ব্র্যাডম্যানের ‘বিখ্যাত শূন্যের’ সেই মাঠ

এম.এম.কায়সার, স্পোর্টস এডিটর, বার্তা২৪.কম, লন্ডন থেকে
ওভালেই ক্যারিয়ারের শেষ ইনিংস খেলেছিলেন স্যার ডন ব্র্যাডম্যান

ওভালেই ক্যারিয়ারের শেষ ইনিংস খেলেছিলেন স্যার ডন ব্র্যাডম্যান

  • Font increase
  • Font Decrease

রোববার এখানে ছুটির দিন। আর ছুটির দিনেই যে লন্ডন টিউব রেলের কর্মীরা তাদের কাজ জমিয়ে রাখবেন তা কে জানত?

স্টেফানি গ্রিন স্টেশন থেকে বেশ সহজেই খালি ট্রেনে উঠা গেলো। পরের স্টেশন মাইল্যান্ডে নেমে অন্য লাইনের ট্রেন ধরতে হবে ওভালে যাওয়ার জন্য। বিপত্তি সেখানেই। হঠাৎ ট্রেন চালকের ঘোষণা, সামনের স্টেশনে মেরামতের কাজ চলছে। অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। প্রথমবার অপেক্ষা পাঁচ মিনিট। সেই সময় শেষ হতে আরেকটি ঘোষণা-এবার ১০ মিনিট অপেক্ষা। তবে অবাক করার ব্যাপার আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেনে বসা একজনের কপালও কিন্তু বিরক্তিতে কুঁচকালো না। কারণ এই যাত্রীদের সবাই জানে- ট্রেনের লাইন মেরামতের দায়িত্বে যারা রয়েছে, তারা চুড়ান্ত পরিশ্রম করছে। টেকনিক্যাল সমস্যা তো মেনে নিতেই হবে।

কেন জানি ঠিক তখনই ভরা বর্ষায় ঢাকার রাস্তা খোঁড়াখুড়ির দৃশ্যটা চোখে ভেসে উঠল। এখানে অবশ্য তেমন কিছু নয়। ট্রেন বদলে ওভালে পৌছাতে একটু দেরিই হয়ে গেল। কিন্তু ওভাল স্টেশনে নামার সঙ্গে সঙ্গেই চারপাশ থেকে -‘নিড টিকিট, নিড টিকিট-’ বলে যে দৌড়ঝাপ দেখলাম তাতে মনে হলো, আবাহনী-মোহামেডান সুপার কাপ ফুটবল দেখতে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের বাইরে দাড়িয়ে আছি। পুলিশে গিজগিজ করছে। কিন্তুু কেউ কারো কোনো কাজে বাধা দিচ্ছে না।

ওভাল স্টেশনের গেটেই এক পতাকা বিক্রেতার সঙ্গে দেখা। নাম অ্যালেক্স। মজার বিষয় হলো তার হাতে ধরা পতাকার সবগুলোই বাংলাদেশের!

কেমন বিক্রি হচ্ছে?

মাথা নাড়িয়ে হাসি দিয়ে অ্যালেক্স বুঝিয়ে দিলো ব্যবসা মন্দ নয়!

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jun/02/1559471693330.jpg

মাঠে ঢুকতেই ভেতরকার ক্রিকেটীয় পরিবেশ, উৎসব শুরুর মুহূর্ত দেখে যে কেউ বিমোহিত হবেন। মাঠের নামটাই এর বিশেষ বৈশিষ্ঠ্যের কথাটা জানান দিচ্ছে-ওভাল। বাংলায় আনুমানিক প্রতিশব্দটা হবে-ডিম্বাকৃতি। ডিমের আদলে দুই পাশে চোখা রেখে তৈরি করা হয়েছে এই স্টেডিয়াম। দুই পাশের স্কয়ার বাউন্ডারি মাঠের অন্য যে কোন জায়গার চেয়ে বেশি দৈর্ঘ্যরে। প্রেসবক্সের  ঠিক মাথার ওপরের দিকের দর্শক গ্যালারিটা খোলা ছাদের আদলে নির্মিত।  বিশালাকৃতির একটি স্টিলের আবরন দিয়ে এই গ্যালারির কিছু অংশ ঢাকার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ইংল্যান্ডের এই স্টেডিয়ামের শতাব্দী পুরানো ইতিহাস আছে।

