আর্জেন্টিনার মুসলিমরা রমজানে ইসলাম শিক্ষায় মনোযোগী হয়



আতাউর রহমান খসরু, অতিথি লেখক

  • Font increase
  • Font Decrease

আর্জেন্টিনার পাঁচ কোটি জনগণের প্রায় ২.৫% মুসলিম। জনসংখ্যার বিচারে মুসলিমরা দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ। ফলে দেশটিতে মুসলমানরা সর্ববৃহৎ সংখ্যালঘু ধর্মীয় জনগোষ্ঠি।

বর্তমানে আর্জেন্টিনায় প্রায় ১০ লাখ মুসলিম বসবাস করেন। যাদের একপঞ্চমাংশই বাস করে রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্সে। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো- আর্জেন্টিনায় মুসলিম জনসংখ্যা দিন দিন কমছে।

আর্জেন্টিনায় সর্বপ্রথম ইসলাম নিয়ে আগমন করেন স্পেনের নির্বাসিত মুসলিমরা। যারা দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন। বিশ শতকের শুরুতে অনেক আরব মুসলিম আর্জেন্টিনায় পাড়ি জমান। যাদের অধিকাংশ সিরিয়া ও লেবাননের অধিবাসী। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম অভিবাসীদের সংখ্যা আরব অভিবাসীদের ছাড়িয়ে গেছে।

আর্জেন্টিনার মুসলিমরা পবিত্র রমজান মাসকে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে স্বাগত জানায়। তারা জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক সাধনার মাস হিসেবেই রমজানকে গ্রহণ করে। এ লক্ষে মসজিদে সমবেত হয়। রমজানে মসজিদে দ্বীনি শিক্ষার বিশেষ আয়োজন করা হয়। বিশেষ করে ইফতারির পূর্ব থেকে তারাবির পর পর্যন্ত তারা মসজিদে অবস্থান করার চেষ্টা করে। রাজধানীর প্রধান প্রধান মসজিদে দিনের বেলায়ও দীর্ঘ সময় ইসলামি বিধানবলীর শিক্ষা দেওয়া হয়।

উপযুক্ত ইসলামি শিক্ষার ব্যবস্থা না থাকাটাই আর্জেন্টিনার মুসলিমদের অন্যতম প্রধান সমস্যা। এ কারণে তারা নতুন প্রজন্মকে ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারছে না। তার পরও তারা চেষ্টা করছে এ সমস্যা কাটিয়ে উঠতে। এ জন্য তারা স্থানীয় সমাজ ব্যবস্থার সঙ্গে মিশে যেতেই বেশি পছন্দ করছে।

কিন্তু ইসলামি শিক্ষা উপকরণের অভাবটি তারা তীব্রভাবে অনুভব করছে। নতুন প্রজন্ম স্প্যানিশ ভাষা ছাড়া অন্য ভাষা খুব একটা জানে না। আর স্প্যানিশ ভাষায় ইসলামি জ্ঞানের উপকরণ খুবই কম। তাই রমজানকে আর্জেন্টেন মুসলিমরা ইসলামি শিক্ষাগ্রহণের সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখেন। এ সময় আরব ও অনারব দেশ থেকে আগত মুসলিম স্কলারদের কাছ থেকে ধর্মীয় বিধি-বিধান শেখার চেষ্টা করেন।

তারাবির পর মুসলিমরা পরস্পরের সঙ্গে দেখা করেন এবং উপহার আদান-প্রদান করেন।

রমজানের আগমনে সবচেয়ে বেশি খুশি হয় আর্জেন্টিনার আফ্রিকান মুসলিমরা। যারা ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের তাড়নায় আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এ দেশে পাড়ি জমিয়েছে। কেননা রমজানে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো তাদের সাহায্য-সহযোগিতায় ব্যাপকভাবে এগিয়ে আসে। রমজানের সহযোগিতা প্রধানত মুসলিমরা পেয়ে থাকলেও অনেক মুসলিম ব্যক্তিকেও তা দেওয়া হয়।

দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে ইসলামিক সেন্টার ‘বাদশাহ ফাহাদ ইসলামিক কালচারাল সেন্টার’ আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্সে অবস্থিত। ১৯৯২ সালে খাদেমুল হারামাইনের সহযোগিতায় এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ৩৪ হাজার মিটারব্যাপী এই কালচারাল সেন্টারের অধীনে রয়েছে, একটি মসজিদ, একটি পাঠাগার, দু’টি ধর্মীয় স্কুল ও একটি পার্ক। সেন্টারটি ইসলাম প্রচার, ধর্মীয় শিক্ষা দান, ফতোয়া প্রদান, ইসলামিক ম্যাগাজিন প্রকাশ ও মুসলমানের মাঝে বিয়ে দেওয়ার কাজ করে থাকে।

রমজানে বাদশাহ ফাহাদ ইসলামিক সেন্টার বহুমূখি কার্যক্রম গ্রহণ করে। যেমন, ইফতার ও সাহরির আয়োজন করা। মুসলিম ও অমুসলিম সব ধর্মাবলম্বীদের জন্য তা উন্মুক্ত রাখা। কোরআনের দরস, হিফজুল কোরআন, কেরাত ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা।

আর্জেইন্টেন মুসলিমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে রোজা রাখেন। রমজানে তারা ধর্মীয় বিধি মতো জীবনযাপনের চেষ্টা করেন। যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে পরস্পরকে ধর্মীয় কাজে উদ্বুদ্ধ করেন। তারা ইফতার ও তারাবির নামাজে মসজিদে একত্র হয়। তারাবির পর থেকে ফজর পর্যন্ত মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টারগুলো মুসল্লিদের জন্য খোলা থাকে। কোথাও কোথাও ইফতারের সঙ্গে সঙ্গে মুসল্লিদের জন্য সাহরির ব্যবস্থাও থাকে।

রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্সে মুসলিমদের উপস্থিতি বেশি হওয়ায় সেখানে মুসলিমদের রমজানপ্রস্তুতি ও রমজানের কার্যক্রম সহজেই চোখে পড়ে। গত পাঁচ বছর যাবত রাজধানীর ‘কিলমিস’ এলাকায় আফ্রিকান বংশোদ্ভূত একদল স্বেচ্ছাসেবক মানুষকে সাধারণভাবে ইসলামের দাওয়াত ও কোরআন শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। রমজান মাসে তারা কোরআন ও হাদিসের বিশেষ পাঠদান করেন।

ইসলামিক সেন্টার অব আর্জেন্টিনা দেশের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মসজিদগুলোতে রমজানে কোরআন ও ধর্মীয় বিষয়ে পাঠদানের ব্যবস্থা করে। তারা রমজান মাসে বিশেষ টেলিভিশন সম্প্রচারের ব্যবস্থা করে। যেখানে মুসলিমগণ ইসলামি জীবনব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে ও প্রশ্ন করার সুযোগ পান।

রমজানে ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আরব দেশগুলো থেকে স্বেচ্ছাসেবক আলেমরা আসেন। তারা রমজানে আর্জেন্টিনার বিভিন্ন মসজিদে নামাজের ইমামতি ও ধর্মীয় বিষয়ে মুসলিমদের শিক্ষা দিয়ে থাকেন।

ইফতা ও সাহরিতে আরব সংস্কৃতির প্রাধান্য দেখা যায়। যেমন ইফতার আয়োজনে মিষ্টান্নের প্রাধান্য, খেজুর, দুধ ও সিমের উপস্থিতি ইত্যাদি। তবে অন্যান্য অঞ্চলের অধিবাসীগণও রমজানে আপন সংস্কৃতি চর্চায় মনোযোগ দেন। বিশেষত একই অঞ্চলের অভিবাসীগণ একত্রে থাকলে তারা দেশীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী রমজান উদযাপন করেন।