কয়লা জ্বালিয়ে জীবন চলে

রাকিবুল ইসলাম রাকিব, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
কয়লা জ্বালিয়ে জীবন চলে। ছবি: বার্তা২৪.কম

কয়লা জ্বালিয়ে জীবন চলে। ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

খানিকটা বড়সড় পিতলের ইস্ত্রি। ইস্ত্রির ভেতর জ্বলন্ত লাল কয়লা। কয়লার আগুনে গরম হচ্ছে ইস্ত্রি। আর সেটা দিয়ে কাপড় ইস্ত্রি করা হচ্ছে। এক সময়কার স্থানীয় ধোপা বাড়ির সাধারণ চিত্র ছিল এটি।

কিন্তু বিদ্যুৎ আর প্রযুক্তির এই ডিজিটাল যুগে কয়লার ইস্ত্রি এখন বিরল। তবে ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার মাওহা ইউনিয়নের মাওহা বাজারে গত শনিবার (১৩ অক্টোবর) বিকেলে এমন এক দৃশ্য চোখে পড়ে। রাস্তার পাশে টেবিল রেখে এক কিশোর ছেলে কয়লাচালিত ইস্ত্রি দিয়ে কাজ করছে। মানে কাপড় ইস্ত্রি করছে।

কাছে গিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। এ প্রতিনিধিকে সে জানায়, তার নাম আশরাফুল আলম সালমান (১৩)। সে মাওহা উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। মাওহা গ্রামেই তাদের বাড়ি। তার বাবার নাম আকবর আলী। তিন ভাই-বোনের মধ্যে সালমান সবার ছোট। অভাব-অনটনের কারণে পড়াশোনার খরচ দিতে পারত না তার পরিবার। তাই নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতে দুই বছর ধরে এই কাজ করছে আশরাফুল।

কথা বলতে বলতেই কাপড় ইস্ত্রি করছিল সালমান। ইস্ত্রির ফাঁকা অংশগুলো দিয়ে দেখা যাচ্ছে লাল জ্বলন্ত কয়লা। কুচকে যাওয়া কাপড়কে আবার টানটান করে তার স্বরূপে ফিরিয়ে আনতেই ইস্ত্রি করা হয়। কয়লা যখন পুড়তে পুড়তে সাদা ছাইয়ে পরিণত হয়, তখন ইস্ত্রির হাতলের নিচে ঢাকনা খুলে আবার নতুন করে কয়লা দেয়া হয়।

সালমান জানায়, ইস্ত্রিতে একবার কয়লা ভরে আগুন জ্বেলে দিলে ঘণ্টাখানেকের মতো সময় নির্বিঘ্নে চলে। এই সময়ে ১০-১২টি কাপড় ইস্ত্রি করা যায়। এখানে কয়লাও কেনা যায় অল্প টাকায়। ফলে খরচও কম।

কথা প্রসঙ্গে সালমান জানায়, তার মা গৃহিণী। বড় দুই ভাই ঢাকায় থাকে। বড় বোন এসএসসি পরীক্ষার্থী। বসত ভিটা ছাড়া তাদের আবাদি কোনো জমি নেই। বৃদ্ধ বাবা কাজ করতে না পারায় সংসারে অভাব-অনটন দেখা দেয়। তাই নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতে দুই বছর ধরে এই কাজ করছে সে। শুধু তাই নয় নিজের আয়ের টাকা থেকে সে বোনের পড়াশোনার খরচেও টুকটাক সহযোগিতা করে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Oct/14/1539499867241.jpg

এরই মধ্যে পশ্চিমে হেলে পড়েছে বিকেলের সূর্য। মাওহা বাজারে অন্ধাকার নেমে আসছে একটু একটু করে। এমন সময় বাজারের ব্যাগ হাতে উপস্থিত হলেন সালমানের বাবা আকবর আলী। কিন্তু তখনো বাজারের টাকা জোগাড় করতে পারেনি সালমান। তাই বৃদ্ধ বাবা ও ছেলে গ্রাহকের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে এ প্রতিনিধির সঙ্গে গল্প জুড়ে দেয়।

গল্পের এক ফাঁকে আকবর আলী বলেন, ‘সংগ্রামের কয়েক বৎসর পরে তেইশ্য টেকা দিয়া কয়লার এই ইসতারিডা (ইস্ত্রি) কিইন্যা আনি। তহন তো গেরামে কারেন্ট আছিল না। হেই সময়ে আমার লন্ড্রির ব্যবসাডাও ভালা ছিল। পরে কারেন্টের ইসতারি আওনের পরে কয়লার ইসতারির চল কইম্যা যায়। আমারও বয়স বাড়ে, পরে এই ব্যবসা বন্ধ কইরা দেই। এহন সালমান এই কাম করে।’

প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘এহন আর কয়লার ইসতারি পাইবেন কই? এসব এখন আর নাই। কারেন্ট আহনের আগে তো এগুলো দিয়াই সবাই কাপড় ডলতো।’

এদিকে প্রতি সপ্তাহের শনি ও মঙ্গলবার মাওহা বাজারে, শুক্র ও সোমবার ভুটিয়ারকোণা বাজারে রাস্তার পাশে টেবিল বসিয়ে কাপড় ইস্ত্রি করে সালমান। প্রতিটি কাপড় ইস্ত্রি করতে ৫ টাকা করে নেয় সে। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত কাপড় ইস্ত্রি করে তার আয় হয় ১শ থেকে ১৫০ টাকার মতো।

গল্পের ফাঁকে বড় হয়ে কী হতে চাও জানতে চাইলে সালমান বলেন, ‘কয়লার আগুন জ্বেলেই এখন জীবন চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু আমি পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করতে চাই। জীবিকার তাগিদে হয়ত এখন এই কাজ করছি। কিন্তু যখন চাকরি করব তখন আর আমাকে ইস্ত্রি নিয়ে রাস্তায় দাঁড়াতে হবে না।’

এরই মধ্যে গ্রামের এক বাসিন্দা চলে এসেছে পরনের পাঞ্জাবি ইস্ত্রি করতে। তাই কথা শেষ না করেই কাপড় ইস্ত্রিতে মন দিল সালমান। পিতলের ওপর বসানো কাঠের হাতল ধরে এক মনে কাপড় ইস্ত্রি করে যাচ্ছে। সন্ধ্যার অন্ধাকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর সময়ও যেন একটু পেছনে চলে এসেছে এখানে।