বেলজিয়ামের মূলস্রোতে মিশে আছেন মুসলমানরা

দীর্ঘ ৩২ বছর পর বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট ব্রাজিলকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো সেমিফাইনালে উঠেছে বেলজিয়াম। ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সঙ্গে হেরেছিল বেলজিয়াম। বেলজিয়ামের খেলোয়াড়দের কীর্তি এখন ফুটবলবোদ্ধাদের মুখে মুখে।

বেলজিয়াম দলে বেশ কয়েকজন মুসলিম খেলোয়াড় রয়েছেন। তারা হলেন- মারুয়ানে ফেলাইনি, মুসা ডেম্বেলে, নাসের চাডলি, আদনান জানুজাই ও  এডেন হ্যাজার্ড। এই এডেন হ্যাজার্ড এবারের বিশ্বকাপে বেলজিয়াম স্কোয়াডের সেনাপতির দায়িত্ব পালন করেছন।

আসলে খেলাধুলায় ধর্মানুসরণ কোনো বিষয় নয়, খেলা খেলাই। মাঠের পারফরম্যান্সই এখানে মূল বিষয়। খেলা নিয়ে ইসলামের আলাদা দৃষ্টিভঙ্গিও রয়েছে। এখানে বিষয়টি উল্লেখ করার কারণ হলো- বেলজিয়ামের মুসলমানরা দেশটির মূলস্রোতের সঙ্গে যে মিশে আছেন- এটা বুঝানোর। এটা অবশ্য ভিন্ন প্রসঙ্গ।

যাই হোক, বাংলাদেশের চেয়ে ছোট দেশ বেলজিয়াম। আয়তন মাত্র ৩০ হাজার ২৫৮ কিলোমিটার। জনসংখ্যা সোয়া কোটির কাছাকাছি। বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলস, ইউরোপের রাজধানীও ব্রাসেলস। অর্থাৎ ইউরোপিয়ান কমিশন, ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট ও ন্যাটোর নর্থ আটলান্টিক ট্রিয়েটি অর্গানাইজেশন সদর দপ্তর অবস্থিত এই শহরেই।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রায় পাঁচ কোটি মুসলিম বসবাস করেন। তন্মধ্যে বেলজিয়াম, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড এবং স্পেনে মুসলমানদের সংখ্যা বেশি। ১৯৯০ এর পর ইউরোপজুড়ে যত জনস্যংখা বৃদ্ধি পেয়েছে তার শতকরা ৬০ ভাগই মুসলমান। এভাবে মুসলিম জনসংখ্যার হার বাড়তে থাকলে ২০২৮ সাল নাগাদ পুরো ইউরোপব্যাপি মুসলমানের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াবে দশ কোটিতে!

/uploads/files/cgZW8yvOtv7YmwLQXE9gPybgKA3GOETsmeI4yZEd.jpeg

ইউরোপীয় সমাজে মুসলমানদের চলাফেরা, পরিবারের প্রতি আস্থা, দর্শন, বিশ্বাস ও জীবনাচারের প্রতি মুগ্ধ হয়ে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা ইসলামের দিকে ঝুঁকছে। এভাবে ধর্মান্তর ও জন্মাহারের প্রেক্ষিতে ধীরে ধীরে ইউরোপে মুসলিম পরিবারের সদস্য সংখ্যা বাড়ছে। ফলে তারা সংখ্যায় বাড়ছে, তাদের সংস্কৃতি প্রসারিত হচ্ছে। বাজারে হালাল খাবারের দোকান বাড়ছে, রাস্তায় ইসলামি পোষাকে মুসলিম নারী-পুরুষদের আগের তুলনায় চেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। এর প্রভাব ইউরোপীয় সমাজের ব্যাপকভাবে দৃশ্যমান। ধীরে ধীরে মুসলিম কৃষ্টি-কালচার, শিক্ষা ও সংস্কৃতি সমাজের মূলস্রোতে প্রভাব সৃষ্টি করছে।

ইউরোপের দেশ বেলজিয়ামের কথা ধরা যাক। কিছুদিন আগে বেলজিয়ামে মোট জনসংখ্যার শতকরা পনোর জন ছিলো মুসলমান। বর্তমানে জন্ম নেওয়া প্রতি একশ জন শিশুর মধ্যে ২৫ জনই হলো- মুসলিম বাবা-মার সন্তান। বেলজিয়াম সরকারের স্বাস্থ্যদপ্তরের তথ্য আর পরিসংখ্যান এটা বলছে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী আগামি ২০২৫ নাগাদ বেলজিয়ামে মুসলিম জনসংখা দাঁড়াবে দেশের মোট জনসংখার এক তৃতীয়াংশে।

