ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ আজ, স্বাধীনতার পিপাসা জাগানিয়া দিন

সেন্ট্রাল ডেস্ক ২

  • Font increase
  • Font Decrease
আজ ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ । বাঙালি, বাংলাদেশের ইতিহাসে অনন্য এক দিন। এদিনের এক ভাষণে পাল্টে যায় তৎকালীন পাকিস্তানের রাজনৈতিক দৃশ্যপট। ঐতিহাসিক রমনার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) মুক্তিকামী লাখো বাঙালির সমাবেশে গণমানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বজ্রকন্ঠে ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ মাত্র ১৮-মিনিটের অলিখিত ওই ভাষণ নতুন এক ইতিহাসের জন্ম দেয়। এর প্রতিটি লাইন শোষিত স্বাধীনতাকামী মানুষের রক্তে ধরিয়ে দেয় আগুন, মনে জাগিয়ে তোলে দ্রোহ। তোলপাড় ওঠে পাকিস্তানের সেনাশাসক মহলে। উচ্ছ্বাসে উদ্বেল সমবেত জনতা, প্রকম্পিত ময়দান। লাখো কন্ঠে আওয়াজ উঠে ‘জাগো জাগো, বাঙালি জাগো’; ‘পিন্ডি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা; ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’; ‘তোমার নেতা আমার নেতা, শেখ মুজিব - শেখ মুজিব’; ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’। এ সময় ওই সমাবেশে উপস্থিত সিংহভাগ মানুষের হাতে ছিলো প্রতিরোধের প্রতীক লাঠি। এদিন সকাল থেকে সর্বত্র গগনভেদী ‘জয় বাংলা’ জিগির ওঠে। ‘আপোস না সংগ্রাম, সংগ্রাম - সংগ্রাম’; ‘আমার দেশ তোমার দেশ, বাংলাদেশ- বাংলাদেশ’; ‘পরিষদ না রাজপথ, রাজপথ-রাজপথ’; ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’; ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’-র মত অজুত কন্ঠের স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে ঢাকার রাজপথ। দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছিল এর মাত্রা। এদিন মানুষের ঢলে শাহবাগ হয়ে ওঠে সব রাজপথের ঠিকানা। মিছিলে-মিছিলে সয়লাব রেসকোর্স, শাহবাগ, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ও আশপাশের সড়ক। সবচেয়ে বড় মিছিলটি আসে আদমজি পাটকল থেকে। একাত্তরের এই দিনে ঢাকার দৃশ্যপট ছিলো এমন অভুতপূর্ব। নতুন প্রজম্মের কাছে তা সম্পূর্ণ অজানা। ময়দানে জনতার প্রবেশ নির্বিঘœ করতে পূবে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট ও দক্ষিণে মঠের দিকে ঘোড়দৌড়ের কাঠের রেল-ট্র্যাক খুলে রাখা হয়। মঞ্চ করা হয় দক্ষিণমুখী। সামনে ২০ গজ খালি রেখে মহিলাদের বসার ব্যবস্থা করা হয়। মঞ্চের কিছুটা উত্তর-পশ্চিমে মাটির টিলার নিচে একটি ঘরে অবস্থান ছিল ক্ষুদে একটি সেনা ইউনিট। উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ট্রান্সমিটার নিয়ে ওই সেনারা সমাবেশ পর্যবেক্ষণ করছিল। সভা শুরুর আগে সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার সমাবেশস্থলের চারদিকে চক্কর দেয়। নির্ধারিত সময়ের প্রায় আধ ঘন্টা পর দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ দিতে সভামঞ্চে উপস্থিত হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মঞ্চে তখন উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন ছাত্রনেতারা। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিলেন অন্যতম শীর্ষ ছাত্রনেতা আবদুর রাজ্জাক। সফেদ পাজামা-পাঞ্জাবি ও কালো জহর কোট পরিহিত বঙ্গবন্ধু মঞ্চে দাঁড়ালে উপস্থিত জনতা করতালি ও ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের মধ্য দিয়ে তাকে স্বাগত জানায়। ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। তিনি ঘোষণা করেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না। আমরা এ দেশের মানুষের অধিকার চাই। আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়- তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ।’ এ সময় বঙ্গবন্ধু চার দফা দাবি উত্থাপন করেন। চেপে বসা সামরিক আইন প্রত্যাহার, সৈন্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া, সব হত্যার তদন্ত ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর। একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধু পরবর্তী সপ্তাহের আন্দোলনের জন্য ১০ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। চলমান অসহযোগ আন্দোলনের পাশাপাশি অফিস-আদালত, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকাল বন্ধ ঘোষণা করা হয়। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর গুরুত্বপূর্ণ এই ভাষণ সরাসরি রেডিওতে সম্প্রচার করা হবে, এমন ঘোষণার পর এদিন সারা বাংলার শ্রোতা অধীর আগ্রহে রেডিও সেটের সামনে অপেক্ষা করতে থাকেন। শেষ মুহূর্তে সামরিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ওই ভাষণ সম্প্রচার করা হয়নি। প্রতিবাদে সব বাঙালি কর্মচারিরা রেডিও অনুষ্ঠান বর্জন করেন। বিকেল থেকে ঢাকা বেতার কেন্দ্রের সব অনুষ্ঠান সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। পরে সামরিক কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে অধিবেশন সমাপ্ত ঘোষণা করেন। গভীর রাতে সামরিক কর্তৃপক্ষ ঢাকা বেতারে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পূর্ণ বিবরণ প্রচারের অনুমতি দিলে এই ভাষণ দিয়েই পরদিন সকালে ঢাকা বেতারের সম্প্রচার শুরু হয়। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শেষ হওয়ার পরই ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খান সামরিক শাসন প্রত্যাহার এবং অবিলম্বে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের দেশ-শাসন করার অধিকার আছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে তার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। একই দিনে সরকারি প্রেসনোটে বলা হয়, অসহযোগ আন্দোলনের ৬ দিনে ১৭২ জন নিহত এবং ৩৫৮ জন আহত হয়েছেন। রাতে বঙ্গবন্ধু ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান প্রসঙ্গে একটি বিবৃতি দেন। এতে তিনি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার বেতার ভাষণের জবাবে বলেন, ১ মার্চ আকস্মিকভাবে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আকস্মিক ও অবাঞ্ছিতভাবে স্থগিত ঘোষণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদরত নিরস্ত্র বেসামরিক অধিবাসীদের ওপর ব্যাপকভাবে গুলি চালানো হয়েছে। গত সপ্তাহে যারা প্রাণ দিয়েছেন তারা শহীদ হয়েছেন। এই শহীদদের ‘ধ্বংসকারী শক্তি’ আখ্যাদান নিঃসন্দেহে সত্যের অপলাপ। প্রকৃতপক্ষে তারাই ধ্বংসকারী যারা বাংলাদেশের বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টির জন্য দায়ী। এই দিন থেকে পূর্ব তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের সব শাখা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব মেনে নিয়ে তাদের নির্দেশাবলি পালন করতে থাকে। কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আহবান জানায়। পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমীর গোলাম আযমও এদিন পিপলস পার্টি ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর সমালোচনা করতে বাধ্য হন। স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের স্থপতির ঐতিহাসিক এ ভাষণকে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো। সংস্থার মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা গত বছর ৩০ অক্টোবর এ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর বঙ্গবন্ধুর ভাষণের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির এ ঘোষণা আসে। গৌরবোজ্জল এই স্বীকৃতির পর ভিন্ন আঙ্গিকে প্রথম এই দিনটি উদযাপন করছে বাংলাদেশ।

আপনার মতামত লিখুন :