প্রশাসনের ট্রাম্প কার্ড জাকসু, নির্বাচনহীন ২৬ বছর

রুদ্র আজাদ, জাবি করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
নেতৃত্ব শূন্যতায় ভুগছে জাকসুর এই ভবনটি, ছবি: বার্তা২৪

নেতৃত্ব শূন্যতায় ভুগছে জাকসুর এই ভবনটি, ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার গল্প শুনিয়ে বিখ্যাত হয়েছিলেন কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতায় কবির প্রেমিকা বরুণা কথা রাখেনি, ফলে অভিমানী কবি বিলাপ করে বলেছিলেন, ‘কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখেনি!’ ঠিক তেমনই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচনের ক্ষেত্রেও।

গত ২৬ বছর কথা রাখেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এর ফলে সাধারণ ছাত্রদের দাবি দাওয়া অধিকার নিয়ে কথা বলার মতো নেতৃত্ব গড়ে উঠেনি এখানে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস বিরাজ করছে ক্ষমতাসীন সরকারের ছাত্র সংগঠনের একক আধিপত্য। ভিন্নমতাবলম্বীদের মতামতের কোনো মূল্য থাকছে না বলে অভিযোগ রয়েছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের।

জাকসুর গঠনতন্ত্রে উল্লেখ আছে ‘জাকসুর লক্ষ্য হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্য সাংস্কৃতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিগত সহযোগিতা বাড়ানো, বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে সর্বাধিক পরিমাণে লেখাপড়া এবং এর বাইরের সুযোগ সুবিধা অর্জন করা, প্রকৃত নাগরিক রূপে ছাত্রদের গড়ে তোলা এবং তাদের মধ্য নেতৃত্বের উন্মেষ ঘটানো।’ কিন্তু গত ২৬ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে জাকসুর কার্যক্রমের অনুপস্থিতে ছাত্রসংশ্লিষ্ট এসব কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে পড়ছে।

শিক্ষার্থীরা তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ভুলতে বসেছেন। শিক্ষার্থীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছাত্র সংগঠনগুলোর হস্তক্ষেপে সৃষ্টি হচ্ছে সহিংসতা। রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দলগুলোর মধ্যে নেই কোনো সহাবস্থান। এদিকে জাকসুর সব কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বর্তমানে তৈরি হচ্ছে না যোগ্য ছাত্র নেতৃত্ব। বিভিন্ন সময়ে জাকসুকে সচল করার দাবি উঠলেও আজ পর্যন্ত তার কোনো সুরাহা হয়নি।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ডাকসু নির্বাচনের জন্য ঢাবি প্রশাসনকে সমর্থন দিলেও জাকসু’র ব্যাপারে নীরব জাবির প্রশাসন।

বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে জাকসু কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এছাড়া দীর্ঘ ২২ বছর পর গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েট নির্বাচনের পূর্বেও তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, সিনেট নির্বাচনের পরেই জাকসু’র আয়োজন করবেন। এরপর একবছরের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও এ বিষয়ে এখনও কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেননি তিনি।

জানা যায়, ১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠার পর ১৯৭২ সালেই গঠিত হয় জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি সেন্ট্রাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (জাকসু)। একই বছর প্রথম জাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যার ভিপি নির্বাচিত হন গোলাম মোর্শেদ এবং জিএস রোকন উদ্দিন। এরপর ৭৪, ৭৯, ৮০, ৮১, ৮৯, ৯০, ৯১ ও ৯২ সালসহ ৯ বার জাকসু নির্বাচন হয়। সর্বশেষ ১৯৯২ সালের নির্বাচনে ভিপি নির্বাচিত হন মাসুম হাসান তালুকদার লিটন এবং জিএস শামসুল তাবরিজ।

তবে এক ছাত্রের বহিষ্কারকে কেন্দ্র করে ১৯৯৩ সালের ২৯ জুলাই ছাত্র ও শিক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ বাঁধলে তৎকালীন প্রশাসন জাকসু ও হল সংসদ বাতিল করে। এরপর ২৬ বছর পার হলেও আলোর মুখ দেখেনি জাকসু।

