বছরজুড়ে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে রাবি ছাত্রলীগ

ছবি: সংগৃহীত

সাইফুল্লাহ সাইফ, রাবি করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) শাখা ছাত্রলীগের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির নেতাকর্মীরা একের পর এক ন্যাক্কারজনক কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে চলেছেন। এক বছর মেয়াদী কমিটি দুই বছর পার করলেও এখনো পর্যন্ত নতুন নেতৃত্ব না আসায় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের অপকর্মের মাত্রা একের পর এক বেড়েই চলেছে বলে দাবি করছেন সংগঠনটির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা।

সাংবাদিক-সাধারণ শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন জনকে মারধর, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ছাত্রী উত্যক্ত, সিট বাণিজ্য, হলে অবৈধ সিট দখল ও হলগুলোতে পলিটিক্যাল ব্লক তৈরিসহ বিভিন্ন ধরণের অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছেন। এতে করে সংগঠনটির ইমেজ সংকটের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাছে আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে রাবি ছাত্রলীগ।

এদিকে, মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির নেতাকর্মীদের অপকর্মের কারণে বিব্রত সংগঠনটির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা। তারা বলছেন, কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কাউন্সিল না দেওয়ায় এসব উশৃঙ্খল কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন নেতাকর্মীরা।

ছাত্রলীগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালের ৮ ডিসেম্বর রাবি শাখা ছাত্রলীগের ২৫তম সম্মেলনে গোলাম কিবরিয়াকে সভাপতি ও ফয়সাল আহমেদ রুনুকে সাধারণ সম্পাদক করে ১৩ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠিত হয়। প্রায় ছয় মাস পর ১৫১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটির স্থলে ২৫১ সদসস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়।

মারধর:

পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার পর ২০১৭ সালের ১০ জুলাই ছাত্রলীগের প্রথম কর্মসূচির দিন তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক মো. কানন, সহসভাপতি আহমেদ সজীব, সাংগঠনিক সম্পাদক হাসান লাবন ও আইন বিষয়ক সম্পাদক সাইফুল ইসলাম সহ ১০-১২ জন নেতাকর্মী ডেইলি স্টারের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি আরাফাত রহমানকে বেধড়ক মারধর করেন।

এরপর গত বছরের ১ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাণিজ্যিক সিনেমা প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে দৈনিক খোলা কাগজের রাবি প্রতিনিধি আলী ইউনুস হৃদয়কে মারধর করে রাবি ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাবরুন জামিল সুষ্ময়। গত ২০ ডিসেম্বর রাতে ছিনতাইয়ে বাধা দেওয়ায় এক যুবককে ছুরিকাঘাত করে আহত করেন শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ইমতিয়াজ আহমেদ।

গত বছরের ২৮ এপ্রিল রাবির দর্শন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের এক শিক্ষার্থীকে লিচু পাড়ার অভিযোগে মারধর করার অভিযোগ উঠে ছাত্রলীগ নেতকর্মীর বিরুদ্ধে। এরপর মাদক সেবনের অভিযোগ এনে ঐ বছরের ২১ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের মাদার বখশ হলে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষার্থীকে বেধড়ক মারধর করে রাবি ছাত্রলীগের প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক আসাদুল্লাহিল গালিব, সহসম্পাদক আব্দুল্লাহিল কাফি ও ছাত্রলীগ কর্মী শুভ্রদেব।

এরপর গত ১৩ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তির অভিযোগ এনে আরবি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীকে মারধর করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। গত বছরের ২০ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যায় পরিবহনের আব্দুল গনি নামের এক বাস চালককে মারধর করে সাংগঠনিক সম্পাদক সাবরুন জামিল সুষ্ময়।

এর আগে ঐবছরের ২ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে তরিকুল ইসলাম নামে এক আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীকে সড়কে ফেলে বেধড়ক মারধর করেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। মারধরে তরিকুলের পা ভেঙ্গে যায় এবং তার মেরুদণ্ডের হাড় ফেটে যায়।

চাঁদাবাজি:

