Alexa

শেষ পরীক্ষার আগেই চবি ছাত্রী প্রিয়াঙ্কার চিরবিদায়

শেষ পরীক্ষার আগেই চবি ছাত্রী প্রিয়াঙ্কার চিরবিদায়

ছবি: বার্তা২৪

নোয়াখালীর দুর্গম হাতিয়া দ্বীপাঞ্চল থেকে মেয়েটি উচ্চশিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্যে এসেছিল সবুজ-শ্যামল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। আর একটি পরীক্ষা বাকী ছিল। তারপরেই অর্জন করতো স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। শেষ পরীক্ষার আগেই চবি ছাত্রী প্রিয়াঙ্কা চিরবিদায়ের পথে চলে গেলো সবাইকে ছেড়ে।

বড় সংগ্রাম করে তিলে তিলে জীবনের কঠিন মাটিতে দাঁড়িয়েছিল প্রিয়াঙ্কা মজুমদার। প্রাইভেট পড়িয়েছে। প্রাইমারিতে শিক্ষকতার চাকরি নিয়েছে। সংসার আর জীবন চালিয়ে সচল রেখেছিল উচ্চশিক্ষা অর্জনের গতি।

রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে আমার ক্লাশে এই মেয়েটি ছিল সবার চেয়ে আলাদা। চুপচাপ। ভাবুক। সাদাসিধা। পোষাক ও চালচলনে বাহুল্য বর্জিত। নম্র, ভদ্র ও মার্জিত আচরণ। পুরো ডিপার্টমেন্টের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা তাকে দেখেছে আলাদা নজরে।

এই মেয়েটি জীবনপথে ছিল ব্যস্ত। হৈচৈ ও হাঙ্গামা করার ফুসরত ছিল না তার। ক্লাশ, চাকরি, পরিবার সামাল দিয়ে জীবনের সংগ্রামে জয়ী হওয়ার বাসনায় সে চলেছিল ক্যাম্পাসের দিনগুলোতে। মৃত্যুর করাল থাবা এসে থামিয়ে দিল তার সকল গতি। চিতার গভীর অতলে হারিয়ে গেল সম্ভাবনাময় সংগ্রামী-শিক্ষার্থী প্রিয়াঙ্কা মজুমদার।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) ছিল রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের স্নাতকোত্তর শ্রেণির সর্বশেষ পরীক্ষা। সবাই এলেও আসেনি প্রিয়াঙ্কা। অবাক সহপাঠী ও শিক্ষকবৃন্দ। জীবনের শেষ পরীক্ষাটি দিলেই সে শিক্ষাজীবনের চৌকাঠ মাড়িয়ে পৌঁছে যাবে স্নাতকোত্তরের সম্মানজনক পরিচয়ে। পেশার নানা সুযোগ খুলে ইতি ঘটবে তার সংগ্রামশীলা জীবনের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেলো, সে ক্যাম্পাসের হলে নেই। বাড়ি গেছে। সবাই আরও চিন্তিত হলো এজন্য যে, সে তার মাতৃত্বককালীন অবস্থায় ছিল। তারপর ভয়াবহ সংবাদ পাওয়া গেলো। তিন দিন আগে সে দুটি ফুটফুটে জমজ শিশুর জন্ম দিয়ে সুস্থ ছিল। একটি ছেলে ও আরেকটি মেয়ে সন্তান নিয়ে সে স্বর্গীয় আনন্দে মাতিয়েছিল সবাইকে। হয়ত পরবর্তী ও শেষ পরীক্ষাতেও আসার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

কিন্তু সেটা আর সম্ভব হয় নি। সন্তান প্রসবের পর তিন দিন পর্যন্ত সুস্থ-সবল মেয়েটি যে রক্তাল্পতায়য় আক্রান্ত, হাতিয়ার মতো অবহেলিত ও পশ্চাৎপদ এলাকার চিকিৎসা ব্যবস্থা তা ধরতেই পারে নি। তিন দিন পরে যখন তাকে রক্ত সঞ্চালন করা হয়, তখন দশ মিনিটের মধ্যে খিচুনি দিয়ে সে মারা যায়। রক্তের গ্রুপিং নির্ধারণ ও অন্যান্য চিকিৎসা প্রণালি কতটুকু সঠিক ও যৌক্তিক ছিল, সে প্রশ্নও সঙ্গে সঙ্গে উত্থাপিত হয়।

প্রিয়াঙ্কার এক্সপেক্টেড ডেলিভারি ডেট আরও পরে ছিল। কিন্তু তাকে সিজারিয়ান সার্জারির মাধ্যমে আগাম প্রসব করানো হয়। রক্তের হিমগ্লোবিনের পরিমাপও লক্ষ্য করা হয় নি। সঠিক রক্ত সঞ্চালনেও ছিল ত্রুটি।  বেদনার সঙ্গে সঙ্গে ভুল চিকিৎসা ও অবহেলার কথাগুলোও সামনে চলে আসে মৃত্যুর পর পরই।

'আমাদের সহপাঠী প্রিয়াঙ্কা সঠিক চিকিৎসা পায় নি', দাবি রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আরিফের। ক্যাম্পাস ও সাইবারের ভার্চুয়াল জগতে দুঃখ, বেদনার পাশাপাশি বইছে ক্ষোভ। সঠিক তদন্ত করে মৃত্যুর কারণ নির্ধারণের মাধ্যমে দোষীদের শাস্তিও দাবি করা হয়েছে।

জীবনের শেষ পরীক্ষার আগে জীবন থেকেই চলে যাওয়া প্রিয়াঙ্কা মজুমদার এবং তার নবজাতক জমজ সন্তানকে কি জবাব দেবে আমাদের প্রশ্নবিদ্ধ স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থা?

আপনার মতামত লিখুন :