কোথাও যাওয়ার ছিলো না, তাই বোতলের কাছেই গেলাম-মানিন্দার সিং

স্পোর্টস এডিটর, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
সাবেক ভারতীয় ক্রিকেটার মানিন্দার সিং, ছবি: সংগৃহীত

সাবেক ভারতীয় ক্রিকেটার মানিন্দার সিং, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

মানিন্দার সিংকে মনে আছে?

আশির দশকের মাঝামাঝি সময়টায় তাকে ভাবা হচ্ছিল বিষেন সিং বেদির প্রতিভু হিসেবে। ধারণা করা হচ্ছিল টেস্ট ক্রিকেটে তিনিই হতেই চলেছেন ভারতের আরেক বিষেন সিং বেদি! বেদির মতো মানিন্দার সিংও বাঁহাতি অর্থোডক্স স্পিনার। বোলিং স্টাইলেও দারুণ মিল!

কিন্তু মাত্র ১৭ বছর ১৯৩ তম দিনে টেস্ট অভিষেক হওয়া মানিন্দার যে বেদির ধারে কাছেও পৌঁছাতে পারলেন না। প্রতিভা ছিল। কিন্তু স্ফুরণ ঘটাতে পারলেন না যে! ৩৫ টেস্টে ৮৮ উইকেট। ৫৯টি ওয়ানডেতে ৬৬ উইকেট শিকার-খুব আহামরি কোনো ক্যারিয়ার নয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে টিকে থাকার জন্য যে দৃঢ়তার প্রয়োজন, ব্যর্থতার কবল থেকে বেরিয়ে এসে লড়াইয়ের যে জেদ- সেই জায়গায় হার মানেন ভারতের এই বাঁহাতি স্পিনার।

ক্যারিয়ারের শুরুতে সাফল্য ধরা না দিলে ব্যর্থতার বলয় থেকে বেরিয়ে এসে লড়াইয়ে জেতা অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। সেই কঠিন পথ সবাই পাড়ি দিতে পারে না। তখন মানসিকভাবে অনেকে পিছিয়ে পড়ে। ভাবতে শুরু করে-নাহ, আমাকে দিয়ে হবে না। আমি বোধহয় যথেষ্ট প্রতিভাবান না। আমি ক্রমশ বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছি সবার। মাত্র ৩০ বছর বয়সে স্পিনার মানিন্দার সিংকে এই হতাশা পেয়ে বসে। যে বয়স আকাশকে স্পর্শ করার স্বপ্ন দেখে সবাই; মানিন্দার তখন ডুব দিলেন নেশার জগতে! মদের বোতলে! সেই সংকটেই মাত্র ত্রিশেই শেষ তার ক্রিকেট ক্যারিয়ার! ক্রিকেট ছাড়ার পরের জীবনটা আরও অন্ধকার! বিয়ে করলেন, সেখানেও অসুখী জীবন। আশে পাশের মানুষজন, পরিবেশ সবকিছুই একসময় তার কাছে অসহ্য হয়ে উঠলো। বিপদের চূড়ান্ত হলো যখন কোকেনসহ পুলিশের হাতে ধরা পড়লেন!

এক কথায় বলা যায়- ধ্বংসের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যান ভারতের এই স্পিনার। তবে জীবন সবাইকে দ্বিতীয় সুযোগ দেয়। সেই দ্বিতীয় সুযোগ মানিন্দার সিংকে হয়তো ক্রিকেটে ফিরিয়ে আনতে পারেনি, কিন্তু নেশার পঙ্কিলতার গর্ত থেকে টেনে তুলে আনলো ঠিকই!

আর তাই একসময় সারাদিন মুখ গোমড়া করে রাখা মানিন্দার সিং এখন হাসতে পারেন প্রাণখুলে। বলতে পারেন তার জীবনের গল্প। যে গল্পের নষ্ট সময়কে ঠিকই পরাজিত করতে পেরেছেন তিনি।

ক্রিকেটের জনপ্রিয় ওয়েবসাইট ক্রিকইফোর কাছে এক সাক্ষাতকারে নিজের জীবনের সেই ক্ষতবিক্ষত অধ্যায়ের কথা বলছিলেন মানিন্দার সিং।

