Alexa

শুরুতে সৌম্য, শেষে সৈকতে সুন্দরতম সমাপ্তি

শুরুতে সৌম্য, শেষে সৈকতে সুন্দরতম সমাপ্তি

ফাইনালে বাংলাদেশের দুই জয়ের নায়ক সৌম্য সরকার ও মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত- ছবি: বিসিবি

নেতাকে সামনের সময়টা দেখতে হয় খুব স্পষ্ঠ করে। বাস্তবতার নিরিখে। এই ফাইনালের সামনের সেই সময়কে অধিনায়ক মাশরাফি একটু আগেভাগেই দেখতে পেয়েছিলেন তাহলে?

শুনি ফাইনালের আগে মাশরাফি কি বলছিলেন-‘সাকিবকে ছাড়াও এই ম্যাচ জয়ের সামর্থ্য আমাদের আছে। সাকিব না খেললে তার জায়গা যে খেলবে, সেও পেশাদার, তারও সামর্থ্য আছে ভালো করার।’

-তো সাকিবের পরিবর্তে ফাইনালে কে খেললেন?

কম্বিনেশন জানাচ্ছে মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত। নিশ্চিত জানুন একাদশে সাকিব আল হাসান থাকলে এই ফাইনালে মোসাদ্দেকের খেলা হতো না। ম্যাচে সাকিবের ১০ ওভারের স্পিন কে করে দেবে- সেই পরিকল্পনা সফল করতেই মুলত ফাইনালের একাদশে চলে এলেন মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/May/18/1558163412838.jpg

কিন্তু সেই তিনিই ম্যাচের শেষভাবে ব্যাট হাতে যা করলেন তাতেই প্রমাণিত তার পেশাদারিত্ব। তার সামর্থ্য। যে পেশাদারিত্বের কথা, যে সামর্থ্যরে কথা ফাইনাল শুরুর ২৪ ঘন্টা আগে ঠিকই দেখেছিলেন অধিনায়ক মাশরাফি!

ট্রফি জিততে চাই ২৪ ওভারে ২১০ রান। যে কোনো ফরম্যাটেই এটি অনেক বড় টার্গেট। মোসাদ্দেক হোসেন যখন ব্যাট করতে এলেন উইকেটে তখন জেনুইন ব্যাটসম্যান শুধু মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। ব্যাটিং অর্ডারে এরপরই লেজের সারির শুরু। স্কোরবোর্ডে বাংলাদেশের রান তখন ৫ উইকেটে ১৪৩। ম্যাচ জিততে চাই ৫০ বলে ৬৭ রান। এই অবস্থান থেকে আরেকটি উইকেট হারানো মানেই পাহাড় সমান চাপে পড়বে দল। একেই তো ফাইনাল ম্যাচ। তাছাড়া মাঠ ভেজা থাকায় বলও দ্রুত বাউন্ডারিতে যাচ্ছে না। ভেজা ঘাসে আটকে যাচ্ছে। তাই মোসাদ্দেক-মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ জুটি সিদ্ধান্ত নিলেন খেলাটা তারাই শেষ করে ফিরবেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/May/18/1558163445562.jpg

যেই চিন্তা সেই কাজ। পরিকল্পনা অনুযায়ী মোসাদ্দেকের শুরুটা হলো অনেক বেশি সাবধানী। নিজের খেলা প্রথম ১১ বলে মোসাদ্দেক করলেন মাত্র ৬ রান। তখনো লক্ষ্য থেকে বেশ দুরে বাংলাদেশ। চাই ৩৬ বলে ৫৫ রান। পরের ওভারে হোল্ডারকে স্কয়ার লেগের ওপর দিয়ে উড়িয়ে ফ্লিক শটে ম্যাচে নিজের প্রথম ছক্কা মোসাদ্দেকের। সেই ওভারে বাংলাদেশের স্কোরে যোগ হলো ১০ রান। স্পিনার অ্যালেনের করা পরের ওভারে দেখেশুনে ব্যাটিং। এই ওভারে মিললো মাত্র ৬ রান। টার্গেট তখনো বেশ দুরে। ২৪ বলে করতে হবে ৩৯ রান। খেমার রোচের করা ম্যাচের ২১ নম্বর ওভারের দ্বিতীয় বলে ফের মোসাদ্দেকের দুর্দান্ত ছক্কা। এক্সট্রা কাভারের ওপর দিকে বল গ্যালারিতে! ওভারে সবশুদ্ধ মিললো ১২ রান। জিততে প্রয়োজন তখন আরো ২৭ রান। বল বাকি ১৮টি।

