সমাধিক্ষেত্র থেকে বিশ্বকাপের মঞ্চে!

স্পোর্টস ডেস্ক, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম নায়ক ২৪ বছর বয়সী জোফরা আর্চার

ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম নায়ক ২৪ বছর বয়সী জোফরা আর্চার

  • Font increase
  • Font Decrease

ঘন্টায় ৯৫ মাইল (প্রায় ১৫৩ কিমি) বেগে বল করা জোফরা আর্চারের কাছে কোনো ব্যাপারই না। বল হাতে তার পারফরম্যান্স দেখলে মনে হবে ফাস্ট বোলিং শিল্পটা যেন একেবারেই সোজা। আর সেই ‘সহজ’ অস্ত্র দিয়েই রোববার ঝড় তুললেন। ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ জয়ে রাখলেন বড় ভূমিকা। তার করা সুপার ওভারের পথ ধরেই দল পেল প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ট্রফি!

যদিও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার উঠে আসাটা মোটেই সহজ ছিল না। বার্বাডিয়ান বংশোদ্ভূত এ ইংলিশ পেসারকে ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পা রাখতে পাড়ি দিতে হয়েছে দীর্ঘ পথ। সেই পথ পেরিয়ে আর্চার ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে ছড়িয়ে গেছেন পেস বোলিং দ্যুতি।

আর্চারের বেড়ে উঠা প্রত্যন্ত অঞ্চলে। ব্রিজটাউনের ঠিক বাইরে। ছোট বেলা থেকে স্বপ্ন দেখতেন ক্যারিবিয়ান হিরো কোর্টনি ওয়ালশ, কার্টলি অ্যামব্রোস ও মাইকেল হোল্ডিং হয়ে উঠার। মরিয়া ছিলেন দেশের হয়ে মাঠে নামতে।

এক পর্যায়ে তার মনে হয়েছিল, স্বপ্নপূরণের পথ বুঝি তিনি পেয়ে গেছেন। কেননা ২০১৪ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ লেভেলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে তিন বার মাঠে নামেন তিনি।

কিন্তু ২০১৪ ক্রিকেট বিশ্বকাপে সিনিয়র দলে ঢুকতে ব্যর্থ হলে টনক নড়ে আর্চারের। স্বপ্ন ভাঙে তার। হতাশ হয়ে ২৪ বছরের এ তারকা ক্রিকেটার যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমানোর সিদ্ধান্ত নেন। যেখানে তার বাবা জন্মেছেন। দুই বছর বাদেই সাসেক্সে দ্রুতই সুনাম কুড়াতে থাকেন তিনি।

ইংল্যান্ডে পাড়ি জমানোটা আর্চারের মূল পরিকল্পনা ছিল না। তবে তরুণ আর্চার ভিন্ন কিছু করেননি। কিন্তু ক্রিকেট খেলে গেছেন সৎবাবা প্যাট্রিক ওয়েথের সঙ্গে।

অনুশীলন নিয়ে আর্চারের বাবা প্যাট্রিক বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন অনুশীলন করেছি। কাক ডাকা ভোরেই ঘুম থেকে উঠে পড়ত সে। সূর্য ডুবা না পর্যন্ত অনুশীলন করে গেছি আমরা।’

ছেলের জন্য গর্বিত বাবা প্যাট্রিক বলেন, ‘ছেলেদের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল সে। তাকে কোচিং করানোটাও ছিল সহজ।  ভালো একজন তরুণ হিসেবেই গড়ে উঠেছে সে। তার জন্য আমরা গর্বিত। আমরা প্রতিদিন কথা বলি। তাকে নিজের ছেলের মতোই ভালোবাসি।’

দত্তক পুত্র আর্চারকে নিয়ে অনুশীলনের জন্য ওয়েথ চলে যেতেন কাছের এক সমাধিক্ষেত্রে। টেপ পেঁচানো টেনিস বলে দুজনে নিতেন আসল ক্রিকেট বলের রোমাঞ্চ।

