উপমহাদেশের প্রাচীন ইমামবাড়া ঢাকার হোসেনি দালান

ড. মাহফুজ পারভেজ, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম 
উপমহাদেশের প্রাচীন ইমামবাড়া ঢাকার হোসেনি দালান

উপমহাদেশের প্রাচীন ইমামবাড়া ঢাকার হোসেনি দালান

  • Font increase
  • Font Decrease

৬১ হিজরির ১০ মহররম তারিখটি ছিল ইংরেজি ৬৮০ সালের ১০ অক্টোবর। ঐ তারিখে ইরাকের কারবালার প্রান্তরে এক অসম যুদ্ধে ইসলামের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রিয়তম দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসেন (রা.) নির্মমভাবে শহীদ হন। ক্ষমতার মোহগ্রস্ত প্রতিপক্ষ নবী বংশের বহু সদস্যকে নিহত ও বন্দি করে।  কারবালার শাহীদদের স্মরণে ইসলাম ধর্মের শিয়া সম্প্রদায় ইমামবাড়া বা হোসেনি দালাল নির্মাণ করেন।উপমহাদেশের প্রাচীন ইমামবাড়া হলো ঢাকার হোসেনি দালান।

তবে উপমহাদেশে প্রথম ইমামবাড়া নির্মিত হয় দক্ষিণ ভারতে। হায়দারাবাদ শহরের প্রসিদ্ধ চারমিনার চত্বরে ইমামবাড়াটি অবস্থিত। ১৫৯১ সালে ইরানি-শিয়া স্থপতি মীর মুহাম্মাদ মোমিনের নকশা ও নির্দেশনায় 'বাদশাহি আশুরাখানা' নামে এটি প্রতিষ্ঠা পায়। চারমিনার এখনও হায়দারাবাদের ঐতিহ্যবাহী ও দৃষ্টিনন্দন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা। মুঘল শাসনের আগে দক্ষিণ ভারতের গোলকুণ্ডা ও বিভিন্ন স্থানে স্বাধীন রাজ্য ছিল, যা শাসন করতেন মুসলিম শিয়া শাসকরা।

উমাইয়া ও আব্বাসীয় আমলে শিয়া বা হযরত আলীর (রা.) অনুসারীরা আরব অঞ্চলে আক্রান্ত হলে দলে দলে তারা সিন্ধু দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করেন। ইরান থেকেও শিয়া মতাবলম্বী বহু মুসলমান ভারতে আসেন। উল্লেখ্য, বর্তমানে ইরানের পর ভারত উপমহাদেশ হলো বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিয়া জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল।

অযোধ্য বা লক্ষ্ণৌতে শিয়া বাদশাহরা রাজত্ব করেছেন এবং সেখানে বিপুল শিয়া জনগোষ্ঠী ও স্থাপনা রয়েছে। কিন্তু উপমহাদেশের দ্বিতীয় প্রাচীন ইমামবাড়া নির্মিত হয় মুঘল রাজধানী ঢাকায়, যার পপুলার নাম হলো 'হোসেনি দালান'। যদিও মুঘল-পরবর্তী মুর্শিদকুলি খান শিয়া মুসলিম ছিলেন এবং রাজধানী মুর্শিদাবাদের হাজারদুয়ারীতে সুদৃশ্য ইমামবাড়া নির্মাণ করেন। 

পুরানো ঢাকায় অবস্থিত শিয়া সম্প্রদায়ের একটি ইমারত হলো হোসেনি দালান, যা মুঘল সম্রাট শাহজাহানের পুত্র শাহ সুজার শাসনকালে নির্মিত হয়। ১৬৪০ সাল থেকে ১৬৬০ সালের মধ্যে স্থাপনাটি প্রতিষ্ঠা পায়। 

ওমরাহ সৈয়দ মুরাদ প্রথম এ ইমারত নির্মাণ করেন বলে মনে করা হয়, যদিও বাংলার সুবেদার শাহ সুজা নিজে ছিলেন একজন সুন্নি মুসলমান। তবে, মুঘল শাসনামলে শিয়াগণ প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন এবং তারা তাদের ধর্ম ও মত নির্বিঘ্নে পালন করতেন।