বাকিটা শুনি তার কথায়- ‘হঠাৎ করেই বোলিংয়ে ধার হারিয়ে ফেলি আমি। মনে হয় কি যেন ছিল আমার। সেটা খুইয়ে ফেলেছি। ভিডিও দেখলাম। কোচের কাছে ছুটলাম। কিন্তু কিছুতেই সমাধান মিলল না। পারফরমেন্স হারিয়ে ফেললাম। আমার তখন মাত্র ২২/২৩ বছর। প্রচণ্ড আবেগের বয়স। চারধারের হতাশায় আমি পাগল হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় পড়লাম। কারো কোনো কথা, কোনো সমালোচনা সহ্যই করতে পারতাম না। সবার সঙ্গে মেজাজ দেখাতে শুরু করলাম। হঠাৎ করে দেখলাম-আমার কোনো বন্ধু নেই। আশপাশে কেউ নেই! মদের বোতল হাতে নিলাম। দেখলাম ওটাই আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। আস্তে আস্তে আমি পুরোদুস্তর অ্যালকোহলিক হয়ে গেলাম। বাবাকে আমি ভয় পেতাম। তার কাছে যেতাম না। মা’ কে কিছু বলতে পারতাম না। মনে হতো তিনি আমাকে বুঝতে পারবেন না। বোন আমার চেয়ে দশ বছরের বড়। বিয়ে করে সে অন্যত্র থাকতো। তাকেও বিরক্ত করতে চাইতাম না। ভাই বিদেশি চাকরি করতো। সব থেকেও যেন কোথাও আমার কেউ নেই। কারো কাছে যাওয়ার কোনা জায়গা ছিল না, তাই আমি বোতলের কাছেই গেলাম!'

তিনি বলেন, 'আমার বাজে রুক্ষ মেজাজের কারণে ক্রিকেট দলেও জায়গা হারালাম। বাজে রাগ ও আচরণ দিয়ে আসলে কিছু জেতা যায় না। ধীরে ধীরে মানুষজন আমাকে এড়িয়ে চলতে শুরু করলো। কপিল দেব ও মহিন্দার অমরনাথ আমাকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলেন, কিন্তু আমি যে তখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছি!'

’৯১ সালে বিয়ে করলাম। কিন্তু সেও আমাকে বুঝতে পারলো না। আমাকে সহায়তা করতে পারলো না। আসলে আমার যে রুক্ষ এবং কড়া মেজাজ ছিল তাতে কেউ আমাকে সহ্য করারই কথা নয়! আমাকে বুঝবে কিভাবে? আমার সবসময়ের সঙ্গী তখন মদের বোতল। বাসায় মদ খেতাম। গাড়ির মধ্যে বোতল থাকত। বাসা-বাইরে যেখানেই যেতাম মদের বোতল আমার নিত্যসঙ্গী। সবাই যখন ঘুমে থাকতো, আমি তখন বোতলের ছিপি খোলা শুরু করতাম!'

তবে বাবার মাত্র একটা কথা আমার এই ক্ষতবিক্ষত জীবনটা বদলে দিলো। মারা যাওয়ার আগে বাবা আমাকে বলেছিলেন- ‘তুমি যদি কোনোকিছু করে আনন্দ না পাও তবে সেটা ত্যাগ কর। তুমি যদি একটা দরজা বন্ধ না কর তবে অন্য দরজা খুলবে না।’

'আমি বাবার এই কথাটা মেনে পরদিনই সব ধরনের ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দিলাম। তখন আমার বয়স মাত্র ৩০। খাদের কিনারায় পৌঁছে যাওয়া জীবন থেকে আমাকে উদ্ধার করলেন দিল্লির ডাক্তার অমিত্রা ওয়াদাহ। তিনিই শেখালেন-জীবন কোনো এক ব্যর্থতায় কখনো আটকে যায় না। আমি এখন বলতেই পারি-এখনকার আমি অনেক ভালো মানুষ। রাগ যে করি না তা হয়, তবে জানি সেই রাগ কিভাবে দমিয়ে শান্ত থাকতে হয়!'

'বিশ্বাস করি যে মানুষ শান্ত থাকতে পারে, জীবনে সঠিক সিদ্ধান্তও সেই নিতে পারে।'

আপনার মতামত লিখুন :