আর্চার যখন ৯ বছরে পা দিলেন। তখন থেকে তিনি ওভারের পর ওভার বল করে যেতেন। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। যতক্ষণ না তার বোলিং কৌশল উন্নত হত।

স্থানীয় পিকউইক ক্রিকেট ক্লাবে খেলতেন আর্চার। নিজের সাদামাটা বাংলোর কাছেই অস্থায়ী একটি পিচ তৈরি করেন প্যাট্রিক।

সেখানে একদিন ছেলের পারফরম্যান্সে অবাক হয়ে যান প্যাট্রিক নিজেই, ‘একদিন সে আমাকে চমকে দেয়। নেটে আমি কেবল তার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। টানা চার বলে সে আমাকে পরিষ্কার বোল্ড করে দেয়। বড় কোনো আসরে যেন বল করছিল সে। ২৪০ ভোল্ট যেন তার শরীরে প্রবাহিত হচ্ছিল।’

১৫ বছর বয়সে আর্চার হতে চেয়েছিলেন উইকেটরক্ষক। ক্রাইস্ট চার্চ ফাউন্ডেশন স্কুলে সে সেটাই করে গেছে। সাথে চলত ব্যাটিং। কিন্তু হালকা-পাতলা গড়ন তার আত্মবিশ্বাসকে দমিয়ে দেয়। পরে শিক্ষক নামো উইনের পরামর্শে আর্চার বনে যান পেস বোলার।

যে ওয়েস্ট ইন্ডিজ একদিন তাকে অবজ্ঞা করে ছিল। বিশ্বকাপে তাদের বিপক্ষেই আর্চার নেন তিন উইকেট। লিগ পর্বের সে ম্যাচে ইংল্যান্ড জেতে আট উইকেটের বড় ব্যবধানে। এ দৃশ্য দেখে ক্যারিবিয়ানদের আপসোস হয়েছে বৈকি!

আর্চারের আসল বাবা ছিলেন ব্রিটিশ। সুবাদে ব্রিটিশ পাসপোর্ট ছিল তার হাতে। কিন্তু তারপরও শুরুতে ইংল্যান্ডের হয়ে খেলার অনুমতি পাননি আর্চার। সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় আইন। ইসিবির পুরনো নিয়ম অনুযায়ী ২০২২ সালের শীতের আগে ইংল্যান্ডের জার্সি গায়ে তোলা সম্ভব ছিল না তার জন্য।

কারণ ১৮তম জন্মদিনের আগ পর্যন্ত ইংল্যান্ডে বসবাস করেননি আর্চার। আইন অনুযায়ী কমপক্ষে সাত বছর ইংল্যান্ড বসবাস করতে হত তাকে। ২০১৮ সালে নভেম্বরে নিয়মটা পাল্টে ফেলে ইসিবি। আইসিসির দেখাদেখি সাত বছরের বদলে তিন বছর বসবাসের নিয়ম করে তারা। এতেই কপাল খুলে যায় আর্চারের। তাকে আর পিছনে থাকাতে হয়নি।

এর পরই এপ্রিলে পাকিস্তানের বিপক্ষে সীমিত ওভারের সিরিজ ও আয়ারল্যান্ডর বিপক্ষে একমাত্র ওয়ানডে দলে ডাক পান আর্চার। মে মাসে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে হয় তার অভিষেক। দুই দিন পর পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলেন টি-টুয়েন্টি।

আইপিএলে বল হাতে আলো ছড়িয়ে ২০১৯ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের প্রাথমিক দলে জায়গা করে নেন আর্চার। পরে ১৫ জনের চূড়ান্ত দলে ঢুকে যান তিনি। সুযোগটা কাজে লাগিয়ে বলে হাতে দুর্বার আর্চার দলকে ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলতে রাখেন অগ্রণী ভূমিকা। সেই সমাধিক্ষেত্র থেকে একটু একটু করে পথ চলতে চলতে এবার লর্ডসে বিশ্বকাপের মঞ্চে ঝড় তুললেন তিনি! তার করা সুপার ওভারেই তো রোববার বাজিমাত। নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে ইংল্যান্ড বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন!

আপনার মতামত লিখুন :