হোসেনি দালান প্রথমে একটি ছোট্ট স্থাপনা ছিল। পরবর্তীকালে ১৮০৭ ও ১৮১০ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উদ্যোগে ইমারতটির সংস্কার করা হয় এবং ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পের পর এর কিছু অংশ নতুন করে পুনর্নির্মাণ করা হয়। সংস্কার ও সম্প্রসারণের ফলেই এটি বর্তমান রূপ ধারণ করেছে।

এই হোসেনি দালান একটি উঁচু মঞ্চের উপর স্থাপিত। পূর্বদিকের একটি সিঁড়ির সাহায্যে এই মঞ্চে উঠতে হয়। মূল ইমারতটি পাশাপাশি সংস্থাপিত দুটি হলকক্ষ নিয়ে গঠিত। দক্ষিণমুখী ‘শিরনি’ হলটি হোসেনের মৃত্যুর জন্য দুঃখ ও শোক প্রকাশের উদ্দেশ্যে কালো রঙ করা হয়েছিল।

অন্যদিকে উত্তরমুখী খুতবা হলে রয়েছে সাতধাপবিশিষ্ট একটি কাঠের তৈরি মিম্বর। শেষোক্ত হলটিতে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতীক ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এই দুটি হলের ডানে ও বামে সম্ভবত নারীদের জন্য দ্বিতল বিশিষ্ট সম্পূরক হলকক্ষ নির্মিত হয়েছে। দক্ষিণ দিকের সম্মুখভাগের দুপ্রান্তে দুটি তিনতলা বহুভুজ ফাঁপা বুরুজ রয়েছে। বুরুজগুলোর শীর্ষে রয়েছে গম্বুজ।

ইমারতটির প্যারাপেটে রয়েছে রঙিন পদ্ম-পাঁপড়ির নকশা, আর এর চার কোণের শীর্ষে রয়েছে চারটি ছত্রী। সামগ্রিকভাবে ইমারতটিকে দেখতে একটি আধুনিক ইমারত বলেই মনে হয়, তবে এর কোথাও কোথাও পুরানো আমলের স্থাপত্যের চিহ্ন দেখা যায়। যদিও বর্তমানে হোসেনি দালানের চারপাশ নানা বসতি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ছেয়ে গেছে এবং স্থাপনাটির খোলামেলা অবয়ব ও সৌন্দর্য ঢাকা পড়েছে।

মহররমের ১ থেকে ১০ তারিখে হোসেনি দালান ঢাকা শহরের মূল আকর্ষণে পরিণত হয়। মুসলমান সম্প্রদায়ের শিয়া মতের লোকেরা এখানে সমবেত হয়ে ‘হায় হোসেন, হায় হোসেন’ বলে মাতম করতে থাকেন। আশুরার দিনে (১০ মুহররম) এখান থেকে বিশাল একটি তাজিয়া মিছিল বের করা হয়, যা নগরীর প্রধান প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে নগরীর পশ্চিম প্রান্তে প্রতীকীভাবে কারবালা নাম দেওয়া একটি স্থানে গিয়ে শেষ হয়।

পুরনো ঢাকা ছাড়াও নগরীর মোহাম্মদপুরে শিয়া মসজিদে ইমামবাড়া রয়েছে। কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলীয় উপজেলা অষ্টগ্রামে শতাব্দীর প্রাচীন ইমামবাড়া ও আশুরার নানা আনুষ্ঠানিকতার দেখা পাওয়া যায়।

অবিভক্ত বাংলার হুগলিতে শিয়া সম্প্রদায়ের বড় ধরনের বসতি আছে। হুগলির ইমামবাড়া একটি প্রসিদ্ধ ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। কলকাতার মেটিয়াবুরুজ এলাকায় শিয়া বসতি ও ইমামবাড়া রয়েছে। লক্ষ্ণৌর শেষ নবাব, শিয়া মতাবলম্বী, সংস্কৃতিবান ওয়াজির আলি শাহ ব্রিটিশদের দ্বারা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে কলকাতার মেটিয়াবুরুজে নির্বাসিত জীবন কাটান। তার বংশধারা থেকে কলকাতায় শিয়া সম্প্রদায়ের বিস্তৃতি ঘটে।

আপনার মতামত লিখুন :