অশেষ ফজিলতপূর্ণ শাওয়ালের ৬ রোজা

মুফতি মাহফূযুল হক, অতিথি লেখক, ইসলাম

  • Font increase
  • Font Decrease

শেষ হয়েছে সিয়াম সাধনার মাস রমজান। যারা রমজান মাসের রোজা রেখেছেন, তারা যদি আরেকটু কষ্ট করে চলতি শাওয়াল মাসে আরও ৬টি রোজা রাখেন- তবে বিশাল ফজিলত লাভে সক্ষম হবেন।

হজরত নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি (পূর্ণ) রমজান মাস রোজা রাখবে অতঃপর শাওয়াল মাসে ৬টি রোজা রাখবে সে যেন পূর্ণ বছর রোজা রাখল।’ –সহিহ মুসলিম: ১১৬৪

পূর্ণ বছর রোজার সওয়াব লাভের ব্যাখ্যা
আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি সওয়াব নিয়ে আসবে সে তার কৃত কাজের দশ গুণ বেশি সওয়াব পাবে। আর যে ব্যক্তি পাপ নিয়ে আসবে তাকে শুধুমাত্র তার কৃত পাপেরই শাস্তি দেওয়া হবে। কোনো বাড়তি শাস্তি চাপিয়ে দিয়ে তার ওপর অত্যাচার করা হবে না।’ -সূরা আনআম: ১৬০

হজরত নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ যখন উত্তমরূপে ইসলামের ওপর কায়েম থাকে তখন সে যে সকল নেক আমল করে সেগুলোর প্রত্যেকটির বিনিময়ে তার আমলনামায় দশগুণ থেকে সাতশ’ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে সওয়াব লেখা হয়। আর সে যে সব মন্দ কাজ করে, সেগুলোর প্রত্যেকটির বিনিময়ে শুধুমাত্র তার কাজের সমপরিমাণ পাপ লেখা হয়।’ –সহিহ বোখারি: ৪২

ইমাম নববি রহমাতুল্লাহি আলাইহি মুসলিম শরিফের ব্যাখ্যাগ্রন্থে এবং তিরমিজির ব্যাখ্যাকার তুহফাতুল আহওয়াযিতে পূর্ণ বছরের সওয়াব লাভের ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, যেহেতু সওয়াব লেখা হয় ন্যূনতম ১০ গুণ বৃদ্ধি করে, সেহেতু রমজান মাস রোজা রাখলে ১০ মাস রোজা রাখার সওয়াব লেখা হবে। অতঃপর শাওয়াল মাসে ৬ দিন রোজা রাখলে ৬০ দিন অর্থাৎ ২ মাস রোজা রাখার সওয়াব লেখা হবে। এভাবে রমজানের রোজা রাখার পর শাওয়ালে ৬টি রোজা রাখলে (১০ মাস + ২ মাস= ১২ মাস) পূর্ণ বছর রোজা রাখার সওয়াব অর্জিত হবে।

পূর্ণ বছরের সওয়াব লাভের শর্ত
ইসলামের ওপর উত্তমরূপে কায়েম থাকা। -সহিহ বোখারি: ৪২
অর্থাৎ জীবনযাপনে সকল হারাম ও নাজায়েজ থেকে বিরত তো থাকতে হবেই। সেইসঙ্গে শুধুমাত্র জায়েযের ওপর থাকলে হবে না বরং দ্বীন-দুনিয়ার প্রতিটি কাজে সুন্নত-মোস্তাহাবকে মেনে চলার আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে।

মাসয়ালা
১. শাওয়ালের প্রথম দিন অর্থাৎ ঈদের দিন রোজা রাখা হারাম। তাই ৬ রোজা রাখতে হবে ঈদের পর।

২. এই ছয় রোজা ঈদের পরের দিন থেকেই রাখা যায়। আবার বিলম্ব করে শাওয়াল মাসের শেষের মাঝের দিকে অথবা শেষের দিকেও রাখা যায়। অর্থাৎ শাওয়ালের মধ্যে সুবিধামতো যেকোনো সময় রাখা যায়।

৩. শাওয়ালের ছয় রোজা একাধারেও রাখা যায়, আবার নিজের সুবিধামতো বিরতি দিয়ে দিয়েও রাখা যায়।

৪. শাওয়াল মাসের ৬ রোজা নফল বা মোস্তাহাব।

কাজা রোজা ও শাওয়ালের রোজা একত্রে রাখা
অনুমোদিত বিভিন্ন কারণেই রমজানের রোজা কাজা হতে পারে। পূর্ণ বয়ষ্ক নারীদের ক্ষেত্রেতো এটা স্বাভাবিক ব্যপার। এ ক্ষেত্রে অনেক নারীই দ্বিধায় থাকেন, রমজানের কাজা রোজার নিয়ত ও শাওয়ালের রোজার নিয়ত একত্র করে একসঙ্গে রোজা রাখলে কাজা ও শাওয়াল উভয়টাই আদায় হবে? নাকি একটা আদায় হবে? শাওয়ালের রোজার সওয়াব পাওয়া যাবে কিনা?

