হজের সফরে যেসব স্থানে কষ্ট ও ঝগড়া হয়



মুফতি অহিদুল আলম, অতিথি লেখক, ইসলাম

  • Font increase
  • Font Decrease

হজ ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। হজে রয়েছে ঈমানি উদ্দীপনার বিরাট উৎস। এর ঐতিহাসিক পটভূমি ও ফজিলত সম্পর্কে প্রতিটি মুসলমান কমবেশি অবগত।

হজে রয়েছে মুমিনের জন্য প্রচুর কল্যাণ। একজন মুমিন একটা সময়ের জন্য আত্মীয়-স্বজন, ঘরবাড়ি ও ব্যবসা-বাণিজ্য ত্যাগ করে দীর্ঘ সফরের কষ্ট স্বীকার করে হজব্রত পালন করতে পারে তখনই যখন তার অন্তর আল্লাহভীতি ও ভালোবাসায় পূর্ণ হয়। তাই হজের প্রথম ও প্রধান কল্যাণ হলো- হজব্রত পালনের মাধ্যমে হাজি সাহেবরা অন্তরে নতুন করে অর্জন করে হৃদয়ের সজীবতা, প্রেমের উষ্ণতা এবং ঈমানের দৃঢ়তা।

হজের সফরে যেহেতু ঘর-বাড়ি ছেড়ে, ভিন্ন পরিবেশে, ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের সঙ্গে থাকতে হয়, তাই কিছুটা কষ্ট করতে হয়। অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা গেছে, হজের সফরে এমন কিছু স্থান রয়েছে যেখানে কষ্ট হয়, আর সেই কষ্টের কারণে অনেক মেজাজ চড়া হয়ে যায়, ফলশ্রুতিতে ঝগড়ার সৃষ্টি হয়। হজপালনকারীদের একান্ত কর্তব্য হলো- কষ্টের এ জায়গাগুলোতে ধৈর্য্যধারণ করা, কোনোভাবেই ঝগড়ায় লিপ্ত না হওয়া।

কষ্টের স্থানসমূহ
১. সমগ্র দুনিয়া থেকে হজকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট কিছু দিনের মধ্যে জেদ্দা অথবা মদিনা এয়ারপোর্টে হজপালনকারীরা অবতরণ করেন। তাই এয়ারপোর্টের সব কাজে অস্বাভাবিক ভিড় হয়।

২. কাবা শরিফের চত্বর (মাতাফ), মসজিদে হারাম, সাফা-মারওয়া, মদিনা শরিফ, মসজিদে নববি ও রওজা শরিফ নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা অবস্থিত হওয়ায় হজের ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত ও মুস্তাহাব আমলগুলো একসঙ্গে করতে যেয়ে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়- সুতরাং এখানে একটু কষ্ট হয়।

৩. মিনা, আরাফা ও মুজদালিফায় একই দিনে একই স্থানে ৩০-৩২ লাখ মানুষ জমা হওয়া ও আসা-যাওয়া করতে গাড়ীতে কষ্ট হয়, পথে যানজটের সৃষ্টি হয়। কখনও যান্ত্রিক গোলোযোগ দেখা দেয়, দূর্ঘটনাও ঘটে। তাই স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এখানে ৫-৬ গুণ সময় বেশি লাগে। ইহরাম অবস্থায় এখানে কষ্ট হয়। তাই সাবধানে থাকা।

৪. সৌদি আরবের আবহাওয়া বিশেষ করে মক্কা, মিনা, আরাফা ও মুজদালিফার তাপমাত্রা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি রুক্ষ্ম। রোদের তাপ ও গরমে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাই চলাফেরায় ছাতা রাখা, প্রচুর পরিমাণে পানি পান করা।

৫. হজের সফরে মক্কা ও মদিনার সব কাজকর্মের জন্য সৌদি মুয়াল্লিমের দারস্ত হতে হয়। অনেক মুয়াল্লিমের অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার কারণে অবর্ণনীয় কষ্ট করতে হয়। এসব কারণে পরিস্থিতি বুঝা, মেজাজ ঠাণ্ডা রাখা।

