কানাকানি যখন পাপের কারণ

মুফতি মুহাম্মদ তাসনীম, অতিথি লেখক, ইসলাম

  • Font increase
  • Font Decrease

আল্লাহতায়ালা কোরআনে কারিমে মুমিনদের পরামর্শ দিয়ে বলছেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা যখন কানাকানি করো, তখন পাপাচার, সীমালঙ্ঘন ও রাসূলের অবাধ্যতার বিষয়ে কানাকানি করো না, বরং অনুগ্রহ ও আল্লাহভীতির ব্যাপারে কানাকানি করো; আল্লাহকে ভয় করো, যার কাছে তোমরা একত্রিত হবে।’ -সূরা মুজাদিলা: ০৯

এর পরের আয়াতে আল্লাহতায়ালা মুনাফিকদের এমন কানাঘুষাকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে উৎসারিত বলে উল্লেখ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘এই কানাঘুষা তো মুমিনদের দুঃখ দেওয়ার জন্যে শয়তানের কাজ। তবে আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত সে তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না; মুমিনদের উচিত আল্লাহর ওপর ভরসা করা।’ -সূরা মুজাদিলা: ১০

বস্তুত শয়তান মুনাফিকদের কানাঘুষায় জড়িত করে, যাতে ঈমানদাররা ব্যথিত হন ও তাদের হৃদয় যেন পেরেশান হয়। কিন্তু মুমিনদের জানা উচিত, অস্তিত্বের জগতে ঘটনা প্রবাহের মূল নিয়ন্ত্রক ও কার্যকারক হলেন সৃষ্টিবর্তা আল্লাহ। আল্লাহ না চাইলে কেউই মানুষের কোনো ক্ষতি করতে পারে না। তাই মুমিনদের উচিত কেবল আল্লাহর ওপর ভরসা করা এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো কিছুকেই ভয় না করা। তারা আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সব সঙ্কটকেই মোকাবেলা করতে সক্ষম।

অর্থাৎ মুমিনরা সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর আস্থা রেখে শয়তানের অনুসারীদের ভয়াবহ সব ষড়যন্ত্রকে বানচাল করতে পারেন। এটা যুগে যুগে প্রমাণিত সত্য।

ঐতিহাসিক বর্ণনায় জানা যায়, একবার হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদের পাশে এক বড় চত্বরে বসেছিলেন। তার পাশে বসেছিলেন একদল সাহাবি। তারা রাসূলকে ঘিরে এমনভাবে বসেছিলেন, যে নতুন কেউ ওই মজলিসে আসলে তাকে জায়গা দেওয়ার জন্য অন্য কাউকে সরে বসতে হবে। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবিদের খুব শ্রদ্ধা করতেন।

সেদিনের ওই মজলিসে হাজির ছিলেন বদর যুদ্ধে অংশ নেওয়া অনেকেই। তারা মজলিসের সবার উদ্দেশ্যে সালাম দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো এবং বসার জায়গা পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো। কিন্তু কেউ সরে বসে তাদের জায়গা দিলেন না। এ ঘটনায় নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুব বিব্রত ও লজ্জিত হলেন। বেশি ভিড় হওয়ার কারণে তিনি তার আশপাশের কিছু মানুষকে উঠে দাঁড়াতে বললেন, যাতে ওই মুজাহিদরা মজলিসে বসতে পারেন। জিহাদ ও ঈমানে অগ্রবর্তী মুসলমানদের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো এবং আদব-কায়দা শেখানোর জন্যই নবী করিস (সা.) ওই আদেশ দিয়েছিলেন।

কিন্তু ওই ঘটনায় যে কয়জন সাহাবি জায়গা থেকে সরে দাঁড়ান, তাদের কাছে বিষয়টি পছন্দ হয়নি। ফলে নাজিল হয় সূরা মুজাদিলার ১১ নম্বর আয়াত। ওই আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! যখন তোমাদের বলা হয়, মজলিসে স্থান প্রশস্ত করে দাও, তখন তোমরা স্থান প্রশস্ত করে দিয়ো, আল্লাহ তোমাদের জন্যে স্থান প্রশস্ত করে দেবেন, যখন বলা হয় উঠে যাও, তখন উঠে যেয়ো, তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার এবং যারা জ্ঞানপ্রাপ্ত, আল্লাহ তাদের মর্যাদা উচ্চ করে দেবেন, আল্লাহ খবর রাখেন যা কিছু তোমরা করো।’

কোনো বিশেষ বা গোপন সামরিক বৈঠক ছাড়া সাধারণ কোনো মজলিসে নবাগত বা অন্যদের স্থান করে দেওয়া ইসলামি নৈতিক শিক্ষার অংশবিশেষ। সাধারণ মজলিসে নবাগত কেউ আসামাত্র তার জন্য জায়গা করে দেওয়া স্বাভাবিক ভদ্রতা ও শিষ্টাচারের দাবি। তাই পরে উপস্থিত ব্যক্তিকে বিনা কারণে বসতে দিতে দেরি করাটা আগে উপস্থিত ব্যক্তিদের জন্য কলঙ্কজনক অভদ্রতা হিসেবে বিবেচিত হয়।

আল্লাহতায়ালা ওই আয়াতে এটাও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, কেউ যদি অন্যদের কাজে সুবিধা করে দেয়; তাহলে আল্লাহতায়ালাও তার জন্য নানা ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থা সৃষ্টি করবেন। অবশ্য কোনো কোনো সময় মজলিসে অস্বাভাবিক মাত্রায় ভিড় দেখা দেয়। আর এক্ষেত্রে কারো কারো উচিত বসার স্থান থেকে উঠে দাঁড়িয়ে যাওয়া যাতে মজলিসে পরে আসা মেহমান বা অপেক্ষাকৃত বেশি সম্মানিতরা বসতে পারেন।

কারণ এমনও হতে পারে, পরে আসা সম্মানিত ব্যক্তিরা অনেক দূর থেকে হেঁটে আসার কারণে বা দীর্ঘ ভ্রমণের কারণে কিংবা বয়স্ক হওয়াসহ অন্য কোনো কারণে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। তাই তাদের জন্য বসে বিশ্রাম নেওয়া অন্যদের চেয়ে বেশি জরুরি। কেউ যদি সম্মানিত ব্যক্তিদের সম্মান দেখিয়ে তাদেরকে মজলিসে বসতে দেওয়ার জন্য নিজের বসার জায়গাকে তাদের জন্য ছেড়ে দেন, তাহলে আল্লাহ তাকে বড় পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার এবং যারা জ্ঞানপ্রাপ্ত, আল্লাহ তাদের মর্যাদা উচ্চ করে দেবেন।’

সূরা মুজাদিলার শেষ আয়াতে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে, ‘যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, তাদের আপনি আল্লাহ ও তার রাসূলের বিরুদ্ধাচরণকারীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে দেখবেন না, যদিও তারা তাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা জ্ঞাতি-গোষ্ঠী হয়; তাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লেখে দিয়েছেন এবং তাদের শক্তিশালী করেছেন তার অদৃশ্য শক্তি দ্বারা; তিনি তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করবেন, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, তারা তথায় চিরকাল থাকবে; আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। তারাই আল্লাহর দল; জেনে রাখো, আল্লাহর দলই সফলকাম হবে।’

অর্থাৎ কোনো মুমিনের হৃদয়ে কখনও একই সময়ে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও আল্লাহর শত্রুদের প্রতি ভালোবাসা থাকতে পারে না।

আপনার মতামত লিখুন :