এ প্রশ্নের উত্তর বা সংশয়ের সমাধান হাদিসে সরাসরি দেওয়া নেই। তাই ইজতিহাদ করে সমাধান বের করতে যেয়ে আলেমদের মতপার্থক্যের সৃষ্টি হয়েছে।

কারও মতে কাজা ও শাওয়াল উভয়টাই একসঙ্গে আদায় হবে এবং কাজা আদায় হওয়ার পাশাপাশি শাওয়ালের ফজিলতও পাওয়া যাবে। তাদের যুক্তি হলো- একটি আমলে সুযোগ সাপেক্ষে একাধিক নিয়ত শরিয়তে গ্রহণযোগ্য। যেমন- কোনো ব্যক্তির পড়শি যদি তার রক্তের আত্মীয় হয় তাহলে তাকে উপহার দেওয়ার সময় সে যদি মুসলিম ভ্রাতৃত্ব রক্ষার, আত্মীয়তা রক্ষার ও পড়শির হক রক্ষার নিয়ত করে নেয় তাহলে সে একটি আমলে পৃথক পৃথক ৩টি আমলের সওয়াব পায়।

অনুরূপভাবে শাওয়াল মাসের মধ্যে রোজা রাখতে যেয়ে যদি রমজানের কাজার নিয়ত করে আবার শাওয়ালের ফজিলতেরও নিয়ত করে তবে সে এক রোজায় পৃথক পৃথক ২টি উপকার ভোগ করবে। কাজাও আদায় হবে আবার শাওয়ালের ফজিলতও পাবে।

আবার কোনো কোনো আলেমের মতে শাওয়াল মাসের মধ্যে রমজারে কাজা ও শাওয়ালের ফজিলত উভয়টার নিয়ত একসঙ্গে করে রোজা রাখলে শুধুমাত্র রমজানের কাজা আদায় হবে। এভাবে দ্বৈত নিয়তে রোজা রাখার দ্বারা শাওয়ালের ফজিলত পাওয়া যাবে না। ফজিলত পেতে হলে কাজা রোজা ও শাওয়ালের রোজা পৃথক পৃথকভাবে রাখতে হবে।

নিজেদের মতের স্বপক্ষে যুক্তি দিতে যেয়ে তারা বলেন, হাদিসে শাওয়ালের ফজিলত বলতে যেয়ে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের রোজা রাখা এবং শাওয়ালের ছয় রোজা রাখার মাঝে ‘সুম্মা’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। আরবি ব্যাকরণের ভাষায় যার নাম হরফুল আতফ। আর ব্যাকরণের নিয়ম হলো- হরফুল আতফের আগের জিনিস ও পরের জিনিস পৃথক পৃথক হবে। এ থেকে বুঝা যায়, রমজানের রোজা ও শাওয়ালের রোজা পৃথক পৃথকভাবে রাখতে হবে। দু’নিয়তে একসঙ্গে রাখলে হবে না, উপরন্তু তারা আরও বলেন, মুহাদ্দিসরা (হাদিস বিশারদ) শাওয়ালে রোজার পূর্ণ বছরের সওয়াব লাভের যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, এ রোজা আলাদাভাবে রাখতে হবে। দু’নিয়তে একসঙ্গে রাখলে তো রোজার সংখ্যা কমে যাচ্ছে। তখন তো আর ফজিলতের উক্ত ব্যাখ্যা মিলবে না।

সর্বোপরি মহান আল্লাহই অধিক জ্ঞাত কোন মতটি শুদ্ধ। তবে আমাদের কাছে দ্বিতীয় মতটি অধিক যুক্তিযুক্ত মনে হয় এবং সতর্কতার দাবিও এটাই। তাই আমাদের পরামর্শ হলো- রোজা আলাদা আলাদা রাখা।

আপনার মতামত লিখুন :