৬. ফাইভ স্টার হোটেলসহ বিলাসবহুল হোটেল মক্কা-মদিনাতে অনেক আছে। কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। অন্য স্থানের হোটেলের মতো এসব হোটেলে সব সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায় না। অধিকাংশ হাজি সাধারণ হোটেল বা বাড়িতে থাকেন। কিছু কিছু হোটেল বা বাড়ি এত নিম্নমানের যে- এসি, বাথরুম বা অন্যান্য বিষয়ে হাজিদের কষ্ট পোহাতে হয়।

৭. মক্কা ও মদিনার সব হোটেলে রান্না করার অনুমতি নেই। অনেক দূর থেকে কষ্ট করে খাবার পৌঁছানো হয়। নামাজের জামাতের আগে পরে ভিড় না কমা পর্যন্ত খাবার সরবরাহ করা যায় না। আবার কখনও পুলিশের যন্ত্রণা পোহাতে হয়। এমনকি আইনের খেলাফ হলে পুলিশ অনেক সময় খাবার ফেলে দেয়। তাই যথাসময় খাবার না পৌঁছানোর কারণে কষ্ট হয়।

অন্যদিকে নিম্নরুচিবোধসম্পন্ন, অতিলোভী এজেন্সি বা দায়িত্বশীলের পরিকল্পিত কৃত্রিম সঙ্কটও অনেক সময় কষ্টের কারণ হয়।

/uploads/files/OaydYvxSq2SATQ9Gi9jS2VECkq95m4IsdfPQC9jV.jpeg

যে সব স্থানে ঝগড়া হওয়ার সম্ভাবনা থাকে
হজ আল্লাহতায়ালার এমন একটি ব্যতিক্রমী বিধান- যার পবিত্রতা ও সুমহান মর্যাদা সুরক্ষার জন্য তিনি সকল প্রকার অশ্লীলতা, গালি-গালাজ, ঝগড়া ও মারামারি করা হতে কঠিনভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন।

হজের সফরের নিম্নোক্ত স্থানে সাধারণত ঝগড়া বেশি হয়। তাই এমন স্থানগুলো একটি ধারণা দেওয়া হলো- যাতে সতর্কতা অবলম্বন করা যায়।

১. যারা হজের প্রশিক্ষণ নেয় না, কোনো আল্লাহওয়ালার সান্নিধ্যে যায় না, তাবলিগ জামাতে সময় লাগায় না, হজের মাসয়ালা-মাসয়েলের ওপর পড়াশুনা করে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের অবান্তর ও অন্যায় আচরণ দ্বারা হজের সফর কলুষিত হয়।

২. দুর্ভাগ্যক্রমে কোনো প্রতারক, ঠকবাজ এজেন্সির মাধ্যমে হজে গেলে তার কষ্টের শেষ থাকে না। তাই তাদের সস্তা প্রলোভন ও চটকদার কথায় আকৃষ্ট না হয়ে বরং টাকা কিছু বেশি গেলেও যথাসম্ভব নির্ভরযোগ্য এজেন্সির মাধ্যমে হজে যেতে হবে।

৩. কম টাকার প্যাকেজে গিয়ে যে সব সম্মানিত হাজি বেশি সুযোগ-সুবিধা নিতে চান, তাদের দ্বারা সাধারণত ঝগড়াটা বেশি হয়। কখনও ঝগড়া মারামারির পর্যায়ে চলে যায়।

. বাংলাদেশ থেকে প্রথমে মক্কা অথবা মদিনার হোটেলে উঠার পর। হোটেল, সীট বা ওয়াশরুম পছন্দ না হওয়ার কারণে অথবা দূরত্বের কারণে।

৫. ফিতরা অর্থাৎ শিফটিয় পদ্ধতির হজ যাত্রীরা ঝগড়া সৃষ্টি করে। হজের সময় মক্কার পার্শ্ববর্তী এলাকা আজিজিয়া, শওকিয়া, কাকিয়া বা অন্যকোনো দূরের হোটেলে যখন তাদেরকে দেওয়া হয়।