এখান থেকেই গিয়ার বদলে ফেললেন মোসাদ্দেক। তার ব্যক্তিগত রান তখন ১৫ বলে ২৬। স্পিনার ফ্যাবিয়েন অ্যালেনকে আক্রমণে দেখে সিদ্ধান্ত নিলেন যা করার এই ওভারেই করতে হবে।

প্রথম বল ছক্কা! দ্বিতীয় বলেও তাই, ছক্কা!! তৃতীয় বলে বাউন্ডারি!!! চার নম্বর বলে আরেক ছক্কা!!!! পঞ্চম বলে দুই রান। সেই সঙ্গে মাত্র ২০ বলে মোসাদ্দেকের হাফসেঞ্চুরি পুরো। ওয়ানডে ক্রিকেটে এটাই বাংলাদেশেরদ্রুততম হাফসেঞ্চুরি এটি। আগেরটি ছিলো ২১ বলের, মোহাম্মদ আশরাফুল ও আব্দুর রাজ্জাকের।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/May/18/1558163464350.jpg

অ্যালেনের সেই ওভারের ছয়টি বলই খেলেন মোসাদ্দেক। তাতে সবমিলিয়ে রান এলো ২৫। এই ২৫ রানই মোসাদ্দেকের ব্যাটে! ১৫ বলের ২৬ রান থেকে চোখের পলকেই তার স্কোর ২১ বলে ৫১ রানে!

এই ওভারকেই ফাইনালের টার্র্নিং পয়েন্ট বলছেন মোসাদ্দেক-‘শেষ তিন ওভারে আমাদের চাই ২৭ রান। জানতাম ড্রেসিংরুমে আমাদের পরে ব্যাটিংয়ে আছেন সাইফুদ্দিন, মেহেদি ও মাশরাফি ভাই। মাশরাফি ভাই বিগ শট খেলতে পারেন। তবে আমাদের পরিকল্পনা ছিলো শেষ পর্যন্ত টিকে থেকে ব্যাটিং করে যাওয়া। অ্যালেনকে আক্রমণে দেখেই তাকে টার্গেট করি। সেই ওভারে নিজেদেরকে আমরা লক্ষ্যের কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছি। সেটা আমরা পেরেছিও। মুলত সেই ওভারেই কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়। ঐ ওভারটাই টার্নিং পয়েন্ট।’

আসলেও তাই। ২৫ রানের সেই ওভারের পর ম্যাচ জিততে বাংলাদেশের প্রয়োজন পড়ে ১২ বলে ২ রান! মাহমুদউল্লার বাউন্ডারিতে পরের ওভারেই জয় আনন্দ বল্গাহারা!

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/May/18/1558163487721.jpg

ইনিংসের শুরুতে সৌম্যের ৪১ বলে ৬৬ রান। মাঝে দারুণ পরিকল্পনায় সাজানো মুশফিক-মিঠুনের ব্যাটিং। এবং শেষে মোসাদ্দেক-মাহমুদউল্লাহর সুন্দর মসৃণ । ট্রফি জয়ী ফাইনালের বাংলাদেশের এই ইনিংসকে দেশের সিনিয়র ক্রিকেট কোচ নাজমুল আবেদিন ফাহিম এভাবে ব্যাখা করছেন-‘সৌম কে দিয়ে শুরু, সৈকত কে দিয়ে তার শেষ। এই প্রজন্ম বুঝিয়ে দিল তারাও দায়িত্ব নিতে জানে।’

এতদিন ক্রিকেট ফাইনালের দুঃখ-শোক, কান্না-কষ্টই দেখছিলো বাংলাদেশ। এই প্রথম দেখলো হাসি-আনন্দের সুন্দরতম সমাপ্তি। সেই সঙ্গে বিশ্বকাপ শুরুর আগে আগে খুব পরিশীলত কায়দায় কিন্তু আত্মবিশ্বাস ভরা গর্জন শুনিয়ে দিল বাংলাদেশ-‘আমরাও আসছি!’

আপনার মতামত লিখুন :