সরব ছাত্র সংগঠন, নিশ্চুপ প্রশাসন



রকিব কামাল,স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
চাকসু ভবন, ছবি: বার্তা২৪

চাকসু ভবন, ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease
 
সর্বশেষ ২৮ বছর পূর্বে ১৯৯০ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচন। দীর্ঘ সময়ের  পরিক্রমায়  উপাচার্যদের ক্ষমতার পালাবদলের আশ্বাস আর রাজনৈতিক সহিংসতার দোলাচলে কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে নেতৃত্ব তৈরির আঁতুঘড়। স্তব্ধ হয়ে পড়ে শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বরের আওয়াজ।
 
সম্প্রতি ডাকসু নির্বাচনের তোড়জোড় শুরুর পর অন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নির্বাচনের জোর দাবি ওঠে। দাবিতে সরব হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রলীগসহ বেশ কয়েকটি প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন। ক্রমাগত আন্দোলন, কর্মসূচির পরেও তুচ্ছ অজুহাতেই আটকে আছে প্রশাসন।
 
ছাত্রসংগঠনের প্রতিনিধিরা বলছেন, বেশ কয়েকবছর ধরে চলে আসা অনিয়ম, দুর্নীতি এবং কথা বলার কণ্ঠস্বর রুখে দিতে প্রশাসন নির্বাচন দিচ্ছে না। অপরদিকে প্রশাসন বলছে, নির্বাচন ঘিরে ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের সহিংসতা না হওয়া এবং পরিবেশ সৃষ্টি হলে তবেই নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
 
আর সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলছেন, গুনগত নেতৃত্ব এবং সুষ্ঠু রাজনৈতিক চর্চার ক্ষেত্র তৈরিতে প্রশাসন নির্বাচনের পরিবেশে সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
 
সূত্র জানায়, গত ১৪ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিজীবী চত্বরে সামনে আয়োজিত এক মানববন্ধনে শাখা ছাত্রলীগের একটি অংশ নির্বাচনের দাবিতে প্রশাসনকে আল্টিমেটাম দেয়। বেধে দেওয়া সময়ের মধ্যে সকল প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনকে সাথে নিয়ে নির্বাচন প্রস্তুতি উদ্যোগ না দিলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেয়। একই স্থানে সংগঠনটির অপর একটি অংশ নির্বাচন চেয়ে গণস্বাক্ষর কর্মসূচি পালন করে।
 
জানতে চাইলে শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এইচ এম ফজলে রাব্বি সুজন বার্তা২৪.কমকে বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচন সন্নিকটে। প্রশাসন নির্বাচনের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করছে। আমরা তাদের সময় দিয়েছি। এরপরেও যদি তারা নির্বাচন নিয়ে তালবাহানা করে, আমরা সাধারণ শিক্ষার্থী এবং সংগঠনগুলো কঠোর আন্দোলনে যাব। কোনোভাবেই আর অন্যায় আবদার মেনে নেওয়া হবে না।’
 
চাকসু নির্বাচনসহ হল সংসদের নির্বাচন নিয়ে দাবির পক্ষে সোচ্চার হয় ছাত্র ইউনিয়ন। মানববন্ধন, উপাচার্যকে স্মারকলিপি এবং ছাত্রশিবিরে নিবন্ধন নিষিদ্ধসহ ছয় দফা দাবির নিয়ে তারা ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করছে।
 
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবা জাহান রুমি বার্তা২৪.কমকে বলেন, ‘আমরা কেবল এখনই নই, বিগত কয়েকবছর ধরে আন্দোলন করছি। আমরা বিশ্বাস করি গণতন্ত্রের চর্চার নীতির উৎকৃষ্ট উপায় হচ্ছে চাকসু নির্বাচন। এর মধ্যে দিয়ে ছাত্র প্রতিনিধি তৈরি হয়ে পরবর্তীতে জাতীয় নেতৃত্ব অগ্রণী ভূমিকা রাখবে। কিন্তু প্রশাসন নির্বাচন ব্যাপারে বরাবরই পিছপা ছিল। যদি আন্তরিক থাকতো তাহলে সব সংগঠন নিয়ে সুষ্ঠু সহাবস্থান নিশ্চিত করতো।
 
চাকসু নির্বাচনের উদ্যোগ নিয়ে ‘কোনো মায়ের বুক খালি’ করতে চাইনা প্রশাসনের এমন বক্তব্যে রুমি বলেন, ক্রিয়াশীল যে ছাত্রসংগঠনগুলো ক্যাম্পাসে রাজনীতি করছে তাদের নিয়ে আলোচনার বিষয়ে কোনো প্রস্তাবনা এখনও নেওয়া হয়নি। বরং গণমাধ্যম এবং বিশেষ মহল থেকে শুনতে পাচ্ছি প্রশাসন প্রত্যেকটা সংগঠনকে বন্ডে সই করে অংশগ্রহণ করতে বলছে। কোনো সুষ্ঠু পরিবেশ, আলোচনাবিহীন এমন বন্ড আমরা প্রত্যাখ্যান করেছি। এভাবে নির্বাচন হতে পারে না।
 
চাকসুর গঠনতন্ত্র নিয়ে নতুন বই প্রকাশ করে শিক্ষার্থীদের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে গিয়ে দাবি উত্থাপন করছেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো উত্তর পায়নি বলে জানান সংগঠনটির বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি আইরিন। তিনি জানান, যেখানে ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠন চাচ্ছে, সেখানে অবশ্যই নির্বাচন দেওয়া উচিত। নিজেদের খেয়াল খুশি মতো বাজেট, দুর্নীতি, অন্যায় আবদার ছাপিয়ে দেওয়ার দিন বন্ধ করতে হবে।
 
ক্যাম্পাসে দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে কোণঠাসা হলেও ছাত্র সংসদ নির্বাচন চেয়েছেন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো. শহিদুল ইসলাম।
 
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বার্তা২৪.কমকে বলেন, ‘আমরা বলেই দিয়েছি ছাত্রসংগঠনগুলো যদি সহাবস্থান এবং সুষ্ঠু পরিবেশের নিশ্চয়তা দিতে পারে তাহলে নির্বাচন আয়োজন করব। নির্বাচন দেব কিন্তু সংঘর্ষে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি করে কোনো মায়ের বুক খালি করে শিক্ষার পরিবেশ বিনষ্ট করতে চাই না।’
 
পরিবেশ সৃষ্টিতে সংগঠনগুলো প্রশাসনের আন্তরিকতার ঘাটতি দেখছে এমন প্রশ্নে পরে কথা হবে জানিয়ে ফোন কেটে দেন উপাচার্য।
 
উপাচার্যের যুক্তি খুব বেশি যৌক্তিক এবং এটি যে নির্বাচনের অন্তরায় হতে পারে তা মানতে নারাজ শাখা ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি নিশো। 
 
নেতৃত্ব তৈরির পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কলা অনুষদের পাশে চাকসু ভবনটি আজ সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে সকাল-দুপুরের খাবারের খাবারের ক্যান্টিন, কয়েকটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের সংস্কৃতি কার্যক্রম, পত্রিকা পাঠ আর অবসর সময়ে খেলাধুলার স্থান হিসেবে পরিচিত লাভ করে। নির্বাচনে মাধ্যমে আবারও সচল হবে চাকসুর কার্যক্রম এমনটাই আশার করছেন শিক্ষার্থীরা।