হিসাব রক্ষক ও ফিল্ড সুপারভাইজার এখন সরকারি হজগাইড!

মুফতি এনায়েতুল্লাহ, বিভাগীয় প্রধান, ইসলাম, বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আসন্ন হজমৌসুমে সৌদি আরবে সরকারি হজযাত্রীদের প্রয়োজনীয় সেবাদানের জন্য ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ১৪৯ জন হজগাইডের চূড়ান্ত একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। তালিকায় হাজিদের গাইড হিসেবে নাম এসেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশেন বাংলাদেশের বিভিন্ন বিভাগীয় অফিসের পরিচালক, উপ-পরিচালক, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর, ফিল্ড সুপারভাইজার, মাস্টার ট্রেইনার ও হিসাব রক্ষকের।

প্রতি ৪৫ জন হজযাত্রীর জন্য একজন হজগাইড নির্বাচন করা হয়। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের একটি দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিটি হজগাইড নির্বাচন করেন। কিন্তু হজগাইড নির্বাচনে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করা হয় না। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অফিস, হাব ও বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তদবিরই হলো- হজগাইড নির্বাচনের অন্যতম মাপকাঠি। এভাবে অযোগ্য, অনভিজ্ঞদের হজগাইড নির্বাচনের কূফল পড়ে হাজিদের ওপর।

এক কথায়, হজগাইড নিয়োগে কোনো নিয়মনীতি মানা হচ্ছে না বলে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। যোগ্য ও শিক্ষিত আলেম ও ইসলামি ব্যক্তিত্বকে নিয়োগ না দিয়ে উপরোক্ত শ্রেণির লোকদের হজগাইড নিয়োগ করার কারণে হজযাত্রীরা গাইডের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

এবারের নিয়োগপ্রাপ্ত হজগাইডের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজযাত্রীদের দেখাশোনা করা, তাদের হজের কাজে সর্বাত্মক সহায়তা করা, মক্কা-মদিনা-মিনা-মুজদালিফা ও আরাফায় পথ প্রদর্শন ও দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য যে হজগাইড নিয়োগ দেওয়া হয়েছে; তার অধিকাংশই নতুন ও অনভিজ্ঞ। এমনকি তারা আরবি পড়তে ও লিখেতে জানেন না। যেখানে তারা নিজেরেই নতুন, সেখানে তারা হাজিদের কীভাবে সেবা দেবে তা বোধগম্য নয়।

বিগত হজ মৌসুমে দেখা গেছে, সরকারি নিয়োগপ্রাপ্ত এসব গাইডের অধিকাংশ আরবি জানেন না, এমনকি প্রয়োজনীয় ইংরেজিও না। ফলে তারা সৌদি আরবে হজ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন না। হজযাত্রীদের সমস্যাগুলো সৌদি হজকর্মী ও মোয়াল্লেমদের কাছে বিস্তারিত তুলে ধরতে পারেন না। ইশারা-ইংগিত আর সেই সঙ্গে আধো আরবি-ইংরেজি ও উর্দুর মিশেলে এমনভাবে কথা বলেন, তা আর বুঝার কোনো উপায় থাকে না। ফলে হজযাত্রীদের সমস্যার সমাধান না হয়ে সমস্যা আরও বাড়ে। হজযাত্রীরা উপকার বা কোনো সহায়তা পান না।

ভুক্তভোগী হজযাত্রী ও আলেম-ওলামারা বলেন, পূর্বঅভিজ্ঞতা ছাড়া একজন হজগাইড কোনো হজযাত্রীকে অর্থবহ সহযোগিতা করতে পারেন না। তাদের প্রশ্ন আরবি ভাষা না জানা গাইড হজযাত্রীদের কেনাকাটা, চলাফেরা ও রাস্তাঘাট চিনিয়ে দেওয়া এবং টাকা পয়সা লেনদেন কি সঠিকভাবে সহায়তা করবেন? তাদের মতে কী ধরণের মানদণ্ডের ভিত্তিতে সরকার হজগাইড নিয়োগ দিয়ে থাকেন- তা স্পষ্ট করা উচিত। এ ব্যাপারে একটি নীতিমালা অনুসরণ করা উচিত। কোনো ক্ষেত্রেই দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির ফল ভালো হয় না। হজগাইড মনোনয়নে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি হওয়া হজযাত্রীদের জন্য দুর্ভাগ্যের বিষয়। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

অভিজ্ঞদের মতে, একটি কাফেলার হজযাত্রীদের হজ নষ্ট করার জন্য একজন অনভিজ্ঞ গাইডই যথেষ্ট। আলেম-ওলামাদের মতে অতীতে হজযাত্রীদের জন্য বিমান ভাড়া, বাড়ি ভাড়া ও গাইড নিয়োগে অনেক রাজনীতি ও দুর্নীতি হয়েছে। গাইড মনোনয়নে মন্ত্রী, এমপি ও দলীয় প্রভাবশালীদের সুপারিশ ও দলের অযোগ্য আলেমদের ফ্রি সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কারণে অতীতে সৌদি আরবে বাংলাদেশি হজযাত্রীদের বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়েছে। এসব দিক বিবেচানায় হজগাইড নিয়োগে সরকারকে অধিকতর আন্তরিক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। অন্তত একবার হজ করেছেন এমন ব্যক্তিকে হজগাইড হিসেবে নিয়োগ দান, গাইডের বয়স ৫০ এর অধিক না হওয়া, উত্তম চরিত্রের অধিকারী হওয়া এবং আরবিতে পারদর্শীদের হজগাইড হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সুপারিশ করেছেন তারা।

জানা গেছে, হজগাইড নিয়োগ করার জন্য জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে প্রতিটি জেলায় একটি করে কমিটি রয়েছে। কমিটির বাছাইকৃত তালিকা ও সুপারিশ আমলে নিয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে গঠিত কেন্দ্রীয় কমিটি চূড়ান্তভাবে হজগাইড নিয়োগ দিয়ে থাকেন।

শুধু হজগাইড নয়, পবিত্র হজের সময় বাংলাদেশি হজযাত্রীদের সেবার জন্য একাধিক দল পাঠানো হয়। তারা সৌদি আরবের মক্কা-মদিনায় অবস্থান করে হজযাত্রী নানাবিধ সেবা দিয়ে থাকেন। নিঃসন্দেহে এটা একটা ভালো উদ্যোগ। কিন্তু হজযাত্রীদের সেবার জন্য বিভিন্ন দলে যাদের নাম বাছাই করা হয়- তাতে বড় রকমের দুর্নীতি হয় প্রতিবার।

হজের সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠান আলাদা আলাদা কয়েকটি দল গঠনে কাজ করেন। এই তালিকা তৈরি নিয়ে ব্যাপক তদবির হয়, সেই সঙ্গে রয়েছে এলাকাপ্রীতি, স্বজনপ্রীতি এবং অর্থ লেনদেনেরও অভিযোগ। কোনো দলের সদস্য হজের মৌসুমে সৌদি আরবে এক-দেড় মাস কাজ করার জন্য ৫/৬ লাখ টাকা থেকে শুরু করে কেউ কেউ ৭/৮ লাখ টাকা পর্যন্ত পান। আবার অনেকেই পান শুধুমাত্র বিনা খরচে হজের সুযোগ।

আপনার মতামত লিখুন :