আমজাদের ব্যতিক্রম ‘পক্ষীশালা’

উবায়দুল হক, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
পাখিগুলোকে খাবার দিচ্ছে আমজাদ আলী। ছবি: বার্তা২৪.কম

পাখিগুলোকে খাবার দিচ্ছে আমজাদ আলী। ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

শখের বশে পাখিদের ধরে খাঁচায় পোরেন না ঠিকই, তবে পাখিদের সঙ্গে তিনি বাঁধা পড়েছেন এক আত্মিক বন্ধনে। প্রিয়তমা স্ত্রীকে চিরদিনের মতো হারানোর পর থেকেই পাখিদের সঙ্গে গড়ে ওঠে তার প্রণয়। দেখতে দেখতে কেটে গেছে ১৫ বছর। সেই বন্ধনে চির ধরেনি একটুকুও।

নিজের বাড়ির অতিথির মতোই গভীর মমত্ববোধ আর ভালোবাসা থেকেই প্রতিদিন চানাচুর খাওয়াচ্ছেন শালিক, দোয়েল, ফিঙে, দাঁড়কাক ও কবুতরসহ নানা জাতের পাখিদের। ফলে মানসিক প্রশান্তির পাশাপাশি দুরন্ত উড়ন্ত এই বাসিন্দাদেরও ‘বন্ধু’ হয়ে ওঠেছেন তিনি।

কবি মদনমোহন তর্কালঙ্কারের কবিতার ‘পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল। কাননে কুসুমকলি সকলি ফুটিল’ এই চরণের সঙ্গে বাস্তবে মিল খুঁজে পাওয়া পাখিপ্রেমী এই মানুষটির নাম আমজাদ আলী। প্রায় শতবর্ষী এই আমজাদকে জেলার ত্রিশাল উপজেলার মোক্ষপুর নামাপাড়া গ্রামের সবাই চেনেন একনামে। প্রকৃত একজন পাখিপ্রেমী হিসেবেই।

পাখিদের প্রতি নিজের নিখাদ ভালোবাসার দৃষ্টান্ত স্থাপনের পাশাপাশি জীবনের শেষ বেলায় স্থানীয় বাসিন্দাদেরও পাখির কলরবে ঘুম ভাঙার সুযোগ করে দিয়েছেন তিনিই। প্রতিদিন শালিকের কিচিরমিচির শব্দে ঘুম ভাঙে আশপাশের লোকজনের। প্রভাতের আলো ফোটার আগেই একঝাঁক শালিকসহ হরেক রকমের পাখি এসে ভিড় করে আমজাদের বাড়ির আঙিনায়। যেন এক মনোমুগ্ধকর পক্ষীশালা।

অতীতের মতো গ্রামের বাড়িঘরের পাশে গাছের ডালে দলবেঁধে পাখির আগমন কিংবা তাদের কলরব এখন আর খুব একটা চোখে পড়ে না। তবে পাখি ও প্রকৃতি বিলুপ্তির যুগসন্ধিক্ষণে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত এই আমজাদ আলী। পাখিদের সঙ্গে তিনি গড়েছেন গভীর মিতালী।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Oct/16/1539674370885.jpg

জানা গেছে, ২০০২ সালে প্রিয়তমা স্ত্রী জহুরা খাতুনকে হারিয়ে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন পাঁচ সন্তানের জনক আমজাদ আলী। সহধর্মিনীকে হারানোর ব্যাথায় পরিবর্তন করেন নিজের বিছানা। থাকতে শুরু করেন কাচারি ঘরে।

ফজরের নামাজের পর বাড়ির আঙিনায় বসে চিড়া-মুড়ি খাওয়ার অভ্যাস ছিল তার। আর সেসময় তার কাছে আসা কয়েকটি শালিককেও ছুড়ে দিতেন কিছু খাবার। এরপর খাবারের খোঁজে প্রতিদিন বাড়তে থাকে পাখিদের সংখ্যা। এভাবেই আমজাদ আলীর সঙ্গে পাখিদের গড়ে উঠতে থাকে গভীর সখ্যতা।

আমজাদ আলী তার বাড়ি থেকে দু’কিলোমিটার দূরের বাজার থেকে পায়ে হেঁটে কিনে আনেন পাখিদের জন্য চানাচুর। নিজে অসুস্থ থাকলে নেন অন্যের সহায়তা। তবুও নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেনি গত ১৫ বছরে। একমাত্র মেয়ে শেফালীর বাড়িতে বেড়াতে গেলে পাখিদের খাবার দেন ছেলের বউ হালিমা খাতুন। পাখিদের প্রতি এমন অকৃত্রিম ভালোবাসায় মুগ্ধ পরিবার-পরিজনও।

আমজাদ আলীর ছোট ছেলে মহিউদ্দিন আহমেদ শাহীন বলেন, ‘বাবা চানাচুরের বয়াম হাতে আঙিনায় এগিয়ে যেতেই মাটিতে নেমে আসে পাখিরা। মায়ের মৃত্যুর পর বাবা এই পাখিগুলোর মধ্যেই নতুন দিগন্ত খুঁজে পেয়েছে। তাইতো পাখিদের খাবারের জন্য বাবা সপ্তাহে ৫-৬শ টাকা খরচ করলেও কেউ কোনো দিন বিরক্ত হয়নি। পাখিদের প্রতি বাবার এমন ভালোবাসায় আমরা মুগ্ধ।