খেলল, জিতল এবং অনেক কিছু শেখালও আফগানিস্তান!

এম. এম. কায়সার, স্পোর্টস এডিটর, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
টাইগারদের হৃদয় ভেঙে বিজয়ী আফগান ক্রিকেটারা, ছবি: সংগৃহীত

টাইগারদের হৃদয় ভেঙে বিজয়ী আফগান ক্রিকেটারা, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

অভিজ্ঞতা। নিজ মাঠ। হাতের তালুর মতো চেনা পরিবেশ। এবং সার্বিক শক্তি-সবমিলিয়ে টেস্ট সিরিজ শুরুর আগে বাংলাদেশ এসব বিভাগে আফগানিস্তানের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল।

কিন্তু সিরিজের একমাত্র টেস্ট ম্যাচটা তো জিতল আফগানিস্তান।

ম্যাচে খেলতে নামার আগে সেকি বিপুল তোড়জোড়! উইকেট কেমন হবে? দল কেমন হবে? ওপেনিংয়ে কে থাকছেন? সেঞ্চুরি হচ্ছে কার? চতুর্মাত্রিক এমন সব পরিকল্পনা নিয়ে শিরোনামে বেশি ছিল বাংলাদেশ।

কিন্তু চট্টগ্রাম টেস্ট জিতল আফগানিস্তান ২২৪ রানের বিশাল ব্যবধানে।

নতুন কোচ। নতুন টিম ম্যানেজমেন্ট। টেস্ট দলের কার জার্সি নাম্বার কতো হবে? কে কোন পজিশনে খেলবেন? তিনদিনেই তাহলে শেষ হয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রাম টেস্ট! আরে আফগানিস্তানের ব্যাটিং অমন কিছু না! টেস্ট ম্যাচ শুরুর আগে এমন ‘গল্পই’ বেশি শোনা গেলো বাংলাদেশ দলের আশপাশ ঘিরে।

অথচ চট্টগ্রাম টেস্টে মাঠে গড়ানো প্রতিটি সেশনেই আফগানিস্তান টপকে গেলো বাংলাদেশকে।

এই টেস্ট ম্যাচের কোনকিছুতেই যে সামনে বাড়তে পারলো না বাংলাদেশ। শেষদিনের শেষ বিকেলে সময় নষ্ট করার যে অসুন্দর ও অশোভন চেষ্টা করলেন ক্রিকেটাররা সেটা হার বাঁচানোর কোনো কৌশল নয়; বরং ক্রিকেট স্পিরিটকে গলাটিপে ‘খুন’ করার সামিল। এই অসুন্দরের নাম অন্য নাম বেলেল্লাপনা!

উইকেটে এসেই গ্লাভস খুলে ঘাম মোছার কুটিল কসরত। স্ট্রাইক নেয়ার আগেই জুতোর ফিতে নতুন করে বেঁধে নেয়া। ঘাড়ের ঘাম মোছার জন্য মাঠের বাইরে থেকে টাওয়েল চেয়ে পাঠানো। একটা বল খেলার পর স্কয়ার লেগের দিকে হাঁটা ধরা। সেখান থেকে স্লো মোশন ভঙ্গিতে ফের স্ট্রাইক নেয়া। অহেতুক প্যাড ঠিক করা। সময় নষ্ট করার যতো তরিকা আছে, ভীষণ কদাকার ভঙ্গিতে সেই চালাকি মার্কা সুযোগ নেয়ার চেষ্টা চলে।

এটাকে আর যাই হোক-ক্রিকেট বলে না। বলে পলায়ন মনোবৃত্তি! সাকিব আগের দিন বলছিলেন মন খুলে ভয় তাড়িয়ে খেলার। কিন্তু শেষদিনের শেষ বিকালে বাংলাদেশ খেলল ‘ডরপুক ব্যাটিং’!

সাধারণত এমনসব কুট-কৌশল তখনই মানানসই যখন সারাদিন ব্যাট করা কোনো দল শেষের ঘণ্টায় এসে সময় নষ্টের জন্য অমনটা করে। তখন সেটাকে না হয় ক্রিকেটীয় কৌশল হিসেবে হয়তো মেনে নেয়া যায়। কিন্তু আপনি যখন সারাদিনে খেললেনই মাত্র ১৩ বল! মিনিটের হিসেবে মোটে সাত মিনিট! আর ম্যাচ বাঁচাতে শেষ ঘণ্টায় যখন প্রয়োজন হলো ১৯ ওভারের কম খেলার, তখন প্রপার ব্যাটিংয়ের চ্যালেঞ্জ না নিয়ে সময় নষ্টের অপকীর্তিতে নামলেন!

এই কৌশলকে আর যাই হোক-ক্রিকেট বলে না!

