Alexa

ঋণগ্রস্তকে জাকাত প্রদান: বাস্তবতা, তাৎপর্য ও বিধান

ঋণগ্রস্তকে জাকাত প্রদান: বাস্তবতা, তাৎপর্য ও বিধান

ঋণগ্রস্তকে জাকাত দানের বিষয়টি খোদ কোরআনে কারিমে স্পষ্ট বাক্য দ্বারা বর্ণিত হয়েছে। সূরা তওবার ৬০ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘জাকাত কেবল নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত ও তৎসংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের জন্য এবং যাদের চিত্ত আকর্ষণ করা উদ্দেশ্য তাদের খাতে, দাস মুক্তির খাতে, ঋণগ্রস্তদের উদ্দেশে, আল্লাহর পথে ও মুসাফিরদের জন্য। এটা আল্লাহর বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’

এখন প্রশ্ন হলো, অনেক কারণেই তো মানুষ ঋণ করেন। কেউ ব্যক্তিগত প্রয়োজনে, কেউ সামাজিক প্রয়োজনে আবার কেউ ব্যবসায়িক প্রয়োজনে। তাহলে এদের মধ্যে কাদেরকে প্রকৃত ঋণগ্রস্ত বলে ভাবা যাবে? যাদের যাকাতের টাকায় সহায়তা করা যাবে।

এ প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, ইসলামি স্কলারদের মতানুসারে তিন শ্রেণির ব্যক্তিকে, ‘গারিমিন’ তথা ঋণগ্রস্তদের আওতায় আনা যায়।

এক. নিজের প্রয়োজনে যারা ঋণগ্রস্ত হয়েছেন।
দুই. অন্যের প্রয়োজনে যারা ঋণগ্রস্ত হয়েছেন।
তিন. সমাজের স্বার্থে যারা ঋণগ্রস্ত হয়েছেন।

এই তিন শ্রেণির ব্যক্তিকে ঋণগ্রস্তদের খাতের আওতায় জাকাত দেওয়া যাবে। তবে বিষয়টি একটু ব্যাখ্যার দাবি রাখে।

নিজের প্রয়োজনে ঋণগ্রস্ত হওয়া
যখন কেউ নিজের মৌলিক প্রয়োজন পূরণের জন্য ঋণ নেয়, যেমন নিজের এবং যাদের ব্যয়ভার বহনের দায়িত্ব পালন করতে হয়, তাদের থাকা-খাওয়া, পোশাক-পরিচ্ছদ ও প্রয়োজনীয় লেখাপড়ার খরচাপাতি চালিয়ে নেওয়ার উদ্দেশে ঋণ নেয়, তখন তাকে শরিয়তের পরিভাষায় বলা হয়- ‘নিজের প্রয়োজনে ঋণগ্রস্ত।’ এই মর্মে প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আত তারগিব ওয়াত-তারহিব সঙ্কলক মুহাদ্দিস ইবনে জানজুওয়েহ (জন্ম ১৮০হি.-মৃত্যু ২৫১হি.) ইমাম মুজাহিদ থেকে বর্ণনা করে বলেন, তিন ব্যক্তি (কোরআনে কারিমে বর্ণিত) ঋণগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।

১. জলস্রোত যার সম্পদ ভাসিয়ে নিয়ে গেল (অর্থাৎ বন্যা, প্রবল বৃষ্টিপাত ইত্যাদির কারণে যার সম্পদ বিনষ্ট হলো)।
২. যার সম্পদ আগুনে পুড়ে ছাই হলো।
৩. যার কোনো সম্পদ নেই, কিন্তু পরিবার আছে এবং ঋণ করে করে সে তাদের ব্যয়ভার বহন করে।

সে হিসেবে বলা যায়- বন্যা, সাইক্লোন অথবা অন্যকোনো দুর্যোগের কারণে যাদের সম্পদ বিনষ্ট হয়ে যায়, মৌলিকভাবে ধনীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও সাময়িক সঙ্কট থেকে উদ্ধারের জন্য জাকাতের টাকা দিয়ে তাদের সাহায্য করা বৈধ। দুর্গতদের সহায়তার নিশ্চয়ই এ এক সুবর্ণ সুযোগ।

জাকাত নিয়ে গবেষণার ‘জাকাত বিষয়ক আন্তর্জাতিক শরিয়াহ বোর্ড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। জাকাত বিষয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে বোর্ডটির সিদ্ধান্ত সব মহলেই সমাদৃত। এই বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, উল্লিখিত ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিদের জাকাতের টাকা থেকে দেওয়া হলে, সে টাকা কেবল ঋণ আদায়ের জন্য ব্যয় করতে হবে। অন্যকোনো প্রয়োজনে ব্যয় করলে তা শুদ্ধ হবে না। বিষয়টি ঋণগ্রস্ত জাকাতগ্রহীতাকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে। হ্যাঁ, যদি ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি ঋণের কথা উল্লেখ না করে কেবল দরিদ্রতার কথা উল্লেখ করে জাকাত নেয় অথবা জাকাতদাতা তাকে ঋণগ্রস্ত হিসেবে নয় বরং দরিদ্র হিসেবে জাকাত দেয়, তবে লব্ধ টাকা উভয় উদ্দেশেই ব্যবহার করতে পারবে। -ফাতাওয়া ওয়া তাউসিয়াত, পৃষ্ঠা: ১২৬