গত ৮ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থীকে শিবির আখ্যা দিয়ে তার কাছ থেকে বিশ হাজার টাকা চাঁদাবাজি করেন রাবি ছাত্রলীগের সহসম্পাদক সাফি।

গত ৭ ডিসেম্বর আল আরমান হৃদয় নামের এক ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ২০ হাজার টাকা চুক্তি করে বিশ্ববিদ্যালয় সমাজবিজ্ঞান অনুষদ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শফিউর রহমান রাথিক ও যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক জসীমউদ্দীন রাহুল।

চুক্তি অনুযায়ী হৃদয় পাঁচ হাজার টাকা প্রদান করেন এবং পরে বাকি ১৫ হাজার টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে হৃদয়ের একাডেমিক সনদপত্র জিম্মি করে রাখেন রাথিক ও রাহুল।

সর্বশেষ ৬ ফেব্রুয়ারি রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের এক শিক্ষার্থীকে মাদক ব্যবসায়ী ও ছাত্রদল কর্মী আখ্যা দিয়ে ১০ হাজার টাকা চাঁদাবাজি করে শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি সুরঞ্জিত প্রসাদ বৃত্ত, সহ-সম্পাদক আরমান কায়সার আবির ও সফির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠি।

এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহরাওয়ার্দী হলে কক্ষে ইন্টারনেট সংযোগকে কেন্দ্র করে জীবন নামের এক শিক্ষার্থীর কক্ষ ভাঙ্চুর ও তার ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেন বলেও অভিযোগ পাওয়া যায়।

টেন্ডার ছাড়াই আম লিচু বাগান দখল:

টেন্ডার ছাড়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের আম ও লিচু বাগান দখলের অভিযোগ উঠে রাবি ছাত্রলীগের সহসভাপতি সারোয়ার হোসন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফ করিম রুপম ও সাংগঠনিক সম্পাদক সাবরুন জামিল সুষ্ময়ের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তাদেরকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে শোকজও করা হয়।

ছাত্রীকে শ্লীলতাহানির হুমকি:

নিজের প্রেমিকার সঙ্গে খারাপ আচরণ করায় ২০১৭ সালের ১১ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নারী শিক্ষার্থীকে প্রকাশ্যে শ্লীলতাহানির হুমকি দেন রাবি ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি সারোয়ার হোসেন।

অবৈধ সিট দখল সিট বাণিজ্য:

প্রত্যেক আবাসিক হলে একধিক কক্ষ অবৈধভাবে দখল করে সিট বাণিজ্য করছেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এর মধ্যে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলে ছাত্রলীগ সহ-সভাপতি রুহুল আমিন, মাহমুদুল হাসান শাকিল ও কর্মী মাজাহারুল ইসলাম আধিপত্য বিস্তার করে অবৈধভাবে সিট দখল নিয়েছেন বলে অভিযোগ। এছাড়া সৈয়দ আমীর আলী হলে প্রথম সারির তিন জন নেতা পলিটিক্যাল ব্লক করে বৈধ শিক্ষার্থীদের জোরপূর্বক কক্ষ পরিবর্তনে বাধ্য করেন।

প্রক্সি দিতে গিয়ে আটক:

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ডিগ্রি পরীক্ষায় প্রক্সি দিতে গিয়ে ২০১৭ সালের ১৯ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাব্বির আহমেদ বান্ধবীসহ গ্রেফতার হন। এরপর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি জালিয়াতির দায়ে ঐ বছরের ১৭ ডিসেম্বর রাবি ছাত্রলীগৈর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান সজল ও ছাত্রলীগ কর্মী মোস্তফা বিন ইসমাঈলকে আটক করে পুলিশ।

নিয়োগ পরীক্ষায় বাধা:

২০১৬ সালের ২৩ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে শুরু হওয়া নিয়োগ পরীক্ষা বন্ধ করে দেন রাবি ছাত্রলীগ ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাধান ফটক বন্ধ করে রাবি ছাত্রলীগের সভাপতি গোলাম কিবরিয়া ও সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ রুনুর নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি একাডেমিক ভবন ও প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন নেতাকর্মীরা।

ক্যাম্পাস এর আরও খবর