ফিতরা: ইবাদত ও ঈদ আনন্দের উপলক্ষ



মুফতি মাহফূযুল হক, অতিথি লেখক

  • Font increase
  • Font Decrease

রমজানের শেষ সময়ে আবশ্যিকভাবে মাথাপিছু যে দান করা হয় তা ফিতরা নামে সমধিক পরিচিত। অবশ্য হাদিসে এ দানকে এ শব্দে আখ্যায়িত করা হয়নি। হাদিসের ভাষায় এ দানের নাম সদকাতুল ফিতর বা জাকাতুল ফিতর ইত্যাদি।

ফিতরা কার ওপর ওয়াজিব
প্রাপ্ত বয়ষ্ক মুসলিম ব্যক্তির মালিকানায় যদি আবশ্যকীয় প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঋণমুক্তভাবে যেকোনো ধরনের এমন পরিমাণের সম্পদ থাকে যার বাজারমূল্য সাড়ে বায়ান্ন ভরি (৬১২.৩০৭৫ গ্রাম) রুপার মূল্যের সমান (অর্থাৎ বর্তমান বাজারদর হিসেবে ৫৫ হাজার ১২৫ টাকা), তবে তার ওপর ফিতরা প্রদান করা ওয়াজিব। অতিরিক্ত ঘর-বাড়ি, বিছানা তৈজসপত্র, পোষাক, যানবাহন ইত্যাদির মূল্যও ধর্তব্য হবে।

কার কার ফিতরা দিতে হবে
উপরোক্ত নিয়মে যার ওপর ফিতরা প্রদান করা ওয়াজিব হবে সে ফিতরা দেবে নিজের এবং অপ্রাপ্ত বয়ষ্ক সন্তানদের।

অতএব, স্ত্রীর ফিতরা স্বামীর ওপর ওয়াজিব নয়। তবে স্বামী যদি স্বেচ্ছায় দিয়ে দেয় তাহলে স্ত্রীর ফিতরা আদায় হবে। অনুরূপভাবে, প্রাপ্তবয়ষ্ক সন্তানের ফিতরা পিতার ওপর ওয়াজিব নয়। পিতামাতার ফিতরা সন্তানের ওপর ওয়াজিব নয়। গৃহকর্মীর ফিতরা গৃহস্বামীর ওপর ওয়াজিব নয়। কর্মচারীর ফিতরা মালিকের ওপর ওয়াজিব নয়।

ফিতরার দ্রব্য ও পরিমাণ
ফিতরার পরিমাপক হিসেবে ৫টি খাদ্যদ্রব্যের নাম ও পরিমাণ হাদিসে নির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে। যথা- খেজুর, কিশমিশ, যব ও পনির মাথাপিছু ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম এবং গম মাথাপিছু ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম।

স্থানীয় প্রধান খাদ্যদ্রব্য যদি উক্ত ৫টি দ্রব্যের বাইরের কোনো কিছু হয় সেক্ষেত্রে উক্ত ৫টির কোনো একটিকে পরিমাপক ধরে তার সমমূল্যের স্থানীয় প্রধান খাদ্যদ্রব্য ফিতরা হিসেবে দেওয়া যাবে। উক্ত ৫টি দ্রব্যের কোনোটিকে পরিমাপক না ধরে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম স্থানীয় প্রধান খাদ্যদ্রব্যকে সরাসরি ফিতরা হিসেবে দেওয়া হয় তাহলে তার বাজারমূল্য যদি উক্ত ৫টির মধ্যে সর্বনিম্ন বাজারমূল্যের বেশি হয় তাহলে তো ফিতরা আদায় হবে। কিন্তু তা না হয়ে যদি ৫টির মধ্যে সর্বনিম্ন বাজারমূল্যেরও কম হয় তাহলে ফিতরা আদায় হবে না।

ফিতরা প্রদানের জন্য উক্ত ৫টি খাদ্যদ্রব্যের যেকোনো দ্রব্যকেই সরাসরি বিতরণ করা যাবে। আবার চাইলে গরিবের সুবিধা বিবেচনা করে তার ন্যায্য বাজারমূল্যও বিতরণ করা যাবে।

স্বাভাবিক কারণেই বাজারে উক্ত ৫ খাদ্যদ্রব্যের মূল্য সমান থাকবে না। বেশকম থাকবে। তাই মুস্তাহাব (উত্তম) হলো- প্রত্যেকেই তার অর্থনৈতিক সঙ্গতি বিবেচনা করে সাধ্যের সর্বোচ্চ দামী দ্রব্য দিয়ে ফিতরা আদায় করবে। সাহাবাদের আমলও তাই ছিল। আমাদের দেশে উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত হয়ে নিম্নবিত্ত পরিবার পর্যন্ত সকল শ্রেণির মানুষ গমের হিসেবে ফিতরা প্রদান করে থাকে– এটা ভুল প্রচলন, এটা সুন্নাহসম্মত কর্মপদ্ধতি নয়।

ফিতরা প্রদানের সময়
ফিতরা ওয়াজিব হয় ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময়। অতএব, এ সময়ের পূর্বে যে মারা যাবে তার ওপর ফিতরা ওয়াজিব নয়। আবার এ সময়ের পরে যে শিশুর জন্ম হবে তার ফেতরাও অভিভাবকের ওপর ওয়াজিব নয়।

ঈদের নামাজের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার আগেই বিতরণ করা হলো- ফিতরা আদায়ের প্রকৃত সময়। তবে কোনো কারণে এর মধ্যে বিতরণ করা সম্ভব না হলে পরেও বিতরণের সুযোগ থাকবে। আবার গরিবের সুবিধা বিবেচনা করে ঈদের আগেও ফিতরা অগ্রীম আদায় করা যায়। সাহাবাগণ থেকে এর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।

ফিতরা কাদের দিতে হবে
একেবারে নিঃস্বকে অথবা যার মালিকানায় ৫৫ হাজার ১২৫ টাকা মূল্যের প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো ধরনের সম্পদ নেই, যে নও মুসলিম ইসলাম গ্রহণের কারণে সম্পদহারা হয়ে গেছে তাকে, যে ঋণী ব্যক্তির প্রয়োজনের অতিরিক্ত এ পরিমাণ সম্পদ নেই যা বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করবে তাকে, দূর সফরে এসে যে ব্যক্তি অর্থাভাবে জীবন নির্বাহ করতে পারছে না ও পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারছে না তাকে, ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত যোদ্ধাকে।

এক জনের ফিতরা একাধিক জনকে দেওয়া যায় আবার কয়েক জনের ফিতরা একজনকেও দেওয়া যায়।

ফিতরার ফজিলত
হাদিসের ভাষ্যমতে ফিতরা প্রদানের কারণে মহান আল্লাহ রোজার অনাচ্ছিকৃত ভুলত্রুটিগুলো মার্জনা করেন। ফিতরা আর্থসামাজিক উপকার অনেক বড়। বিভিন্ন কারণে যারা অভাবি, ফিতরার প্রচলণের কারণে তারা ঈদের আনন্দে ও উৎসবে শরিক হওয়ার সুযোগ পায়। সামর্থ্যবানদের হাত থেকে সম্পদের উল্লেখযোগ্য একটি পরিমাণ অভাবিদের হাতে চলে যাওয়ায় আর্থসামাজিক ভারসাম্য অনেকটাই ফিরে আসে।