১৯৭৩ সালের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের ১৯ (২) ধারা অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্যানেল নির্বাচনে জাকসু থেকে পাঁচজন নির্বাচিত প্রতিনিধির ভোটাধিকার আছে। কিন্তু জাকসু সচল না থাকায় এই অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে জাকসু কার্যকর না থাকায় এবং প্রশাসনের অবহেলায় জাকসু ভবনের ভয়াবহ অবস্থা দাঁড়িয়েছে। অধিকাংশ সময় তালাবন্ধ থাকে এই ভবনটি।

কিন্তু দেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবি উঠলেও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো তেমন দাবি উঠেনি।

কারণ অনুসন্ধানে জানা যায়, এই বিশ্ববিদ্যালয়টি সম্পূর্ণ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার কারণে হলগুলোতে সর্বদা ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের আধিপত্য থাকে। ফলে হলগুলোতে বিরোধীদলীয় ছাত্র সংগঠন তাদের অবস্থান ধরে রাখতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে অবস্থান করে বিশ্ববিদ্যালয় অভ্যন্তরে তাদের নিয়মিত কর্মসূচি সচল রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় যদি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সকল দলের সহাবস্থান নিশ্চিত না করে তাহলে এ নির্বাচনে সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠনের নিশ্চিত জয় হবে বলে মনে করছে ছাত্র নেতারা।

এ বিষয়ে জাবি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সহ-সভাপতি ইব্রাহিম খলিল বিপ্লব বার্তা২৪.কমকে বলেন, ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এই মুহূর্তে জাকসু নির্বাচন করার মত পরিবেশ নেই। ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করে। আমরা মনে করি জাকসু নির্বাচন আয়োজন করার পূর্বে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ক্যাম্পাসে সকল ছাত্রের সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে।’

জাবি ছাত্র ইউনিয়নের সহ-সভাপতি অলিউর রহমান সান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে ন্যূনতম গণতান্ত্রিক চর্চা বজায় রাখার লক্ষ্য জাকসু’র নির্বাচনের বিকল্প নেই। এই লক্ষ্য বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন বরাবরের মত দাবি জানিয়ে এসেছে। জাকসুর ব্যাপারে আমদের চিন্তা ভাবনা জনসংযোগ এবং বিভিন্ন মহলে আলাপ আলোচনা শিক্ষার্থীদের মধ্য সচেতনতা বৃদ্ধি করার কাজ সর্বদা জারি আছে। কিন্তু আমাদের আশঙ্কার যায়গাও আছে। জাতীয় নির্বাচনে যে পরিস্থিতি ঘটেছে সেই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি যে অন্যান্য ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে ঘটবে না তার নিশ্চয়তা কি? সেই নিশ্চয়তার লক্ষ্য আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টাটুকু করে যাব।‘

জাবি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. জুয়েল রানা বার্তা২৪.কমকে বলেন, ‘যে কোন আন্দোলনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সাধারণ ছাত্রদের কাতারে এস দাঁড়িয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীর আন্দোলনে তাদের দাবি আদায়ের জন্য আমরা জাকসু চাই। জাকসু  আমাদের প্রাণের দাবি। অতিদ্রুত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জাকসু আয়োজনের ব্যবস্থা করার দাবি জানাই এবং তার জন্য আমরা সর্বোচ্চ সহায়তা করতে প্রস্তুত আছি। আমরা চাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রেখে গণতান্ত্রিক উপায়ে একটি নেতৃত্ব আসুক।‘

জাবি উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম বার্তা২৪.কমকে বলেন, ‘আমার প্রথম থেকে আশা ছিল জাকসুর নির্বাচন দিব। কারণ ছাত্র সংসদ ছাড়া বিবিধ নেতৃত্বের বিকাশ হয় না। আমি আগেও বলেছিলাম সিনেট ইলেকশনের পর জাকসু নির্বাচন দিবো কিন্তু সিনেট ইলেকশনের পরের অবস্থা দুঃখজনক পর্যায়ে গেছে। সিনেট ইলেকশনের পর বিভিন্ন বাঁধা পাচ্ছি এমনকি আইনগত বাঁধাও পাচ্ছি। এমনঅবস্থায় আমরা যদি জাকসুর আয়োজন করি সেক্ষেত্রে আমরা কিভাবে ভোটার এবং প্রার্থী তৈরি করবো সেটা আমাদের চিন্তা করতে হবে।’

এছাড়া আগামী বছরের জানুয়ারি কিংবা ফেব্রুয়ারিতে জাকসু নির্বাচন হতে পারে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

আপনার মতামত লিখুন :