বেলজিয়ামের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে মুসলমানদের সম্পর্কে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষণীয়। পিউ রির্সাচ সেন্টারের এক জরিপে দেখা গেছে, ২০ শতাংশ জনগণ মুসলমানদের তাদের জন্য হুমকি হিসেবে এবং ৩২ শতাংশ জনগণ মুসলমানদের জাতীয় ধন হিসেবে গণ্য করে। এছাড়া সেদেশে মুসলমানদের উপস্থিতি সম্পর্কে ২৮ শতাংশ জনগণ একেবারেই উদাসীন। বাকীরা মনে করেন, মুসলমানরাও এ দেশের নাগরিক। বেলজিয়ামের সংস্কৃতি, আইন ও সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে যে কেউ দেশটিতে বসবাসের অধিকার রাখে। এটা নিয়ে তাদের আলাদা কোনো মন্তব্য নেই।

২০১১ সালের জুলাইয়ে বেলজিয়ামে নেকাব নিষিদ্ধ হয়। অর্থাৎ কোনো নারী তার পুরো মুখ কাপড়ে ঢেকে রাখতে পারবে না। এটা নিয়ে মুসলমানদের মাঝে কিছুটা অস্বস্তি রয়েছে। আর মাঝে-মধ্যে ঘটে যাওয়া কিছু সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা মুসলমানদের বিপাকে ফেলে। কিন্তু বেলজিয়ামের সাধারণ মুসলমানদের সন্ত্রাসবিরোধী কঠোর অবস্থানের দরুণ তা প্রতিষ্ঠিত হয় না, অহেতুক কেউ অভিযোগের আঙুল উঠাতে সক্ষম হয় না। বিষয়গুলোকে রাজনৈতিক সঙ্কট হিসেবেই দেখা হয়।

/uploads/files/RqrL8KmhlrEJWC8BOxezTJQMqFA78yLzAqhsBC19.jpeg

২০১৬ সালে বেলজিয়ামের মুসলমানদের জন্য শিল্প-সাংস্কৃতিক সেন্টার চালু করা হয়েছে। সাংস্কৃতিক সেন্টারটি রাজধানী ব্রাসেলসের মুলিনবিক এলাকায় অবস্থিত। এর নির্মাণ কাজ এখনও শেষ হয়নি। পুরোদমে সেন্টারটি নির্মাণ ও চালু করতে ৪ বছরে মতো সময় লাগতে পারে। এতে খরচ হবে প্রায় ৭ লাখ ইউরো। পরিকল্পনামতো যদি ২০২০ সালের মধ্যে শিল্প-সাংস্কৃতিক সেন্টারটি চালু হয়, তাহলে এটাই হবে বেলজিয়ামের মুসলমানদের জন্য এমন প্রথম প্রতিষ্ঠান। যা মুসলমানদের অর্থায়নে নির্মাণ করা হচ্ছে।

বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসের সান কনটেইনার পার্কে অবস্থিত মসজিদটি সেদেশের প্রাচীনতম ও ঐতিহ্যবাহী মসজিদ। এটাকে বেলজিয়ামের গ্রেট মসজিদ বলা হয়। মসজিদটির গোড়াপত্তন হয় ১৮২৯ সালে। তবে বর্তমান ভবনটি নির্মিত হয় ১৯৬০ সালে। মসজিদ সংলগ্ন ইসলামিক সেন্টার বেলজিয়ামের মুসলমানদের অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণ করে। যেমন, দেশের বিভিন্ন স্থানে নামাজখানা নির্মাণে সরকারের অনুমতি গ্রহণে সহায়তা, ইসলামি বই-পুস্তক প্রকাশ, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের সেমিনার ও সংলাপের আয়োজন ইত্যাদি।

মাল্টিকালারের দেশ বলা হয় বেলজিয়ামকে। ছয় হাজারের মতো বাংলাদেশি রয়েছেন বেলজিয়ামে। অ্যন্টারপেন শহরে বাংলাদেশিদের পরিচালনায় দু’টো মসজিদ রয়েছে। রোজার সময় দুই মসজিদে তারাবি হয়, মুসল্লিদের ইফতার করানো হয়, ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। যদিও এই দুই মসজিদের মুসল্লি বেশি আরব আর আফ্রিকান মুসলিম প্রবাসীরা। এবার বেলজিয়ামের মুসলমানরা প্রায় আঠারো ঘণ্টা রোজা পালন করেছেন।

হজ বিষয়ে জানতে আরও পড়ুন

** হজ: আল্লাহপ্রেমিকদের মিলনমেলা

** হিসাব রক্ষক ও ফিল্ড সুপারভাইজার এখন সরকারি হজগাইড!

** শ্রেষ্ঠ আমল হজ, বিনিময়ে জান্নাত

** নারীদের ওপর কখন হজ ফরজ?

** যেসব পদ্ধতিতে হজ আদায় করা যায়

** বদলি হজের লোক বাছাইয়ে সর্তক থাকুন

ইসলাম এর আরও খবর