আর সত্যিকারের ক্রিকেট কাকে বলে সেটা মাত্র তৃতীয় টেস্ট খেলতে নামা আফগানিস্তান করে দেখাল। এবং সেটা চট্টগ্রাম টেস্টের প্রথম দিনের প্রথম বল থেকেই।

টেস্টে কিভাবে ব্যাটিং করতে হয়- সেটা দেখার জন্য রহমত শাহ, আসগর আফগান, ইব্রাহিম জাদরান ও আফসার জাজাইয়ের ব্যাটিংয়ের পুরো রিপ্লে দেখে নিতে পারে বাংলাদেশ। কোনো ধরনের তাড়াহুড়ো নেই। বলের গুণাগুণ বিচার করে খেলা। ঝুঁকিপূর্ণ শটস এড়িয়ে চলা। ব্যাটিং জুটি গড়া। বেশিরভাগ সময়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখা। বোলারদের ক্লান্ত করে তোলা। আবার যখন দ্রুত রান তোলার প্রয়োজন তখন সেই কাজটাও দুর্দান্তভাবে করা। দুই ইনিংসেই দ্রুত রান তোলার সেই দায়িত্ব পালন করেন আফগান অধিনায়ক রশিদ খান।

চট্টগ্রাম টেস্টে যে বিপদে পড়েনি আফগানিস্তানের ব্যাটিং তাও নয়। পড়েছিলো। কিন্তু এই দলটা জানে সঙ্কট কিভাবে কাটিয়ে উঠতে হয়। আর তাই দ্বিতীয় ইনিংসে ৪ রানে ২ উইকেট হারানো দল ঠিকই ৯০.১ ওভার ব্যাট করে ২৬০ রান তুলে নিলো!

শেখাল তারা সমস্যায় পড়লেও ব্যাটিংয়ে কিভাবে ফিরে আসা যায়। জানালো কিভাবে বৃষ্টিকে হারানো যায়। সব প্রতিকূলতাকে ডিঙিয়ে দলকে জেতানো যায়।

-আর বাংলাদেশের ব্যাটিং?

সঙ্কটে পড়ার পর আরো গভীর সঙ্কটে গেলো! কেউ উদ্ধারকর্তা হতে পারলেন না। উইকেটে এসেই ওপেনার লিটন দাস রিভার্স সুইপ খেললেন! ওয়ান ডাউনে নামা মোসাদ্দেকের মাত্র ১৭ বল খেলার পর ছক্কা মারার শখ চাপলো। তাতেই অক্কা! পরিষ্কার আউট জেনেও মুশফিক ও মিরাজ রিভিউ নষ্ট করলেন। মমিনুল হাফসেঞ্চুরি করেই ভাবলেন ইনিংসে তো ছক্কা পেলাম না-হাঁকাই একটু! সৌম্য সরকার ও মেহেদি হাসান মিরাজ ব্যাটিংয়ের নামে যা করলেন, তাকে আর যাই হোক ব্যাটিং বলে না-বলে আফগান স্পিন দেখে দৌড়ে পালানো!

শেষদিনের শেষ বিকালে সাকিব আল হাসান অমন পরিস্থিতিতে প্রথম বলেই যে কাট শট খেললেন তাতে ব্যাটিং বুদ্ধিমত্তার ছাপ নয়, যা ফুঁড়ে বেরুলো তার নাম-নার্ভাসনেস!

টেস্ট ক্রিকেট খেলছে আফগানিস্তান মাত্র বছর খানেক আগে থেকে। এটা তাদের তৃতীয় টেস্ট। বাংলাদেশ টেস্ট খেলছে ১৯ বছর ধরে। এটা বাংলাদেশের ১১৫ তম টেস্ট।
জানা কথা-অভিজ্ঞতা বাজারে কিনতে পাওয়া যায় না। কিন্তু শুধু অভিজ্ঞতা আপনাকে ক্রিকেট ম্যাচ জেতায় না। প্রয়োজন আরো উপকরণ-সামর্থ্য ও সাহস এবং তার যথাযথ প্রয়োগ।

চট্টগ্রাম টেস্টে আফগানিস্তানকে ভয় পেয়েছিলো বাংলাদেশ! হারার ভয়। রশিদ খানের লেগস্পিন খেলতে না পারার ভয়! বৃষ্টির জন্য সাধারণত ব্যাঙ কাতর হয়। চট্টগ্রাম টেস্টে ক্রিকেটারদের গলায় সেই কাতর ডাক শোনা গেলো!

এই ম্যাচের স্কোরকার্ডে ২২৪ রানে বাংলাদেশের হারের পাশে ব্র্যাকেটে থাকা উচিত (ভয়ে হার)!

আপনার মতামত লিখুন :