গ্রেনেড হামলা: মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কে এই আব্দুস সালাম?

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আব্দুস সালাম। ছবি: বার্তা২৪.কম

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার ঘোষিত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মাওলানা শেখ আব্দুস সালামের বাড়ি বগুড়ার ধুনটের চৌকিবাড়ি ইউনিয়নের পেঁচীবাড়ি গ্রামে। তার স্ত্রী ফাতেমা তুজ-জোহরা ১ ছেলে এবং ২ মেয়েকে নিয়ে বসবাস করেন বগুড়ার শেরপুর পৌর শহরের হামছায়াপুর মহল্লায় নিজস্ব বাড়িতে।

বুধবার (১০ অক্টোবর) গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। তবে ঘোষিত রায় নিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি ফাতেমা। এমনকি সাংবাদিকদের কাছে কোনো মন্তব্য করবেন না বলে জানিয়ে দেন।

বৃহস্পতিবার (১১ অক্টোবর) শেরপুর পৌর শহরের হামছায়াপুর মহল্লায় আব্দুস সালামের বাসায় গিয়ে তালা ঝুলানো দেখা যায়। নিচতলায় বসবাসরত এক ভাড়াটিয়া জানান, আবদুস সালামের স্ত্রী কোথায় গেছেন জানেন না তিনি। দুপুর ১টার দিকে ফাতেমা খাতুন বাসায় ফিরলেও সাংবাদিক পরিচয় শুনে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

আব্দুস সালামের গ্রামের বাড়িতে ধুনটের পেঁচীবাড়ি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পৈত্রিক ভিটেমাটির উপর টিনের একটি ঘর পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ওই ঘরে কেউ বসবাস করে না।

আব্দুস সালামের বড় ভাই মৃত গোলাম মোস্তফার স্ত্রী মরিয়ম বেগম জানান, তার দেবর আব্দুস সালাম মাদরাসায় পড়ালেখা করার কারণে ছোটবেলা থেকেই বাইরে থাকতেন। গ্রামের বাড়িতে কম আসতেন। আব্দুস সালাম শেরপুর শহরে বাড়ি করে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সেখানেই বসবাস করতেন। তবে গ্রেফতার হওয়ার কয়েক মাস আগে একবার অল্প সময়ের জন্য গ্রামের বাড়িতে এসেছিলেন।

২০০৯ সালের ১ নভেম্বর র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হওয়ার আগ পর্যন্ত মরিয়ম বেগমের মতো এলাকাবাসীও জানতেন না আব্দুস সালাম জঙ্গি সংগঠনের বড় নেতা এবং সে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার সঙ্গে জড়িত। তবে আব্দুস সালাম আফগানিস্তানে যুদ্ধ করেছেন বলে তারা শুনেছেন।

কে এই আব্দুস সালাম:
ধুনট উপজেলার চৌকিবাড়ী ইউনিয়নের পেঁচিবাড়ী গ্রামের মৃত মোজাহার আলী শেখের ৪ ছেলে এবং ৩ মেয়ের মধ্যে সবার ছোট আব্দুস সালাম। তিনি শেরপুর শহীদিয়া কামিল মাদরাসায় লেখাপড়া করা অবস্থায় চলে যান ভারতে। সেখানে দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসায় লেখাপড়া করা অবস্থায় ১৯৮৪ সালে পাকিস্তানে যান। সেখান থেকে ওই বছরেই আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিতে যান মাওলানা শেখ আব্দুস সালাম। পরপর তিনবার আফগানিস্তানে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন তিনি। এরপর ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশে ফেরেন।

আব্দুস সালাম নিজেই আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশ শাখা প্রতিষ্ঠা করে কার্যক্রম শুরু করেন বলে জানা যায়। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত আব্দুস সালাম প্রকাশ্যে হরকাতুল জিহাদ নামের সংগঠন পরিচালনা করেন বলে তার ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়। বাংলাদেশ সরকার হরকাতুল জিহাদ নামের সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে আব্দুস সালাম ভারত ও পাকিস্তানে সক্রিয় বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে যাতায়াতের সময় কখনো পাকিস্তানি পাসপোর্ট, আবার কখনো বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করতেন মাওলানা আব্দুস সালাম। ১৯৯৭ সালে আব্দুস সালাম তার স্ত্রী সন্তানসহ বাংলাদেশি পাসপোর্টে পাকিস্তানে যান। ২০০২ সালে আব্দুস সালাম পাকিস্তানি পাসপোর্টে গফুর পরিচয়ে ফের দেশে ফেরেন। এরপর তিনি বগুড়ার শেরপুরে পৌর এলাকার হামছায়াপুর মহল্লায় জায়গা কিনে দোতলা বাড়ি নির্মাণ করেন। বাড়ির একটি অংশে স্ত্রীর নামে ফাতেমা তুজ-জোহরা বালিকা মাদরাসা স্থাপন করে তা পরিচালনা শুরু করেন।

এলাকাবাসী জানায়, ওই সময় থেকেই আব্দুস সালামের বাড়িতে মাঝে মধ্যে দেশ ও দেশের বাইরে থেকে অপরিচিত লোকজন আসত। ২ বছর পর মাদরাসা বিলুপ্ত করে দিয়ে আব্দুস সালাম ঢাকায় চলে যান। মাঝে মধ্যে রাতে বাড়িতে আসলেও সকালে আবার চলে যেতেন। ৪ মেয়ে ও ১ ছেলে সন্তানের বাবা আব্দুস সালাম দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। শেরপুরে তার বাসায় স্ত্রী ফাতেমা বসবাস করেন ১ ছেলে ও ২ মেয়েকে নিয়ে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকাবাসী জানান, আব্দুস সালামের বাড়িতে প্রতিবেশীদের কোনো যাতায়াত নেই। আব্দুস সালামের স্ত্রীও প্রতিবেশীদের সঙ্গে তেমন কথাবার্তা বলেন না। বাড়ির দোতলা থেকে আসা ভাড়া ছাড়া আর কোনো আয়ের উৎস আছে কিনা তাও কেউ বলতে পারে না।

জাতীয় এর আরও খবর