৬. খাবার নিয়ে। সুস্থ-অসুস্থ, বিভিন্ন স্বভাব ও মানসিকতার লোকেরা হজে যান, প্রত্যেকের রুচিসম্মত খাবার পরিবেশন করা কোনোভাবেই সম্ভব হয় না। তাই নিজের ঘরের কথা খেয়াল করা উচিৎ। সবদিন চাহিদামতো খাবার নিজের ঘরেও হয় না। মক্কা-মদিনাতে খাবার পাকানো ও হোটেলে পৌঁছানো একটি জটিল কাজ।

৭. মক্কা ও মদিনার হোটেলে পান করার পানি নিয়ে ঝগড়া হয়। অথচ কাবা শরিফ এবং মসজিদে নববিতে পর্যাপ্ত জমজম পানির ব্যবস্থা আছে। প্রতি নামাজের ওয়াক্তে একটি বোতল ভরে আনা যায় অথবা প্রয়োজনে সামান্য কিছু রিয়াল দিয়ে পানি ক্রয় করা যায়।

৮. নাস্তা নিয়ে। বাবুর্চিরা দুপুর এবং রাতের খাবার পাকাতে পাকাতে এবং সবকিছু গোছাতে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তাই সকালে ঘুমায়। এজন্য সকালের নাস্তা তৈরি করতে সাধারণত তারা রাজি হয় না। অন্যদিকে হোটেলওয়ালারাও বিভিন্ন কারণে অনেক লোকের নাস্তা পার্সেল দিতে বিরক্তবোধ করে। এসব বিবেচনায় নিজ দায়িত্বে নাস্তা করতে পারলে ভালো হয়।

৯. মক্কা শরিফ থেকে মিনার উদ্দেশ্যে যাওয়ার সময় ঝগড়া সৃষ্টি হয়। মিনা থেকে আরাফার উদ্দেশ্যে। আরাফা থেকে মুজদালিফার উদ্দেশ্যে গাড়ীতে উঠা নিয়ে, গাড়ীর সীট সামনে ও পেছনে নিয়ে এবং পছন্দমতো সীট না পাওয়াকে কেন্দ্র করে কখনও কখনও তুমুল বাকযুদ্ধ ও ঝগড়া হয়।

মনে রাখবেন, সৌদি আরবের রাস্তাগুলো অনেক মসৃণ ও সুন্দর। গাড়ীর পেছনে বসলেও কোনো কষ্ট হয় না। মক্কা ও মদিনা শরিফে যাতায়াতের পথেও ঝগড়া হয়ে থাকে। এমতাবস্থায় আমরা পরস্পরে সর্বোচ্চ ত্যাগ, সম্প্রীতি ও সহানুভূতি প্রদর্শন করতে পারি।

১০. মিনায় ৫০-৬০ জন হাজির জন্য একটি তাঁবু বরাদ্দ থাকে। খুব সংকীর্ণ জায়গায় অবস্থান করতে হয়। পছন্দমতো প্রশস্ত জায়গা না পাওয়ায় অনেকের মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। স্মরণ রাখতে হবে, মিনাতে শুধুমাত্র ওই রাত্রটি সকলে অবস্থান করেন। বাকি এ রাতগুলো হাজিরা চলাচলের মধ্যে থাকেন। ঠাণ্ডা মাথায় পরিস্থিতি মোকাবিলা করা উচিত।

১১. দমে শোকর (কোরবানি) দেওয়া নিয়ে ঝগড়া হয়। উত্তম হয় নিজ হাতে কোরবানি সম্পন্ন করা। আর অন্য কারও মাধ্যমে করলে চুক্তি অনুযায়ী সম্পূর্ণ রিয়াল দিয়ে দিতে হবে। কত রিয়াল লাগলো না লাগলো এসব বিষয় নিয়ে পরবর্তীতে কোনো সমালোচনা একেবারেই ঠিক নয়।

মুফতি অহিদুল আলম: খতিব, মসজিদ আল মাগফিরা, সেক্টর- ৩, উত্তরা, ঢাকা- ১২৩০