দারুণ সমৃদ্ধ সেই ক্রিকেট ইতিহাস। ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া যে অ্যাশেজ সিরিজে মুখোমুখি হচ্ছে-সেই অ্যাশেজ সিরিজের ধারণার জন্ম দিয়েছিল এই মাঠ। ১৮৮২ সালে টেস্ট ম্যাচ ইংল্যান্ড ৭ রানে হেরে যায় অস্ট্রেলিয়ার কাছে এখানে। শেষ ইনিংসে জয়ের জন্য ইংল্যান্ডের প্রয়োজন দাড়ায় মাত্র ৮৫ রানের। ২ উইকেটে ৫১ রান তুলে সহজ জয়ের পথেই ছিল ইংল্যান্ড। কিন্তু ধসের শুরুটা হয় তখনই। ৫১ রানে ২ উইকেট থেকে ইংল্যান্ড হঠাৎ করে অলআউট ৭৮ রানে! দেশের মাটিতে দলের এই প্রথম হারে দারুন দুঃখ পায় ইংলিশ মিডিয়া। পরদিন দ্যা স্পোটিং টাইম লেখে-‘ইংলিশ ক্রিকেটের মৃত্যু হলো’। ক্রিকেট ইতিহাস জানাচ্ছে-দারুন টেনশনের সেই ম্যাচের সময় ছাতার বাটে একজন ইংলিশ সমর্থক মারাও গিয়েছিলেন। ইংল্যান্ড দল এই হারের পর যখন অস্ট্রেলিয়ায় তাদের পরবর্তী সফরে যাচ্ছিল তখন ইংল্যান্ডের অধিনায়ককে কিছু ছাই উপহার দিয়ে বলা হয়েছিল-‘এটা ইংলিশ  ক্রিকেটের দেহাবশেষ।’

অ্যাশেজ সিরিজের ধারণার জন্ম এভাবেই।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jun/02/1559471727864.jpg

লর্ডসকে ক্রিকেটের হোম বলা হলেও ওভালের শতাব্দী পুরানো ইতিহাস এবং এখানে ঘটে যাওয়া ক্রিকেটের অবিস্মরনীয় কিছু ঘটনা এই মাঠকে ইংলিশ ক্রিকেটে অবিচ্ছেদ্য অংশের মর্যাদা দিয়েছে। ইতিহাসের অনেক আলোচিত টেস্ট ম্যাচ হয়েছে এই মাঠে। সর্বশেষটার কথাই বলি-২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরে এই মাঠে পাকিস্তান-ইংল্যান্ডের টেস্ট ম্যাচটা চরম বিতর্ক নিয়ে শেষ হয়েছিল।আম্পায়ার ড্যারিল হার্পার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বল টেম্পারিংয়ের অভিযোগ এনে ‘নো বল’ কল করেন। পাকিস্তান অধিনায়ক ইনজামাম-উল-হক অভিযোগ অস্বীকার করে মাঠ থেকে খেলোয়াড়দের নিয়ে বেরিয়ে আসেন। পাকিস্তান খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে-এই অভিযোগ এনে আম্পায়াররা ম্যাচ ফরফিট ঘোষণা করে ইংল্যান্ডকে জয়ী জানিয়ে দেন। পাকিস্তান সেই ম্যাচের ফলাফল নিয়ে আইসিসির দরবারে ছুটে। শেষশেষ সেই টেস্ট ম্যাচের ফলাফল আইসিসি বাতিল করে। কিন্তু পরে মেরিলিবোর্ন ক্রিকেট ক্লাব (এমসিসি) সেই ম্যাচে ইংল্যান্ডকে জয়ী ঘোষণা করে। ব্যাপারটা নিয়ে পাকিস্তান এবং ইংলিশ ক্রিকেট বোর্ডের (ইসিবি) মধ্যে দড়ি টানাটানি চলে।

বাংলাদেশ-দক্ষিণ আফ্রিকার বিশ্বকাপ ম্যাচ শুরু তখনো হয়নি। মাঠের চারপাশে আরেকবার তাকাই। এই মাঠেই স্যার ডন ব্র্যাডম্যান ১৯৪৮ সালে তার জীবনের শেষ টেস্টের শেষ ইনিংসে শূন্য রানে আউট হয়েছিলেন। যে কারণে তার টেস্ট রের্কড ‘পারফেক্ট একশ’ আর হলো না! টেলিভিশন রিপ্লেতে অনেকবার ব্র্যাডম্যানের শূন্য রানে আউটের সেই দৃশ্য দেখেছি। মাঠের কোন প্রান্ত ছিল সেটা? খুঁজে লাভ নেই। কারণ এই মাঠ বারকয়েক তার আকৃতি-আদল বদলেছে। শুধু বদলায় না ঐতিহ্য ও ইতিহাস।

এবং ব্র্যাডম্যানের বিখ্যাত শূন্য রানের সেই রেকর্ড!

আপনার মতামত লিখুন :