ষ্যে কায়রোর রাস্তায় বিকেল থেকেই টেবিল সাজানোর কাজ শুরু হয়। কোনো কোনো ব্লকে অসংখ্য টেবিল বসে। শত শত চেয়ার সাজানো হয়। আর এত টেবিলে কেবল গরিবরা বসেন তা নয়। নানা কাজে রাস্তায় থাকা লোকজনও আনায়াসে শামিল হয়ে যান এতে। এ ছাড়া মিসরিরা ইফতারের সময় রাস্তায় কোনো গাড়ি চলাচল করলে তা আটকে দিয়ে গাড়ির আরোহীদের মাঝে ইফতার বিতরণ করেন।


মিসরের আকাশে ভাসে কোরআনের সুর। চারদিকের কোরআন তেলাওয়াত শুনে আপনার মনে হবে, একজন আরেকজনের চেয়ে সুন্দর করে কোরআন তেলাওয়াতের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। হয়তো বা সে জন্যই বলা হয়- ‘কোরআন নাজিল হয়েছে সৌদিতে, পড়া হয় মিসরে এবং লেখা হয় তুরস্কে।’ এ জন্যই আপনি সর্বত্র বেশি শুনতে পাবেন মিসরের বিখ্যাত কারিদের তেলাওয়াত। যেমন- শায়খ আবদুল বাসেত আবদুস সামাদ, শায়খ মুহাম্মদ সাদিক মুনশাভি, শায়খ মাহমুদ খলিল হাসরি, শায়খ মুস্তফা ইসমাইল প্রমুখ।

আমাদের দেশে বিশ রাকাত তারাবি আদায় করতে যে সময় লাগে, মিসরে ৮ রাকাত নামাজ আদায় করতে প্রায় তার তিন গুণ বেশি সময় লাগে। দেশটিতে সুরা তারাবি নাই বললেই চলে। মিসরে সাধারণত ৮ রাকাত নামাজ আদায় করা হয়। কিছু কিছু মসজিদে ২০ রাকাতও আদায় করা হয়। আর এই পার্থক্যের কারণ খুবই স্পষ্ট। কারণ আমাদের দেশে ইমাম আবু হানিফার মাজহাব এবং মিসরে ইমাম শাফেয়ির মাজহাব অনুসরণ করা হয়।

আপনার মতামত লিখুন :