অন্যের স্বার্থে ঋণগ্রস্থ হওয়া
কেউ কারও কাছ থেকে ঋণ নিলো। আর আপনি ওই ঋণের জিম্মাদার হলেন। অর্থাৎ যদি ঋণগ্রহীতা ঋণ আদায়ে ব্যর্থ হয়, তাহলে আপনি তা আদায়ের ব্যবস্থা করবেন বলে নিশ্চয়তা দিলেন, জিম্মাদারি নিলেন। এরপর দুর্ভাগ্যবশত যদি ওই ঋণ আপনাকেই আদায় করতে হয়- তাহলে এটাকেই বলা হবে অন্যের স্বার্থে ঋণগ্রস্থ হওয়া।

যারা উল্লিখিত কায়দায় অন্যের ঋণের বোঝা নিজের মাথায় নেন, তারা ব্যক্তিগতভাবে ধনী হওয়া সত্ত্বেও যাতে ওই ঋণ আদায় করতে গিয়ে সবকিছু খুইয়ে না বসেন, সে জন্য তাদেরকে জাকাত দিয়ে সহায়তা করা যাবে।

ঋণ নেওয়া দোষের কিছু নয়। হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও ঋণ নিতেন। আর ঋণগ্রহীতার স্বার্থে জিম্মাদার হওয়াও কল্যাণকর কাজ। অন্যথায় মানুষ ঋণ পাবে কি করে? তবে যদি জিম্মাদার বিপদে পড়ে যায়, তাহলে জাকাতের টাকা দিয়ে হলেও তাকে সাহায্য করার বিধান রয়েছে। নানাবিধ আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও অন্যের উপকার করার প্রেরণা যাতে বিলুপ্ত না হয়ে যায়, সে কারণে এই শ্রেণির ঋণগ্রস্তকে জাকাতের টাকা দিয়ে সাহায্য করার কথা বলা হয়েছে।

সমাজের স্বার্থে ঋণগ্রস্ত হওয়া
একটি সমাজে বসবাসরত লোকদের পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রাখার স্বার্থে যদি টাকা-পয়সা ব্যয় করতে হয়, বিষয়টি যে শুধু অনুমোদিত তা নয় বরং আপনি যদি এ ধরণের কল্যাণমূলক কাজ করতে যেয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন, তাহলে আপনি ধনী হলেও জাকাতের টাকা নিয়ে উক্ত ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন। - রাফিক ইউনুস আল মিসরি, জাকাতুদ্দুয়ুন: পৃষ্ঠা-৪৩

মৃতব্যক্তির ঋণ আদায়ে জাকাত
কোনো ব্যক্তি যদি ঋণগ্রস্ত অবস্থায় মারা যান এবং তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি ঋণ আদায়ের জন্য যথেষ্ট না হয়, তাহলে ওই ব্যক্তির ঋণ আদায়ের জন্য জাকাত দেওয়া যাবে বলে ইসলামি স্কলারদের কেউ কেউ মত দিয়েছেন।

জাকাত বিষয়ক আন্তর্জাতিক শরিয়াহ বোর্ডও এই মতের পক্ষে রায় দিয়েছেন। বোর্ডের এক ফতোয়ায় বলা হয়েছে, ‘জাকাতের সম্পদ থেকে মৃতব্যক্তির ঋণ পরিশোধ করা বৈধ, যদি তার রেখে যাওয়া সম্পদ তা আদায়ের জন্য যথেষ্ট না হয় এবং তার উত্তারাধিকারীরা তা আদায় করতে ব্যর্থ হয়। জাকাতের টাকায় ঋণ আদায় করার মাধ্যম্যে ঋণের বোঝা থেকে ব্যক্তিকে অব্যহতি দেওয়া হয় এবং ঋণদাতাদের সম্পদও রক্ষা করা হয়।

শেষোক্ত ফতোয়াটি যেহেতু আধুনিক সম্মিলিত ইজতিহাদের ফলাফল এবং বর্তমানে যেহেতু বায়তুল মাল থেকে মৃতব্যক্তির ঋণ আদায়ের কোনো ব্যবস্থা নেই; অতএব জাকাতের টাকা দিয়ে উল্লিখিত অবস্থায় মৃতব্যক্তির ঋণ আদায় করা যাবে না বলে হানাফি মাজহাবের যে প্রাচীন ফতোয়া আছে তা রিপ্লেস করা যায় কিনা, আশা করি বিজ্ঞ মুফতি সাহেবরা চিন্তা করে দেখবেন।

আপনার মতামত লিখুন :